প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নবান্ন | আমরা ভাল, ওরা খারাপ

  বাতায়ন/নবান্ন/ সম্পাদকীয় /৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ ,   ১৪৩২ নবান্ন | সম্পাদকীয়   আমরা ভাল, ওরা খারাপ "স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাংলা ...

Thursday, January 1, 2026

রুবি রায় [১ম পর্ব] | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/নবান্ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন | ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
 
রুবি রায়
[১ম পর্ব]

"হঠাৎই সেদিন টুটুর ডাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো আবির হাতে নিয়েসবার অলক্ষ্যে সেদিন অতনু ওর দুগালে বেশ করে আবির মাখিয়ে দিয়েছিলমেয়ে তো লজ্জায় লালআর মুখ তুলতেই পারে নাঅতনু তখন নিজেই উপযাচক হয়ে নিজের মুখটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল"

 
অতনুর আজ একজনের সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা। এখন সে দিল্লি নিবাসী, কলকাতায় এসেছে কয়েকদিনের জন্য, তারমধ্যে প্রধান আকর্ষণ বইমেলা, এবারের তার দুটো বই বার হচ্ছে, একটা গল্পের আর একটা কবিতার।
 
ঠিকানাটা হাতে নিয়ে দেখে অবাক হয়ে গেল যেখানে তার যাবার কথা, সেটা তো তার ছোটবেলার পাড়া।
গাড়ি থেকে একটু আগেই নামল, হেঁটে হেঁটে চলে এলো চেনা সেই গাছতলাটার কাছে। এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, অনেকদিন আগের একটা মিষ্টি অনুভূতি মনকে এক সুন্দর আবেশে ভরিয়ে দিল। ঠিক এইখানেই স্কুলবাস থেকে  সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়া দুটো লম্বা বিনুনি দূদিকে ঝুলিয়ে একটা ফুটফুটে মেয়ে স্কুলবাস থেকে নামত। সবে কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র অতনুর ওই মেয়েটিকে গাছতলা থেকে একটু দেখার আকর্ষণে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। এইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একদিন সুগায়ক অতনু গান গেয়ে ফেলল, "মনে পড়ে রুবি রায় কবিতায় তোমাকে একদিন কত করে ডেকেছি, আজ হায় রুবি রায় ডেকে বল আমাকে, তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি"
 
মেয়েটির ছদ্ম কপট ভ্রূকুটির মধ্যে ছিল প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের ইঙ্গিত। না না মেয়েটির সাথে আলাপ হওয়া তো দূরের কথা তার নামটাও জানা হয়নি, তাই সেই মেয়েটি তার হৃদয়ের গোপন কোণে আজও রুবি রায় হয়েই থেকে গেছে।
 
সে আজ প্রায় পঁচিশ  বছর আগেকার কথা। এখন সে পৃথিবীর কোনখানে বা কোন দেশে আছে তার কিছুই সে জানে না, আজ হয়তো দেখলেও তার সাধের রুবি রায়কে সে চিনতে পারবে না। কিন্তু সেদিনের সেই রুবি রায়ের দুষ্টুমিষ্টি মুখচ্ছবি আজও ভুলতে পারেনি, পথ চলতি ওই বয়সের কোন মহিলা দেখলেই সে ফিরে তাকায়, মনে হয় এই সেই রুবি রায় নয়তো!
 
একবার দোলের দিনের কথা মনে পড়ে গেল অতনুর, নিজের অজান্তেই গাল দুটো লাল হয়ে গেল। সেবার পাড়ায় সবাই সবাইকে আবির মাখাচ্ছে, রুবি রায়ের বাবা খুব কড়া ধাঁচের মানুষ ছিলেন বলে ও পাড়ায় বিশেষ মেলামেশা করার সুযোগ পেত না, একটাই ওর বন্ধু ছিল তার সাথে বাড়িতে বসে গল্প করত তা নইলে ও বন্ধুর বাড়ি যেত তাও বাড়ির গাড়ি করে। তাই ওর নামটার সাথে কেউ পরিচিত ছিল না, সবার কাছে ওই রুবি রায় নামটাই অতনুর কল্যাণে চালু হয়ে গিয়েছিল।
 
সেবার দোলের দিন শিকে ছেঁড়ার মতন পাশের বাড়ির একটি মেয়ের ডাকে যে একসাথে ওর সঙ্গে মাধ্যমিক দেবে, তার সাথেই যা একটু ভাব হয়েছিল, আসলে রুবি রায় পাড়ায় নতুন এসেছিল, নিজেও লাজুক প্রকৃতির, বিশেষ মিশুকে ছিল না। হঠাৎই সেদিন টুটুর ডাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো আবির হাতে নিয়ে, সবার অলক্ষ্যে সেদিন অতনু ওর দুগালে বেশ করে আবির মাখিয়ে দিয়েছিল, মেয়ে তো লজ্জায় লাল, আর মুখ তুলতেই পারে না, অতনু তখন নিজেই উপযাচক হয়ে নিজের মুখটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল,
-আজকের দিনে আমাকে একটু আবির দেবে না?
সে কোনরকমে ওর কপালে একটু আবির ছোঁয়াল কী ছোঁয়াল না, ওইটুকু করতেই ঘেমে উঠল। এর মধ্যে টুটু একটা গোপন কথা ফাঁস করে দিল যে রুবি রায় নাকি খুব ভাল রবীন্দ্রসংগীত গায়, ব্যস আর যাবে কোথায়, বিকেলে পাড়ার গানের আসর বসে প্রতি দোলের সন্ধ্যায়, বিকেলে ওকে আসরে গাইতে হবে বলে সবাই চেপে ধরল টুটু বলল,
-আমি মেসোমশাইকে রাজি করিয়ে ওকে ঠিক নিয়ে আসব
আরও একটা কথা সেদিন জানা গেল ও নাকি খুব ভাল লেখে, স্কুলের ম্যাগাজিনে প্রতিবার লেখে এবং বাংলায় খুবই দক্ষতা আছে, অতনুর তো আরও মুগ্ধ হবার পালা। লেখা আর গান যে তারও নেশা, সেও তো কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক, আর কলেজে গাইয়ে হিসেবে তারও বেশ সুনাম আছে। সেদিন অবশ্য ওর নামটা জানা গিয়েছিল কিন্তু ওই রুবি রায় নামটা সবার মনে এমন ঢুকে গিয়েছিল যে ওর আসল নামটা সবাই ভুলেই গিয়েছিল।
 
সেদিন বসন্ত সন্ধ্যায় অতনু একটা রবীন্দ্রসংগীতই গেয়েছিল, যদিও সে সবরকম গানেই অভ্যস্ত, তবে সেদিন তার রবীন্দ্রসংগীতটা খুব ভাল হয়েছিল, সে গেয়েছিল, ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে একটুকু কথা শুনে…’ এরপরই রুবি রায়ের পালা, সেও কম যায় না। সে গাইল, ‘তোমার বীণায় গান ছিল, আর আমার ডালায় ফুল ছিল…’ ওর শেষ লাইনটা অতনুর মনে এখনও দাগ কেটে আছে শেষ লাইনটা ছিল, ‘ফাগুন বেলায়, মধুর খেলায়, কোনখানে হায় ভুল ছিল গো ভুল ছিল…’ সত্যি সেদিন ফাগুনবেলায় জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতন একটু মধুর খেলা হয়েছিল, তারপর আর সুযোগ হয়নি।
 
সেও দিল্লিতে চলে গিয়েছিল জেএনইউ-তে মাস্টার্স করতে, শেষ হবার সাথে সাথেই পিএইচডি আরম্ভ করেছিল। যাবার সময়ও দেখা করার সুযোগ হয়নি, টুটু মারফত জানতে পেরেছিল, রুবি রায়ের নাকি আমি চলে যাওয়াতে মনটা খুব খারাপ, দুজনেই দুজনকে ভালবেসে ফেলেছিল প্রায় কোন কথা না বলেই। টুটুর হাতেই আসার সময় একটা ছোট্ট চার লাইনের চিঠি দিয়ে এসেছিল।
 
তাতে লিখেছিল, ভালবাসা যে এত সুন্দর, মাধুর্য থাকে তা তোমার সাথে দেখা না হলে বুঝতে পারতাম না। আমি আশা করব আমি ফিরে আসা অবধি তুমি অপেক্ষা করবে। সেও একটা উত্তর দিয়েছিল, চিঠিটা বিষাদে ভরা।
চিঠিটা ছিল এইরকম,
 
আমার বাবা রিটায়ার করবেন, তাই হয়তো খুব বেশিদিন অপেক্ষা করবেন না। আমি বাবার মুখের ওপর কথা বলতে পারি না, তাই জানি না আপনার অনুরোধ আমি রক্ষা করতে পারব কি না।
আমার এই অক্ষমতাকে আপনি ক্ষমা করে দেবেন। কিছুদিনের জন্য এই ভাল লাগার সম্পর্কটুকু আমার জীবনে চিরকাল সঞ্চিত হয়ে থাকবে। আমার জন্যে গাওয়া আপনার গলায়, মনে পরে রুবি রায় গানটি আমার পাওয়া এক শ্রেষ্ঠ উপহার হয়ে থাকল। খুব ভাল থাকবেন, আর অনেক সাফল্য আপনার জীবনকে ভরিয়ে তুলুক এই কামনাই করি।
ইতি
আপনার রুবি রায়।’
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

২০২৬-এর নতুন সূর্য


Popular Top 10 (Last 7 days)