বাতায়ন/নবান্ন/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| ছোটগল্প
কিশোর ঘোষাল
নতুন
চাল
"গঙ্গার দু-পাড়ের গ্রামে গ্রামে, হিন্দু-মুসলিম সব বাড়িতেই এখন চলছে নবান্ন উৎসব, ঘরে ঘরে নতুন চালের সুবাস। সে চাল এক্কেবারে সেকুলার চাল, শীদ্দা। এই নবান্নে অন্য কোন চাল চলেই না..."
অন্যদিন সন্ধে ছটায় ছুটি হলেও, শনিবার আমাদের আপিসে হাফ-ছুটি। মানে বিকেল চারটে নাগাদ ঝাঁপ
পড়ে যায়। কিন্তু মাত্র দুঘন্টার তফাতে পুরো দিনের মধ্যে কেন হাফ-ছুটি বলা হয়, আজ পর্যন্ত বুঝিনি। তবে ওই দিন চারটে নাগাদ আপিস থেকে
বেরিয়ে যে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি— সে কথাটা সত্যি। সেদিক থেকে দেখলে কথাটা হাঁফ-ছুটি অর্থাৎ
হাঁফ নেওয়ার ছুটি বলাটাই বেশ যুক্তিযুক্ত। সে যাগ্গে, আসল কথায় আসি।
এই শনিবার আড়াইটে নাগাদ আমরা
তিনজন শীদ্দার চেম্বারে গেলাম একটা আরজি নিয়ে। শীদ্দা, মানে শীতাংশুদা আমাদের কোঅর্ডিনেটর, অর্থাৎ ইমিজিয়েট বস। তিনজনের মধ্যে আমিই নাটের গুরু, তাই চেম্বারে ঢুকে বললাম,
-শীদ্দা, আজকে একটু আগে ছেড়ে
দেবেন, এই সোয়া তিনটে নাগাদ?
আমরা
তিনজন নবান্নে যাব।
রীতিমতো চমকে উঠে শীদ্দা বলল,
-তার মানে? এসব হুজুগ তোদের
মাথায় কে ঢোকাল? নিজের পায়ে নিজেই
কুড়ুল মারতে চলেছিস। এ আমি বলে দিলাম... ছুটির তো কোন প্রশ্নই নেই বরং অফিস কেটে
তোরা নবান্ন যাওয়ার হিড়িক তুলেছিস বলে, আমি হেড-অফিসে কমপ্লেন করব। সুখে থাকতে তোদের ভূতে কিলোয় না?
নবান্নে যাওয়ার কথায় শীদ্দার
কেন এত আপত্তি, আমাদের মাথায় ঢুকল না।
নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। শীদ্দা আবার বলল,
-আর যদি যেতেই হয়,
আজকের
দিনের জন্যে ব্যাকডেটে ছুটির দরখাস্ত কর, তিনজনেই। তারপর যেখানে খুশি যা, যা খুশি কর। নবান্ন গিয়ে টিয়ার গ্যাস খা, পুলিশের লাঠির বাড়ি খা, জেলে যা, অফিসের কিচ্ছু যাবে আসবে না। পুলিশ ইনভেস্টিগেট করতে এলে বলব, ‘তোরা আজ ছুটিতে, ছুটির দিনে কোন এমপ্লয়ি কোথায় কোন অভিযান
করছে, তার দায় অফিসের নয়’।
আমাদের মধ্যে নীলু, মানে নীলকান্ত একটু একরোখা ধরনের। রেগে গেলে বসকেও দু কথা
শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না। একটু রাগী স্বরে বলল,
-শীদ্দা, আপনি কোন নবান্নের
কথা বলছেন? আমরা যাব বিজনের গ্রামের
বাড়ি। ওদের ওখানে এই অঘ্রানের শেষে নতুন ধান ওঠা শুরু হয়, নতুন
ধান দিয়ে নবান্ন পুজো হয়, নতুন চালের পিঠেপুলি পায়েস হয়...
সেখানে টিয়ার গ্যাস খাওয়ার কথা আসছে কোথা থেকে? পুলিশের লাঠিই বা খেতে যাব কোন দুঃখে?
এবার শীদ্দার অবাক হবার পালা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমাকে বললেন,
-বিজন, তোদের গ্রামের বাড়ি
কোথায়?
-গঙ্গার ওপাড়ে।
-কিন্তু গঙ্গার ওপাড়েই তো নবান্ন।
আমি এতটুকু আমতা-আমতা না করে, দৃঢ় স্বরে বললাম,
-আজ্ঞে হ্যাঁ, শীদ্দা। গঙ্গার ওপাড়েই আমতায় আমাদের গ্রামের বাড়ি। এসপ্ল্যানেড থেকে চারটে নাগাদ একটা বাস আছে, সেটা ধরতে পারলে বাড়ি পৌঁছে যাবে সন্ধে নাগাদ।
কাল রোববারটা থেকে, সোমবার সকালে আমরা
তিনজন সরাসরি অফিসে আসব। তবে সেদিন আসতে একটু দেরি হবে, এই ধরুন এগারোটা... সেটা বলতে আর পারমিশান নিতেই আপনার কাছে
আসা।
শীদ্দা কিছু বলল না, হতবাক মুখে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। একটু পরে আমি আরও বললাম,
-সেখানে সব বাড়িতেই এখন নবান্ন উৎসব শুরু হয়েছে। আর শুধু
আমাদের ওদিকেই বা কেন? গঙ্গার দু-পাড়ের
গ্রামে গ্রামে, হিন্দু-মুসলিম সব বাড়িতেই এখন চলছে নবান্ন
উৎসব, ঘরে ঘরে নতুন চালের সুবাস। সে চাল এক্কেবারে সেকুলার
চাল, শীদ্দা। এই নবান্নে অন্য কোন
চাল চলেই না...
--০০—
No comments:
Post a Comment