প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

মধ‍্যবিত্তের পথে [১ম পর্ব] | মনোজ চ‍্যাটার্জী

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ‍্যাটার্জী
 
মধ‍্যবিত্তের পথে
[১ম পর্ব]

"নিজের ঘরে একা বসে থাকলেই বল্টুর মনে স্বপ্নের সুন্দরী রহস‍্যময়ী নারীর উঁকিঝুঁকি শুরু হয়ে যায়‌। খুব চেনা চেনা লাগেকিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারে না। একদিন ওর কয়েকজন বন্ধু গার্লস স্কুলের কাছের এক বটতলায় আড্ডা মারছিল।"

 
হঠাৎ পাড়ায় প্রচণ্ড হইচই। ঋদ্ধিমান সেদিন একটু আগেই অফিস থেকে ফিরছিল। পাড়ার কাছে আসতেই দেখে এখানে-ওখানে পাড়ার চার-পাঁচজন করে দাঁড়িয়ে ফিসফাস করে কী আলোচনা করছে। উল্টোদিক থেকে মন্টুদা আসছিল,
-কী হয়েছে মন্টুদা, সবাই এভাবে কী আলোচনা করছে?
-কই আমি তো কিছু শুনিনি, কে জানে কী হয়েছে?
তারপর ফিসফিস করে বলল,
-কাউকে বলিস না আমি বলেছি, পঞ্চাদার ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে খুনের মামলায়।
-কী বলছ গো, বল্টু খুন করেছে, একটু ডাকাবুকো ছিল বটে, তাবলে একবারে খুন, না না এ হতে পারে না, পুলিশের মনে হয় কোনো ভুল হয়েছে।
-না রে কার কাছে আশি হাজার টাকা ধার নিয়েছিল সুদে, এতদিন সুদ দিয়ে যাচ্ছিল, এখন আর সুদ দিতেও পারছিল না, আসল তো ভুলেই যা। না বাবা, আমি বেশি কিছু বলব না, দেওয়ালেরও কান আছে, আমি চললাম।
 
ঋদ্ধিমান পঞ্চাদাকে চেনে ছেলেবেলা থেকেই। এপাড়ায় আসার পর প্রথম যে দু-একজন একটু পাত্তা দিত, মেশার সুযোগ দিয়েছিল, উনি তাদের একজন। অনেক আগে ওনার দাদু এসেছিলেন দেশভাগের সময়। তখন এ অঞ্চলে শুধু ঝোপঝাড় আর জঙ্গল। মাঝখান দিয়ে বড় বড় পচাখাল এদিক-ওদিক দিয়ে চলে গেছে। প্রায় দশ-বারো পরিবার ঝোপঝা পরিষ্কার করে এর মধ্যেই আস্তানা গাড়ে। যে যার মতো মাটির ঘর করে থাকত। আস্তে আস্তে বসতি বাড়ে, এক সময় সরকার অসহায় উদ্বাস্তুদের জমির পাট্টা দেয়, তারপর পাকা বাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকে, জায়গাটা বৃহত্তর কলকাতার অংশে পরিণত হয়। ঋদ্ধিরা যখন এসেছিল, তখনো পঞ্চাদারা মাটির বাড়িতে থাকতেন, বৃদ্ধ বাবা অনেক চেষ্টাতেও পাকাবাড়ি করতে পারেননি। বাঁধা চাকরি না করেও দিবারাত্র অনলস পরিশ্রমের রোজগারে পঞ্চাদা এক তলা পাকাবাড়ি তৈরি করেন। বৌদি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে এলেও ফর্সা ও সুশ্রী। এক সময় তার কোল আলো করে এল বল্টু। পঞ্চাদার শক্তপোক্ত শারীরিক গঠন আর মায়ের রূপ ও রঙের অপূর্ব সংমিশ্রণ তার চেহারায়। খেলতে খেলতে যতই আঘাত লাগুক, শিশুর কোনো কান্না নেই। পাড়ার লোকের মুখে মুখে তার নাম হয়ে গেল বল্টু। দুরন্তপনায় তাকে টেক্কা দেওয়ার মতো কম শিশুই দেখা যায়। আস্তে আস্তে বড় হয় কিন্তু স্নেহ অতি বিষম বস্তু পঞ্চাদার অনেক যত্ন ও অর্থ ব‍্যয়ের পরেও বল্টু পড়াশোনায় বেশিদূর এগোতে পারে না। টেনেটুনে উচ্চমাধ্যমিকের পর সে পড়াশুনায় ইতি করল।
 
এর মাঝে বল্টু বেশ ডাকাবুকো চেহারার সলমন খান হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা তেমন না করলেও খেলাধুলো ও ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাজে বল্টুর জুড়ি নেই। গোটা এলাকায় বল্টু বলতে অজ্ঞান, বিশেষ করে পাড়ার বৌদিরা তো বল্টুকে দুচোখে হারায়। তাদের সাংসারিক জটিল কাজে বল্টুই একমাত্র উদ্ধারকর্তা। তা এদের ছোঁয়াতেই হয়তো বল্টু বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে উথালপাতাল যৌবনে পদার্পণ করল। প্রেম নামক রহস‍্যময়ী দিনরাত আনাগোনা শুরু করল তার নিজস্ব রুমে। রাতে আর ঘুম ভাল হয় না, টুকরো টুকরো স্বপ্নের মধ্যে কোন এক সুন্দরী রহস‍্যময়ী আনাগোনা করে, বিপর্যস্ত করে দেয় তার সুগঠিত শরীর। চোখের কোণে হালকা কালির ছোপ পড়ে।
-কি বল্টু কাজল পড়েছ নাকি?
পাড়ার এক বৌদি বলে ওঠে
-না, না, কাজল নয়, বল্টু প্রেমে পড়েছে
আরেক মুখপাতলা বৌদি বলে ওঠে,
-ধ‍্যাততেরী
বলে বল্টু সেখান থেকে চলে যায়‌। তিন-চারজন বৌদির মধ্যে হাসির ফোয়ারা ছুটে যায়।
 
নিজের ঘরে একা বসে থাকলেই বল্টুর মনে স্বপ্নের সুন্দরী রহস‍্যময়ী নারীর উঁকিঝুঁকি শুরু হয়ে যায়‌। খুব চেনা চেনা লাগে, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারে না। একদিন ওর কয়েকজন বন্ধু গার্লস স্কুলের কাছের এক বটতলায় আড্ডা মারছিল। স্কুলের বড় মেয়েদের দেখার জন্যই ওরা ওখানে আড্ডা বসিয়েছে। বল্টু এ সব লাইনবাজিতে থাকে না, তবে সেদিন সাইকেলে ওদিক দিয়ে যাওয়ার সময় বন্ধুরা ওকে ডাকায় কিছুক্ষণ বসেছিল। এর মধ্যে স্কুলের সময় হতে রাস্তা দিয়ে টেন-ইলেভেনের মেয়েরা পেরিয়ে যাচ্ছিল, বন্ধুদের মধ্যে কী উচ্ছাস।
-দিল আপনা আউর প্রীত পরায়ে তোমায় দেখব কখন গাছের ছায়ে
কবি কবি ভাব নিয়ে একজন গান ধরেছে।
-এই তোরা করছিস কী?
বল্টু বলে,
এরকম করলে আমি চলে যাব।
-আরে যাবি তো, দুমিনিট দাঁড়িয়ে যা, তাপসী পান্নুকে আগে এক ঝলক দেখেনে, তারপর যদি এখানে রোজ ঢুঁ না মারিস তো আমার নামে আরশোলা পুবি।
-আমি চললাম।
মুখে বললেও বল্টু দু-এক মিনিট দাঁড়িয়ে যায়। হঠাৎ অভিষেকের মুখে গান শোনা যায়,
-আয়া রে, আয়া রে, দিল চুরানেকে লিয়ে আয়া রে
সবাই এক বিশেষ দিকে ঘাড় ঘোরায়, তাপসী পান্নু তার নায়িকাসুলভ ভঙ্গিতে একটা আলট্রামডার্ন সাইকেলে স্কুলের দিকে আসতে থাকে। বল্টু যদিও খুব একটা মেয়েদের দিকে তাকায় না, সেও এক দৃষ্টিতে তাপসী পান্নু ওরফে ঐশিকার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঐশিকা যদিও এই ঠেকের ছেলেগুলোকে একেবারেই পছন্দ করে না, অন্যদিন বেশ খানিকটা রেলা মেরে চলে যায়, আজ বল্টুকে এখানে দেখে অবাক চোখে বল্টুর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঐশিকাকে বল্টু চেনে, খয়রাপাড়ার নবীনকাকুর মেয়ে, ওনার স্ত্রীকে বেশ কয়েকবার হসপিটালে ভর্তি করাতে নিয়ে গেছে, হামেশাই আন্ত্রিক রোগে ভোগেন। কিন্তু এ চেনা, সেই চেনা নয়, ঐশিকা চলে যাওয়ার বেশ খানিকক্ষণ পর বল্টু বুঝতে পারল এই রহস্যময়ী মুখটাই মাসখানেক ধরে তার স্বপ্নে দেখা দিচ্ছে‌।
-কী বাবা বল্টুকুমার, এবার তোমার নামে যদি আমি একটা ছুঁচো পুষি, তোমার কি খুব রাগ হবে?
-ধুর শালা
-এই নিয়ে টানা চারদিন হয়ে গেল, এই ঠেকে তোমার অ্যাটেনডেন্স পড়ছে, ঐশিকার মুচকি হাসিই দেখে যাচ্ছ, এখনো পাঁচটাকার বিড়িও খাওয়াওনি।
-খাওয়াব, খাওয়াব, সময় আসলে বিড়ি নয় একেবারে বিরিয়ানি খাওয়াব।
-তা সময় আনার জন্য তুমি কী কোন চেষ্টা করছ না মনে মনে মনকলা খেলেই সময় আসবে?
- মধো উকিলের মতো জেরা করলে এবার কানের গোড়ায় দেবো।
-অত রাগে না বাবা, প্রেমে অনেক সহ‍্য-ধৈর্য্য রাখতে হয়।
-তবে রে
বলে হাত তুলতেই মধো কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
-ঐশিকার নাম্বার নিবি? আমার কাছে আছে, তবে ব্লক খেয়ে গেলে আমার কিছু করার নেই। এখানে অনেকেই
ব্লক খেয়ে বসে আছে।
এই বলে মধো একটা চিরকুটের মতো কাগজ বল্টুর পকেটে গুঁজে দিল‌।
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

গঙ্গার পাড়ে সূর্যাস্ত


Popular Top 10 (Last 7 days)