বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/ধারাবাহিক উপন্যাস/৩য় বর্ষ/৪১তম
সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা
| ধারাবাহিক উপন্যাস
অজয় দেবনাথ
মউ
[১৮তম পর্ব]
"শীত করছে কেন! হঠাৎই মায়ের কথা মনে এল। মায়ের জন্য মন কেমন করতে লাগল তার। মাকে একবার দেখতে ইচ্ছে হল। কিন্তু এখন যায় কী করে! যে পরিমাণ চাপের মধ্যে দিয়ে চলতে হয়।"
পূর্বানুবৃত্তি কলকাতার
আলো-আঁধারিতে শুভ্রা হারিয়ে যাবার পর বেশ কদিন কোনও খোঁজখবর ছিল না, ক্লাসেও যায়নি। সুখও খবর নেয়নি শুভ্রার। ক’দিন পরে শুভ্রা জানতে চাইল, কবে সে তার মাকে এখানে নিয়ে
আসবে? সুখ বলল, দেরি আছে, সেদিনই তো জানিয়েছে এখন নয়। শুভ্রা বলল, সুখ কবে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে
দেখা করতে পারবে। তারপর…
শুভ্রা যেন দেখতে পাচ্ছিল
তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য দেওয়াল উঠেছে, যে দেওয়ালটা ক্রমশ
বেড়েই চলেছে। কী করে সে এই দেওয়ালটা ভাঙবে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না। সবটাই যেন
তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। আর যতই বুঝতে পারছিল না ততই তার মন এদিক-ওদিক ব্যর্থ
ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সন্দেহ দানা বাঁধছিল মনে। কিন্তু সুখের বিরুদ্ধে সন্তর্পণে অনেক
চেষ্টা করেও কোনো খবরই সে জোগাড় করতে পারছিল না। বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করার
টোপটাও সুখকে গেলাতে ব্যর্থ হল সে। ‘রক্তকরবী’তে পড়েছিল পাখিকে দু-ভাবে বশ করা
যায়। হয় আফিম খাইয়ে নেশার ঘোরে, নইলে বল-প্রয়োগে। বলে
যদি নাহয় ছলের আশ্রয় নিতেই হবে। নইলে তো রইলই শকুন্তলার অভিজ্ঞানের মন্ত্র, শেষ অস্ত্র! দেখাই যাক।
সুখকে বলল, যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে।
বাবা-মা দুজনেই তাকে দেখা করতে বলেছেন। সুখ মার্জিত ভাবে জানাল, সে তো যা বলার বলেছেই,
খুব
জরুরি না হলে পরীক্ষার আগে দেখা করা যাবে না,
আর
বাবা-মা নিশ্চয়ই তার উদ্দেশ্যের কথা বুঝবেন।
সুখ গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ
যথেষ্ট রিজনেবল দেখে শুভ্রাও হালকা হয়ে নিজেকে ফুরফুর করে মেলে ধরল। সুখকে বলল, তার রাজকন্যাকে এত কষ্ট দিচ্ছে কেন সুখ। সুখ আশ্চর্য হয়ে
বলল, সে তো বুঝতেই পারছে না কীভাবে
তাকে কষ্ট দিচ্ছে! কপট কান্নায়, ছলনায় শুভ্রা সুখের
বুকে মাথা রেখে ফোঁপাতে লাগল। সুখ নিজেকে বেঁধে রাখতে পারল না আর। শুভ্রার মুখ ধরে
তার চোখের জল মুছিয়ে দিল। আদরে আদরে ভরিয়ে দিল শুভ্রাকে। আবারও আদিম খেলায় নিজেকে
ভাসিয়ে দিল শুভ্রার অববাহিকার তরঙ্গ-প্রান্তে, মোহনায়।
২১
পরম শরীরী উত্তেজনার অবসানে
সুখ ফিরে গেল হস্টেলে। ইদানীং যেন আগের মতো তৃপ্তি পাচ্ছে না সুখ। সেটা তার
কেরিয়ার সংক্রান্ত চিন্তার কারণে হতে পারে আবার অন্য কোনো কারণেও হতে পারে, ঠিক বুঝতে পারে না সে। কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এই
শুভ্রা সেই শুভ্রাই তো, তবে! বার বার প্রশ্ন
করে নিজেকে কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। হয়রান হয় নিজের কাছেই। মাঝে মাঝে মনে হয়
সত্যিই শুভ্রার মন বলে কোনো বস্তু আছে তো! সে কেন আর খুঁজে পায় না তার সঠিক
ঠিকানা! কেবলই মনে হয় ঠিক হচ্ছে না যেন,
হচ্ছে
না। কোথাও কোনো এক বলয়ের মধ্যে শুভ্রা আটকে রেখেছে নিজেকে, কিছুতেই মিলছে না। যেমন করে চখাচখির মিলন হয়, যেমন করে জীবন তরঙ্গে ভেসে চলে মরালমরালী, কপোতকপোতী যেমন করে মিলে যায়, খেতে, বসতে একাত্মভাবে, কিছুতেই যেন একে অন্যকে ছাড়তে চায় না। তেমন আর বোধ করে না
কেন সে! প্রেম মানে কী শুধুই শরীর, মনের কোনো অস্তিত্ব
নেই! প্রকৃত প্রেমে মন থাকবে না কেন! থাকলেও মন আর শরীরের বন্ধন কোথায়! শরীর কেন
মনের খবর রাখবে না! তার শুভ্রা কী শুধুই শরীর সর্বস্ব একটা মেয়ে! কিন্তু সে তো তার
সমস্ত মন দিয়েই শুভ্রাকে ভালবেসেছে, শুভ্রাকেও তাই মনে
হত। তবে কেন আজ মনে হয় শুভ্রার এই ভালবাসা মনহীন! শরীরের প্রয়োজন অবহেলা করা যায়
না নিশ্চয়ই তাই বলে মন তাকে বুঝবে না! এইসব জটিল তত্ত্ব মনে হয় তার। কিছুতেই
সুরাহা করতে পারে না।
শুয়ে শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতেই
খুব শীত করতে লাগল তার। কপালে হাত দিয়ে জ্বর এসেছে কিনা দেখল। না, গা তো গরম নয় তবে শীত করছে কেন! হঠাৎই মায়ের কথা মনে এল।
মায়ের জন্য মন কেমন করতে লাগল তার। মাকে একবার দেখতে ইচ্ছে হল। কিন্তু এখন যায় কী
করে! যে পরিমাণ চাপের মধ্যে দিয়ে চলতে হয়। তবু যদি মন খুব উচাটন হয় হঠাৎ করে ঘুরে
আসবে একবার। মন চলে যায় অনেক দূরে, অতীতে। মায়ের মুখে
শোনা মায়ের ছোটবেলার গল্পের কথায়।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment