বাতায়ন/নবান্ন/অন্য
চোখে/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| অন্য চোখে
মণিজিঞ্জির
সান্যাল
শস্যের
উৎসব নবান্ন
সমৃদ্ধি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
"আবহমান বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক গ্রামীণ উৎসব। নবান্ন উৎসবের সঙ্গে বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। এটি গ্রামীণ জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।"
নবান্ন উৎসব হেমন্ত ঋতুর, বিশেষ করে অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে পালিত হয়। একসময়
কার্তিক মাসে দুর্ভিক্ষ দেখা দিত, তাই নতুন ধান ঘরে
তোলার জন্য এই সময়ে মানুষের বিশেষ প্রতীক্ষা থাকত। নবান্ন উৎসব ফসল তোলার আনন্দ
উদযাপন করে এবং কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমের ফল পাওয়ার মুহূর্তকে চিহ্নিত করে। গ্রামবাংলার
উৎসবের বর্ষপঞ্জির শুরুটা হয় নবান্ন দিয়ে আর সমাপ্তি ঘটে চৈত্রসংক্রান্তির চড়কে।
নবান্ন উৎসব হেমন্ত ঋতুতে
পালিত হয়, বিশেষ করে অগ্রহায়ণ মাসে
নতুন আমন ধান কাটার পর। এই উৎসবটি নতুন শস্য ঘরে তোলার আনন্দে উদযাপন করা হয়। এই
উৎসবের মূল কারণ হল নতুন ধান থেকে তৈরি চাল দিয়ে ভাত, পিঠে, পায়েস ইত্যাদি
রান্না এবং এই রান্নাকে কেন্দ্র করেই এই উদযাপন। কোথাও কোথাও মাঘ মাসেও এই উৎসব
পালন করা হয়।
‘নবান্ন’ পশ্চিমবঙ্গের ধান চাষিসের মধ্যে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উৎসব। ‘নবান্ন’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল ‘নতুন অন্ন’ বা ‘নব অন্ন’। ‘নব’ মানে নতুন এবং ‘অন্ন’ মানে ভাত বা খাবার। এই উৎসব সাধারণত বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামের বরাক উপত্যকায় খুব সুন্দর ভাবে উদ্যাপন করা
হয়।
নবান্ন উৎসবে নতুন চাল দিয়ে
তৈরি করা হয় ভাত, পিঠে,পায়েস, ক্ষীর এবং নতুন গুড়
দিয়ে তৈরি করা হয় নানান স্বাদের মিষ্টি। এই উৎসব মুখরিত হয় নতুন ধানের অন্ন
দেবতাকে উৎসর্গ করে, এরপর আত্মীয়স্বজনদের
পরিবেশন করা হয় নানান ধরনের পিঠে এবং পায়েস। পায়েস এবং পিঠের গন্ধে ভরে থাকে
চারপাশ। প্রতিটি বাড়িতে রান্না হয় নতুন চালের ভাত। নতুন ধান থেকে তৈরি চালের
ভাতই হল নবান্নের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের পিঠে। যার
মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভাপা পিঠে, চিতই পিঠে, পাটিসাপটা, পুলি পিঠে, মালপোয়া, নকশি পিঠে, এবং ঝিনুক পিঠে।
ভাপা পিঠে: জলীয় বাষ্পে সেদ্ধ
করা এক ধরণের পিঠে।
চিতই পিঠে: একটি সহজ এবং
জনপ্রিয় পিঠে।
পাটিসাপটা: পাটিসাপটা একটি
জনপ্রিয় বাঙালি পিঠে, যা চালের গুঁড়ো, ময়দা, দুধ, চিনি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হয় এবং এর ভেতরে ক্ষীর বা নারিকেলের
পুর দেওয়া হয়। এটি সারা শীতকালেও তৈরি করা হয় এবং এটি বিভিন্ন ধরনের হয়, যেমন- চালের গুঁড়োর পাটিসাপটা, ক্ষীরসা পাটিসাপটা,
এবং
সুজি দিয়ে তৈরি পাটিসাপটা।
পুলি পিঠা: নারকেল বা গুড়ের
পুর দিয়ে তৈরি এক ধরণের পিঠে, যা ভাজা বা ভাপে
সেদ্ধ করা যায়।
মালপোয়া: চালের গুঁড়ো বা
ময়দার মিশ্রণ দিয়ে তৈরি, যা সাধারণত গুড় বা
চিনির সিরায় ডুবিয়ে ভাজা হয়।
নকশি পিঠে: নকশা করা বা
কারুকার্যময় পিঠে।
ঝিনুক বা খেজুর পিঠে: ঝিনুক বা খেজুরের
মতো দেখতে পিঠে।
আগেকার দিনে গ্রামবাংলায় আরও
নানান রকম পিঠে তৈরি হতো।
যেমন—
ছাঁচ পিঠে: ছাঁচ ব্যবহার করে
তৈরি করা হয়।
ছিটকা পিঠে: একটি পাতলা পিঠে।
চ্যাপটি পিঠে: এক ধরণের চ্যাপটা
পিঠে।
চুই পিঠে: এটি এক ধরনের একটি
ভাজা পিঠে।
গোলাপ পিঠে: গোলাপের মতো দেখতে
পিঠে।
কদম পিঠে: কদম ফুলের মতো
দেখতে।
এছাড়াও সুজি পিঠে, দুধ পিঠে।
এই নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র
করেই শুরু হয় নানান রকম উৎসব এবং নানান স্বাদের পিঠে তৈরির প্রস্তুতি। নতুন চাল ও
দুধ দিয়ে তৈরি করা হয় জনপ্রিয় ক্ষীর। অনেক সময় নতুন গুড় দিয়েও নতুন অন্ন
খাওয়া হয়।
নবান্ন উৎসবে চাল-মুড়ি-খই-সহ অন্যান্য
নানা রকমের খাবারও তৈরি করা হয়। নবান্ন উৎসব পালন করা হয় নতুন আমন ধান ঘরে তোলার
আনন্দে, যা 'নতুন অন্ন' বা 'নব অন্ন' নামেও পরিচিত। এই
উৎসবটি একটি ঋতুভিত্তিক এবং শস্যভিত্তিক লোকউৎসব, যা সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান কাটার পর এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। এটি
নতুন ফসল তোলার খুশির উদযাপন এবং কৃষিজীবী মানুষের আনন্দ ও সমৃদ্ধি কামনার প্রতীক।
নবান্ন উৎসব পালনের বিভিন্ন কারণ আছে।
প্রথমত:
নতুন ফসল উদ্যাপন: নতুন আমন ধান কাটা
এবং তা ঘরে তোলার আনন্দে উদ্যাপন করা হয়।
কৃষিভিত্তিক
সংস্কৃতির প্রতীক:
এটি নতুন ফসল তোলার পর
কৃষকদের তাদের শ্রমের ফল উদ্যাপন করার একটি উৎসব। নতুন ধানের ভাত এবং বিভিন্ন ধরনের পিঠে
ও পায়েস তৈরি করা হয়। এটি কৃষিচক্রের সফল সমাপ্তির প্রতীক
এবং বাংলার কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উৎসবের মাধ্যমে কৃষকের
আনন্দ, তাদের শ্রমের প্রতি সম্মান
এবং উর্বরতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
দ্বিতীয়ত:
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি: এটি আবহমান বাংলার
একটি ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক গ্রামীণ উৎসব। নবান্ন উৎসবের সঙ্গে বাংলার সমৃদ্ধ
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। এটি গ্রামীণ জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। লোকগীতি, বাউল গান, নাচ, নাটক, সাপ খেলা, বানর খেলা এবং পুতুল নাচের মতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
আয়োজিত হয়। এই উৎসব বাংলার সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এটি কৃষি ও প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব।
তৃতীয়ত:
সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা: অধিক শস্যপ্রাপ্তি, ভাল বৃষ্টি এবং সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
চতুর্থত:
নববর্ষের প্রতীক: এই উৎসবটিকে বাংলার
নববর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখা হয়, যা নতুন শস্যের মাধ্যমে বছরটিকে বরণ করে নেয়।
পঞ্চমত:
পারিবারিক ও সামাজিক
মেলবন্ধন: নবান্ন শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসবও। এই উৎসবের মাধ্যমে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই
একত্রিত হয় এবং আনন্দ ভাগ করে নেয়। এই সময় গ্রাম-বাংলার মানুষ একে অপরের বাড়িতে
নতুন চালের ভাত ও পিঠে ভাগ করে নেয়। পাড়ায় পাড়ায় এই উৎসবের আমেজ তৈরি হয়।
তখনকার নবান্ন এবং
এখনকার নবান্ন:
তখনকার নবান্ন উৎসব মূলত
গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে উৎসবটি
এখনো গ্রামীণ জীবনে প্রচলিত থাকলেও, শহরাঞ্চলে বড় আকারে
মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আধুনিক
বিনোদনের (যেমন সার্কাস, নাগরদোলা, বায়োস্কোপ) মাধ্যমে পালিত হয়, যা এই উৎসবের একটি নতুন রূপ দিয়েছে।
আজ থেকে বহুবছর আগের নবান্ন
উৎসবের রূপ ছিল একেবারেই অন্যরকম। যেহেতু এটি একটি গ্রামীণ উৎসব, তাই প্রধানত কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত হতো। আচার
এবং নিয়ম কানুনের মধ্যেও ছিল এক সুন্দর রূপ। নতুন আমন ধান কাটার পর ঢেঁকিতে ধান
ভেঙে চাল তৈরি করা হতো। নতুন চাল থেকে ভাত,
পিঠে-পুলি, পায়েস, মুড়ি ও খই তৈরি করে
খাওয়া হতো। উৎসব উপলক্ষে পাড়ায়-পাড়ায় জারি-সারি, কীর্তন ও পালাগানের আসর বসত। মুখোশধারী দল বাড়ি বাড়ি ঘুরে
নাচগান করত। কৃষকরা নতুন পোশাক কিনত। এই উৎসব ছিল মূলত পারিবারিক ও সামাজিক, যা আনন্দ, সম্প্রীতি এবং
সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করত।
এখনকার নবান্ন উৎসব:
এটি এখন গ্রামীণ এবং শহুরে
উভয় পরিবেশেই পালিত হয় এবং একটি আনুষ্ঠানিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। যেমন— আচার
গ্রামে এখনো ঐতিহ্যবাহী
প্রথাগুলো পালিত হয়, তবে তা আগের মতো নয়।
তবে কোথাও কোথাও এই উৎসবকে কেন্দ্র করে নানান ধরনের মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের
আয়োজন করা হয়, যেখানে লোকসংগীত, নৃত্য, এবং নাটকের পাশাপাশি
আধুনিক বিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে, যেমন সার্কাস, নাগরদোলা, বায়োস্কোপ ইত্যাদি
এর অংশ হয়ে উঠেছে।
পরিবেশ: এখন এটি একটি বড়
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের
মানুষের মিলন ঘটে। নবান্ন যদিও কোনো ব্রত বা পূজা নয়, তবুও পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের বেশিরভাগ অঞ্চলে সামাজিক
ভাবে এই উৎসবটি পালিত হয়। গ্রামীণ পরিবেশে নবান্ন উৎসবের প্রচলন বেশি থাকলেও শহরেও
এই উৎসব পালিত হয়। নবান্ন মূলত শস্য উৎসব। বাংলায় নবান্ন পালনের রীতি কত পুরোনো, তার দিনক্ষণ ঠিক করে বলার জোরালো কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ আজ আর
অবশিষ্ট নেই। অনুমান করা যেতে পারে, নিজে খেয়ে ও অন্যকে
খাইয়ে তৃপ্ত হওয়ার বাঙালির যে চিরন্তন ভাবনা,
তারই
বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নবান্ন উৎসবে।
আজ যদিও নবান্ন উৎসব অনেকটাই
তার জৌলুস হারিয়েছে। বাঙালির প্রধানতম উৎসবটি বিক্ষিপ্তভাবে পালন করা হলেও এখন আর
ঘটা করে সাড়ম্বরে নবান্ন পালনের রীতি খুব বেশি চোখে পড়ে না। সনাতন
হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো এই লোকাচারটি পালন করা হয় পুরোনো রীতি মেনে, কিন্তু বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান সমাজে নবান্ন এখন অনেকটাই
ব্রাত্য।
বাঙালি সমাজে একসময়
শস্যকেন্দ্রিক নানা রীতিনীতি প্রচলিত ছিল। কারণ, ধানই ছিল সমৃদ্ধির শেষ কথা। আকাশমণি,
কপিলভোগ, কাজলা, কামিনী, কালিজিরা, কাশফুল, কুসুমকলি, ঘৃতশাল, চন্দনচূড়া, চন্দ্রপুলি, চিনিসাগর, জটাশালী, জনকরাজ, জামাইভোগ, ঝিঙেমাল, ঠাকুরভোগ, তিলসাগরী, তুলসীমালা, দাদখানি, দুধকমল, নীলকমল, পঙ্খিরাজ, পদ্মরাগ, বাকশালি, বেগম পছন্দ, ভাদ্রমুখী, মতিহার, ময়ূরপঙ্খি, মানিক শোভা, মুক্তাঝুরি, রাঁধুনিপাগল, রানিপাগল, রাজভোগ, সন্ধ্যামণি, সূর্যমুখী, হরিকালি, হীরাশাল ইত্যাদি হরেক জাতের ধান উৎপাদিত হতো বাংলাদেশে।
আজ বাঙালি হারিয়েছে তাঁর
আন্দেশা, ক্ষীরপুলি, ক্ষীরমোহন, ভক্তি, পাক্কন পিঠে, চুকা পিঠে, খান্দেশ পিঠে পাতা পিঠে, পোয়া পিঠে, তেলপোয়া, দানাদার, দুই বিরানি, জালি পিঠে, মুখসওলা, ছাঁট পিঠে, জামাইভোগ, কন্যাভোগ, হাফরি পিঠে, কলা পিঠের মতো কতশত পিঠাপুলিকে। কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে
যেতে বসেছে নতুন ধানের চাল দিয়ে এসব পিঠে তৈরির কলাকৌশল।
আধুনিকতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের
কারণে অনেক এলাকায় নবান্ন উৎসবের জৌলুস কিছুটা কমে গেলেও, এখনও গ্রাম বাংলায় এই উৎসব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে
পালিত হয়। অনেক স্থানে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বড় আকারের মেলা ও সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা একে আরও জনপ্রিয়
করে তুলেছে। কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিবর্তন, নবান্ন উৎসবের প্রতি ঐতিহ্যবাহী মানুষের আগ্রহ কিছুটা
কমিয়ে দিয়েছে।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment