বাতায়ন/নবান্ন/ছোটগল্প/৩য়
বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| ছোটগল্প
শুভব্রত
ব্যানার্জী
নবান্ন
"ভগবান মঙ্গলময়। নিশ্চয়ই ভাল কিছু হবে সেটা তোর নবান্ন মারফতই হোক আর আদালত মারফত হোক। ঠাকুর প্রণাম করে তুই তোদের নবান্নে যা। আমি থাকি আমার নবান্নের ধারণা নিয়ে।"
হারাধন, পাঁচুবাবুর পাঁচ ছেলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তার ভাল নাম
অবশ্য অর্জুন মাহাতো, ছোট বয়সে একবার
গঙ্গাসাগরে পৌষ সংক্রান্তির মেলায় গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও
না পেয়ে তার মায়ের সে কি কান্না! ছেলে হারিয়ে গেলে মায়ের কাঁদা স্বাভাবিক, কোনও সাত্বনাই সেখানে কাজে আসে না। তবুও
পাঁচুবাবু অনেক চেষ্টা করেছিলেন বোঝাতে, বলেছিলেন,
-ভগবানের ইচ্ছার ওপর তো কারো
হাত নেই, তোমার তো আরো চারটে ছেলে
রয়েছে। যাদের একটাও নেই তাদের কত কষ্ট ভাব।
কিন্তু মায়ের প্রাণ সে
যুক্তি মানবে কেন! তিনি কেঁদে বলেছিলেন,
-আমি তাদের কথা ভাবতে যাব না, তুমি আমার অর্জুনকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো।
অনেক খোঁজাখুঁজি করেও যখন
তাকে ফিরে পাবার আশা সবাই প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল তখন হঠাৎ করে একদিন সকালে তাকে
কপিল মুনির আশ্রমের বাইরে খুঁজে পাওয়া যায়। তাকে কোলে নিয়ে তার মা আনন্দে
কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,
-বাবার আশীর্বাদে আমি আমার
ছেলেকে ফিরে পেয়েছি গো। এ যে আমার হারানিধি,
আমার
হারাধন।
সেই থেকে তার ডাকনাম হারাধন
হয়ে যায়। তার দাদু কিন্তু তাকে অর্জুন বলেই ডাকেন, তোফা মেজাজে থাকলে পার্থ বলে ডাকেন। এই নিয়ে দাদু-নাতিতে লেগেও যায় মাঝে
মাঝে। সেদিন যেমন হল আর কী।
অর্জুন মাহাতো ঝাড়গ্রামের
সাধুরাম চাঁদ মুর্মু উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পুরুলিয়ার পুঞ্চাতে তার
বিয়েরও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাঝখানে যোগ্য-অযোগ্যের চাপানউতোরে বাকিদের মতো
তারও চাকরি যায়। চাকরি ফিরে পাবার আশায় নবান্নের সামনে যে ধরনা হবার কথা আছে, সকাল সকাল তৈরি হয়ে
সে ওই ধরনাতে যোগ দিতে যাচ্ছিল। বেরোনোর আগে তাকে দেখে তার দাদু বলেন,
-আরে ও পার্থ এত সকাল সকাল
কোথায় যাচ্ছিস?
-দাদু তোমাকে কতবার বলেছি না যে আমাকে ওই নামে ডাকবে না, আমার লজ্জা লাগে।
-লজ্জা লাগবে কেন রে?
পার্থ
তো অর্জুনের আরেক নাম।
-হোক তবু তুমি আমাকে ওই নামে ডাকবে না। ওই নামে সবাইকে ডাকা
যায় না আর সবাইকে শোভাও পায় না। ওই নাম পাবার যোগ্যতা অর্জন করতে হয় আর সে
যোগ্যতা আমার নেই।
-নাম পেতে গেলেও যোগ্য হতে হয় নাকি!
-হয় বই-কি। কানা ছেলেকে কেউ যদি পদ্মলোচন বলে ডাকে তার ভাল লাগবে? ও তুমি বুঝবে না। মোট কথা তুমি আমাকে ওই নামে ডাকবে না, তুমি আমাকে হারাধন বা অর্জুন নামেই ডাকবে।
-আচ্ছা সে নাহয় হবে কিন্তু তুই এই সাতসকালে এত সেজেগুজে
কোথায় যাচ্ছিস?
-নবান্নে।
-'কতই রঙ্গ দেখাবি গুয়ে, তুলসী তলায় শুয়ে শুয়ে!' কালে কালে আর কত দেখব
রে! নবান্ন হয় অগ্রহায়ণ মাসে। আমাদের সময় নবান্নের দিন পাড়ায় একটা সাজোসাজো
রব উঠে যেত। বাড়িতে বাড়িতে নতুন চালের ভাতের গন্ধ, দুপুর থেকে নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠে তৈরির তোড়জোড়, নতুন গুড়ের গন্ধ। আহা! এখনও মনে পড়লে প্রাণ জুড়িয়ে
যায়। আর তোকে দেখ অসময়ে এই সাতসকালে সেজেগুজে নবান্নে চললি।
-আরে বাবা, এ নবান্ন সে নবান্ন
নয়। এটা কলকাতায়।
-আজকাল কলকাতায়ও নবান্ন হয় নাকি! তাও এই অসময়ে? শহুরে বাবুদের ব্যাপার-স্যাপার আলাদা। তবে শুনে ভাল লাগল
যে কলকাতায়ও চাষ হচ্ছে।
-আরে বাবা, নবান্ন একটা বড়
বিল্ডিং।
-বিল্ডিংয়ে চাষ! বাপের জন্মে শুনিনি বাবা।
-দাদু, তোমাকে নিয়ে পারা
যাবে না। ওখানে চাষ হয় না, রাজ্য কীভাবে চালানো
যায় নেতা-মন্ত্রীরা ওখানে বসে চিন্তা করেন।
-অ, তবে চিন্তন ঘর নাম
রাখলেই হতো। নবান্ন নাম রাখা কেন বাপু?
আমি তো
নবান্ন মানে নতুন চালের উৎসবকেই বুঝি।
-তোমার বোঝা দিয়ে তো আর রাজ্য চলবে না।
-সেটা অবশ্য বটে কিন্তু চাষ না হলেও তো পেট চলবে না আর পেট
না চললে শরীরও চলবে না। এই যে তুই মাস্টারি করছিস... ও ভাল কথা তোর মাস্টারির চাকরিটার কী হল? সবাই বলছে তোর নাকি মাস্টারির চাকরিটা আর নেই, কথাটা সত্যি?
হারাধন হতাশ ভাবে বলে,
-কিছুটা সত্যি। এখন সবকিছু
আদালত আর সরকারের হাতে। সেই জন্যেই তো নবান্ন যাচ্ছি।
-ওখানে গেলে কি চাকরি পাওয়া যায়?
-অন্য ব্যাপারে কিছু জানি না তবে আমাদের চাকরি ফিরে পাবার
ব্যাপারে আলোচনা হবে বলে শুনেছি।
-আলোচনা হলেই আবার মাস্টারি ফিরে পাবি?
-আশা তো করতেই হবে,
কথায়
আছে না, 'আশায় বাঁচে চাষা'। আমাদের অবস্থা এখন তাই। ভাবছি বিয়েটা আর করব না, সংসার কীভাবে চলবে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি তো
কোনো দোষ করিনি, দস্তুর মতো পরীক্ষা
দিয়ে পাশ করে চাকরি পেয়েছিলাম। তবুও কেন অযোগ্যতার তকমা দিয়ে আমার চাকরি বাতিল
হবে?
-ভগবান মঙ্গলময়। নিশ্চয়ই ভাল কিছু হবে সেটা তোর নবান্ন
মারফতই হোক আর আদালত মারফত হোক। ঠাকুর প্রণাম করে তুই
তোদের নবান্নে যা। আমি থাকি আমার নবান্নের ধারণা নিয়ে।
হারাধন তার দাদুকে প্রণাম করে
নবান্নের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment