বাতায়ন/ধারাবাহিক
উপন্যাস/৩য় বর্ষ/৪২তম সংখ্যা/৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক উপন্যাস
অজয় দেবনাথ
মউ
[১৯তম পর্ব]
"ভোরবেলায় হাঁটতে খুব ভালই লাগবে। অনেকদিন ভোরে বেরোনো হয়নি। শিয়ালদা থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাসনাবাদ লোকালে ওঠে। জানালার ধারে একটা সিট নিয়ে বসে পড়ে। এত ভোরে হাসনাবাদ লোকাল ফাঁকা।"
পূর্বানুবৃত্তি
মা তখন খুব ছোট। শীতকালে খুব
কনকনে শীত পড়ত তখন। বাইরে ঘন কুয়াশা, ঘন কুয়াশায় এক হাত
দূরের জিনিসও দেখা যেত না, টুপ টুপ করে কুয়াশা
ঝরে পড়ত বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটার মতো। ঠান্ডায় সমস্ত শরীর কনকন করত, হাত-পা অসাড় সাদা হয়ে যেত। একে তো গ্রাম, তায় খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির কুঁড়েঘর। এখনকার মতো পরিবেশ
দূষণ ছিল না তখন, ছিল না ইলেকট্রিক।
তক্তাপোশ না থাকায় রাত্রে মাটিতে বিছানা করে শুতে হত। দিদা লেপকাঁথা দিনের বেলায়
মাঠে রোদে দিয়ে রাখতেন। উলটে দিতেন মাঝে মাঝে, রোদ কমে যাবার আগেই সেগুলো ভাঁজ করে তুলে নিতেন। রাতে শোবার সময় মাটিতে চটের
বস্তা মোটা করে পেতে তার ওপরে বিছানা পাততেন,
লেপকাঁথা
তখনও গরমগরম থাকত মায়ের বুকের ওমের মতন। তবুও শীত মানত না। তাই মাটির হাঁড়িতে
ঘুঁটের আগুন করে সরা চাপা দিতেন ধোঁওয়া বেরোনোর মতো জায়গা রেখে, সেটা রাখা থাকত বিছানার পাশে মশারির বাইরে। তাতে ঘর খানিক
গরম হত।
তার নিজের ছোটবেলার কিছু কথাও
মনে পড়ে গেল সুখের। কত দ্রুত দৌড়োতে পারে মন,
আলোর
থেকেও দ্রুত তার গতি। তাদের গ্রামে রক্ষাকালী পুজো হয় অঘ্রান মাসে, শুক্লপক্ষের শেষ মঙ্গলবার। বরাবর এমনই হয়ে আসছে। সেদিন খুব
জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ে। সুখের মনে হয় এমনও হতে পারে সারারাত খোলা আকাশের নীচে থাকার
জন্য ঠান্ডা অনেক বেশি মনে হয়। যাইহোক,
এই
রক্ষাকালী পুজো খুবই প্রাচীন। এই পুজোর সূত্র ধরেই জায়গাটার নাম, এমনকি বাসস্টপের নামও রক্ষাকালী-তলা।
রক্ষাকালী-তলা এক জোড়া গাছকে
কেন্দ্র করে। একই সঙ্গে বট ও অশ্বত্থ গাছ। অসংখ্য ঝুরি নামিয়ে বিশাল জায়গা জুড়ে
দাঁড়িয়ে আছে। মূল গোড়া কোনটা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। কতদিনের গাছ এবং গাছকে
কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রক্ষাকালী পুজো কত বছরের প্রাচীন তাও বলা যায় না। গ্রামের
প্রবীণ মানুষদের মুখে যেটুকু জানা যায় তারাও তাদের ঠাকুর-দাদাদের কাছে শুনেছেন।
কয়েকশো বছরের পুরোনো তো বটেই। একবার বাংলা ষোলো সালের প্রচণ্ড ঝড়ে উলটে পড়েছিল গাছ, সেই থেকে গাছ কাত হয়ে থেকেই বিস্তার করেছে তার শিকড়, ডালপালা। গাছ দুটোর গুঁড়ি এতটাই মোটা অন্তত কুড়ি জন জোয়ান
মানুষ দুহাত প্রসারিত করে বেড় দিলেও ধরতে পারবে না মনে হয়।
গ্রামের রক্ষাকালী পুজোর কিছু
বৈশিষ্ট্য আছে। সকলেই মনে করে মা রক্ষাকালী খুবই জাগ্রত। সকলেই খুব ভক্তি করে, মনে হয় ভয়ও করে। সারাদিন উপোস করে প্রতিমা তৈরি হয়। বাঁশঝাড়
থেকে ভোরবেলায় বাঁশ কেটে এনে কাঠামো, বাঙর থেকে মাটি এনে
ডাবের জলে মাটি মেখে প্রতিমা তৈরি, প্রতিমার রং, গহনা, আর যা কিছু সবটাই
রাত্রে পুজো শুরুর আগে করতে হয়। সারারাত পুজোর পরে ভোরে সূর্য ওঠার আগেই বাঙরের
জলে প্রতিমা বিসর্জন। একদিন সূর্য ওঠা থেকে পরের দিন সূর্য ওঠার আগে সবটাই সম্পন্ন
হয়। সমস্ত গ্রামবাসী এমনকি কর্মসূত্রে যারা প্রবাসী তারাও এই দিনে সকলে মিলিত হয়ে
খুব নিষ্ঠা ভরে উপোসি থেকে পুজোয় সামিল হন।
কিন্তু আজ কেন এত পিছনে ছুটছে
মন! সচরাচর এমন তো হয় না। আশ্চর্য হয় সুখ। জ্বর জ্বর ভাবটাও আর লাগছে না, কপালে হাত দিয়ে পরখ করে। ঘুমটাও কেটে গেছে, মোবাইলে ঘড়িটা দেখে তিনটে চল্লিশ। আর ঘুমিয়ে লাভ নেই। ভোর
হয়েই গেছে প্রায়। উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয়। ভোরেই বেরিয়ে পড়ে, শিয়ালদা পর্যন্ত হেঁটেই যাবে মনস্থ করে। ভোরবেলায় হাঁটতে
খুব ভালই লাগবে। অনেকদিন ভোরে বেরোনো হয়নি। শিয়ালদা থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাসনাবাদ
লোকালে ওঠে। জানালার ধারে একটা সিট নিয়ে বসে পড়ে। এত ভোরে হাসনাবাদ লোকাল ফাঁকা।
মাকে আজ বেশ চমকে দেওয়া যাবে। অনেকদিন দেখা হয়নি মায়ের সঙ্গে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment