বাতায়ন/নবান্ন/গল্পাণু/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন | গল্পাণু
সুনীল রায়
নবান্নে
"দেখো পাখি আমার তো কিছু নেই। তাই তো আমার বউ চলে গেছে লোকের সাথে। তুমি মিছেই আমাকে নিয়ে ভাবো। তার চেয়ে কোনো ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করে নাও। তোমার বিয়েতে আমি খুব খেটে দেব।"
রতন তার মেয়ের বিয়ে দেবার
পরে সংসারে একা। ঘরে নতুন ফসল উঠেছে। তার স্ত্রী মালতি চলে গেছে মেয়েকে রেখে তার
মনের মানুষের সঙ্গে। নতুন করে ঘর পেতেছে ইছামতির চরে। তার বর জেলেনৌকোয় মাছ ধরে।
পলাশীর হাটে মালতি আর নবীন হাত ধরাধরি করে ঘুরছিল। রতন সরে গিয়েছিল ওদের দেখে।
ঘুরে ঘুরে সবজি কিনছে, শাড়ি চুড়ি ফিতে
কিনছে। পৌষপার্বণে নবান্নে বাড়িতে পিঠে বানাবে। মকর সংক্রান্তির দিনে নদীতে
পূণ্যস্নান করে নতুন শাড়ি পরবে মালতি।
রতন ভাবে, আমার তো কেউ নেই। শাড়ি কিনতে হবে না। নিজের জন্য একটা
সার্ট নিলেই হবে। মেয়ের বাড়িতে খেজুর গুড় নারকেল চাল গুঁড়ি আর মেয়ে-জামাইয়ের পোশাক পৌঁছোতে হবে। তাই সে পলাশীর হাটে এসেছে।
একদিন তার সব ছিল। মালতি ছিল, মালতির ভালবাসা ছিল। সুখের সংসার ছিল। তারপর মালতি মাঝে
মাঝে বাপের বাড়ি যেত উজানে নবীনের নৌকোয় চড়ে। নৌকোতেই ফিরে আসত রতনের বাড়িতে।
নৌকোতে বসে নবীনের সঙ্গে সংসারের গল্প বলতে বলতে একদিন তার রতনকেই হারিয়ে ফেলল।
একদিন শুনশান রাতে আমার রতন
আর তার মেয়ে ঘুমে মগ্ন। সকালবেলা ঘুম ভেঙে দেখে মালতি নেই। খোঁজ নিয়েছে শ্বশুর
ঘরে, আসেপাশে আত্মীয়বাড়িতে। আর
ফিরে আসেনি মালতি। একাই বড় করে তুলেছে মেয়েকে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করিয়ে একটি ডাকপিয়োন ছেলের
সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে।
এখন রতন ঝাড়া হাত-পা। কেউ নেই
বাড়িতে। নিজেই রান্না করে খায়। পৌষ সংক্রান্তি সবার বাড়িতেই পিঠে হচ্ছে। রতন আর
পিঠের ঝামেলাতে যাবে না। চিড়ে, নারকেল আর গুড় মেখে খেয়ে
রাত কাটিয়ে দেবে। জ্যোৎস্নার আলো উঠোনে এসে পড়ছে। এমন সময় পাখি এসে দরজা ঠেলছে,
-দরজা খোলো। এখনই কি ঘুমিয়ে পড়েছ?
রতন বলে,
-না না। পৌষের ঠান্ডা জাঁকিয়ে পড়েছে। তুমি এত রাতে কেন এসেছ?
-তোমার জন্যে
পিঠে নিয়ে এসেছি।
-এত রাতে, লোকে দেখলে কে কী ভাববে?
-ভাবুক তো।
পিঠেগুলো খেয়ে নাও।
-তুমি এসে ঠিক
করোনি।
-তোমাকে দেখতে
ইচ্ছে করল খুব, তাই চলে এলাম।
-দেখো পাখি
আমার তো কিছু নেই। তাই তো আমার বউ চলে গেছে লোকের সাথে। তুমি মিছেই আমাকে নিয়ে
ভাবো। তার চেয়ে কোনো ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করে নাও। তোমার বিয়েতে আমি খুব খেটে
দেব।
পাখি বলে,
-আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment