বাতায়ন/নবান্ন/ধারাবাহিক উপন্যাস/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| ধারাবাহিক উপন্যাস
অজয় দেবনাথ
মউ
[১৫তম পর্ব]
"সুখ নিশ্চয়ই মনে মনে তার প্রেমে পড়েছে, প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করছে। যাক এতদিনে তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। আরে বাবা, তার খপ্পর থেকে বেরিয়ে যাওয়া এতই সহজ। তা সুখ যতই শিক্ষিত হোক, কবি হোক, আর যা কিছুই হোক-না-কেন। সুন্দরী কুমারী কন্যার কাছে দেবতারাও কুপোকাত আর সুখ তো কোন্ ছাড়।"
পূর্বানুবৃত্তি শম্ভুদার স্মরণসভায় যাওয়ার পথে অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসে সুখের মনে। এদিকে
মউ সুখের সঙ্গে সিরিয়াসলি নাটক করছে, সুখ এমন একটা মেয়েই খুঁজছিল। তারপর…
সুখ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানতে
চাইল। কিন্তু মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। একটা সময়ে বলেই ফেলল,
-তার মানে আমার নাটকের নায়িকা আবারও নিরুদ্দেশ!
সুখের গলা ভীষণই ধরা মনে হল, যেন সে ভিতরে ভিতরে কাঁদছে। মউ বলল,
-আরে ধুর! এখনও ঠিকই হল না কিছু, কী বলে আগে দেখা যাক। কোথাকার জল কোথায় গিয়ে ঠেকে। এরকম
অনেক চক্করের কথা শোনা যায়।
-আর যদি সব ঠিকঠাক হয়?
-তুমি যদি নিষেধ করো আমি যাব না। ওদের কিছু একটা বলে দেব।
-আমি কখনই নিষেধ করব না। আর তোকে নিষেধ করতে যাবই বা কেন!
সুখ ভাবল, সবে মাত্র তার ভাইটাল নাটকগুলো জনসমক্ষে আনার একটা দিশা
দেখতে পাচ্ছিল, আর তার মধ্যেই…! অনেক প্যাশন
দিয়ে নাটকগুলো লিখেছে সে। এক-একটা চরিত্র তার কাছে নিজের সন্তানের মতো কিংবা হয়তো
তার থেকেও বেশি। বিরক্ত হল খুব। মনে মনে ভাবল, ধুর! কারোর কোনও কমিটমেন্টের দাম নেই। এ যুগের ছেলেমেয়েদের কাছে সব কিছু যেন
ছেলের হাতের মোয়া। কোনো লক্ষ্য নেই, চর্চা নেই, পরিশ্রম নেই, ধৈর্য ধরে লেগে থাকা
নেই, কিছু একটা হলেই হল। যে করে
হোক লাইমলাইটে আসতে পারাটাই যেন জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে
টিকে থাকতে গেলেও তো নিয়মিত চর্চা লাগে। শ্রেয়া ঘোষাল এমনি এমনি শ্রেয়া ঘোষাল
হয়েছে? তাদের জেনারেশন অন্তত কাজের
ব্যাপারে মানুষকে এভাবে ঝোলাত না।
মউ ভাবল অন্য কথা। সুখ
নিশ্চয়ই মনে মনে তার প্রেমে পড়েছে, প্রকাশ করতে সংকোচ
বোধ করছে। যাক এতদিনে তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। আরে বাবা, তার খপ্পর থেকে বেরিয়ে যাওয়া এতই সহজ। তা সুখ যতই শিক্ষিত
হোক, কবি হোক, আর যা কিছুই হোক-না-কেন। সুন্দরী কুমারী কন্যার কাছে
দেবতারাও কুপোকাত আর সুখ তো কোন্ ছাড়। সুখ চলে পাতায় পাতায় আর মউ চলে শিরায়
শিরায়। দেখাই যাক সুখ কত উড়তে পারে, লাটাই তো মউয়ের হাতেই
রইল। শুধু বয়সটাই একটু বেশির দিকে। আচ্ছা কচি ছেলেরা প্রেমের বোঝেটা কী? শুধু এদিক-ওদিক কোণায় চলো, না হলেই সন্দেহ আর অকারণ অশান্তি। তাছাড়া পুরুষ মানুষের আবার বয়স! কথায় বলে, ‘বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা’ মুনিঋষিদের আবার বয়স হয় নাকি!
১৯
অনার্সে ভাল রেজাল্ট করায়
কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে বাংলায় মাস্টার্স নিতে কোনো অসুবিধা হয়নি সুখের। আর শুভ্রা
নিল বায়ো-সায়েন্স। সবই ঠিকঠাক চলছিল। তাদের অলিখিত দাম্পত্য তিন বছরে পা দিল। এর
মধ্যে দুবার প্রেগন্যান্ট হয়েছে শুভ্রা। অ্যাবরশন করিয়েছে, প্রথম বার সুখকেও সঙ্গে যেতে হয়েছিল। শুভ্রার কথাবার্তায়
মনে হয়েছে দ্বিতীয় বার ওর মা জানত। এসব সুখের যে খুব ভাল লাগত বা সুখ সমর্থন করত
তা নয়। কিন্তু সামলাতেও পারত না নিজেকে। আর শুভ্রার তো অনন্ত খিদে, যেন মাসের ওই কটা দিনও পেলে ভাল হয়।
কথা না থাকলেও দেবাশিস
ঠারেঠোরে কিছু যেন বোঝাতে চেয়েছিল সুখকে। সুখ পাত্তা দেয়নি, কানেই তোলেনি দেবাশিসের কোনও কথা। সুখ বরাবরই আত্মকেন্দ্রিক, ইউনিভার্সিটি বা হস্টেলে শুধু নিজেকে নিয়েই মগ্ন। অন্য
কারোর কথা বা ইঙ্গিত বোঝার বা শোনার কোনো তোয়াক্কাই করত না। তার ফলও মিলল
হাতেনাতে।
তখন শরৎ কাল। নির্ভার মেঘের
দল সাদা পেঁজা তুলোর মতো আকাশের এ-প্রান্ত থেকে সে-প্রান্তে ভেসে বেড়াচ্ছে। সোনা
রোদে ঝলমল করছে চারদিক। তার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ কোনও কোনও জায়গায় টুকরো কিছু
মুহূর্তের জন্য বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি, আর সেই সঙ্গে সমানে
মন পাগল করা হাওয়া। ইউনিভার্সিটি থেকে শুভ্রা সুখকে নিয়ে বেড়াতে গেল লেকের ধারে।
হয়তো ইচ্ছে ছিল ওখান থেকে সোজা বাড়ি যাবে,
তাড়াতাড়ি
হবে। দুজনে দুজনের হাত ধরে অনেকক্ষণ বেড়ানোর পর ওরা বসল একটা নির্জন জায়গায়। অবশ্য
এই নির্জনতা আর বাকিদের জন্য। ওখানে জোড়ায় জোড়ায় অনেকেই বসে ছিল। তারা একজন অন্য
জনে মগ্ন। কারোরই অন্য কারোর দিকে তাকাবার ফুরসত নেই। সেখানে যুগলের স্বর্গ।
ক্রমশ

প্রেমের আরও একটা দিক উন্মোচন হচ্ছে এই উপন্যাসটির মধ্যে দিয়ে। ত্রিমুখী প্রেমে যৌনতা, আকাঙ্খা, কামনা ব্যতিরেকেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার এক অদম্য বাসনা কাজ করছে নীরবে, যেখানে একটা প্রেমী দেহসুখে নিজের মাতৃত্ব বিসর্জন দিতেও কুন্ঠাবোধ করেনা আবার অন্য প্রেমিকা তার বয়সের সীমা মানে না আর নায়ক তার ইচ্ছেগুলো নিকড়ে নিচ্ছে।
ReplyDeleteসঙ্গে থাকুন প্রদীপ-দা আরও নতুন নতুন দিকের সন্ধান পাবেন। ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
Deleteসুখ মউ এবং শুভ্রা তিনজনের চরিত্রের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হচ্ছে, পড়তে বেশ ভালো লাগছে ।
ReplyDeleteসঙ্গে থাকো অদিতি আরও ভাল লাগবে। ধন্যবাদ তোমায়।
Deleteএই পর্বে মউয়ের চরিত্র কিছুটা প্রতিভাত হয়েছে। তার প্রেম যে আসলে নাটক, সেটা জানা গেল। ওদিকে শুভ্রা যে কী করতে চায়, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। সে কি শুধু যৌন তৃষ্ণা মেটাতে সুখের সঙ্গে ভালোবাসার নাটক করছে কিনা, সেটা একটা সন্দেহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বিয়ের আগেই তার মাতৃত্ব বিসর্জন দিয়ে এর মধ্যেই দু'বার অ্যাবরশন করিয়েছে। এখন সে কি সুখের সঙ্গে আদৌ একটা সুখের সংসার গড়তে চায় কিনা এখনও জানা যাচ্ছে না। গল্পের মধ্যে বেশ একটা রহস্য দানা বাঁধছে এবং একটা টার্নিং এসেছে। এই সার্বিক জটিলতার মধ্যে থেকে সুখ নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে, সেটা তার কাছেও বেশ একটু চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। এই জটিল আবর্তে পড়ে সুখ কি দিশেহারা হবে, নাকি শক্ত হাতে জীবনযুদ্ধে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করবে?
ReplyDeleteবলা যায় গল্প ভালোভাবেই এগোচ্ছে...
—এখন দেখা যাক গল্প কোন দিকে গড়ায়!
গল্প গল্পের শর্তেই এগিয়ে যাবে দীপক-দা। ধন্যবাদ জানাই সঙ্গে থাকার জন্য।
ReplyDelete