বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪১তম সংখ্যা/১লা ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
মধ্যবিত্তের
পথে
[২য় পর্ব]
"ঐশিকা বলে যায়, আর ওর মুখে 'ওদের সাথে তোমাকে মানায় না' শুনেই বল্টু কী যেন এক প্রবল হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গেছে এক অপূর্ব পাহাড়ী ঝর্নার কাছে। চারিদিকে সবুজের ছয়লাপ"
পূর্বানুবৃত্তি
-হ্যালো, কে বলছেন?
-আমি বল্টু বলছি।
-কোন বল্টু?
-যুবক সংঘ পাড়ার।
-ও পঞ্চাননকাকুর ছেলে?
-হ্যাঁ।
-এই শোন, অন্য কথা বলার আগে
তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি প্লিজ, ওই একেবারে বকে যাওয়া ছেলেগুলোর সাথে বটতলায় বসবে না, ওদের সাথে তোমাকে মানায় না, ওখানে বসলে আমি কিন্তু বেশিদিন তোমাকে সাড়া দিতে পারব না। হ্যাঁ, এবার বল, কী বলছিলে? আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেলে? ও বুঝেছি, বটতলার চ্যাংড়াগুলোর কাছে।
তাতে কোন অসুবিধা নেই। আমি তোমাকে বরাবরই লাইক করি, তোমার মতো পরোপকারী ছেলেকে সবাই ভালবাসে। আমার মায়ের জন্য তুমি যা উপকার কর তা আমি
কোনদিন ভুলব না। তুমি বাড়িতে এলে আমার কথা বলার খুব ইচ্ছে হয়, কিন্তু মা-বাবার সামনে লজ্জায় এতদিন কথা বলিনি, এবার যেদিন আসবে,
মানে
মায়ের শরীর খারাপ হতে হবে না, আমার সাথে দেখা করার
জন্য আমাদের বাড়ি আসবে, দুজনে অনেক অনেক কথা
বলব।
ঐশিকা বলে যায়, আর ওর মুখে 'ওদের সাথে তোমাকে
মানায় না' শুনেই বল্টু কী যেন এক
প্রবল হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গেছে এক অপূর্ব পাহাড়ী ঝর্নার কাছে। চারিদিকে
সবুজের ছয়লাপ, মাঝে মাঝে নানারকম
পাখির সুমধুর কলতান এক মুগ্ধকর কর্ণমধুর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে, তার মাঝে ঐশিকার কথাগুলো যেন তরলিত চন্দ্রিকা সুন্দরী ঝর্ণার কলকল বয়ে যাওয়ার মতো কানে আসছে।
-হ্যালো, হ্যালো, শুনতে পাচ্ছ, না আমিই পাগলের মতো
বকে যাচ্ছি?
-বলো ঐশিকা।
-যাক বাবা, আর তুমি কী গো সাতমিনিট
পরে আমি বলতে তবে তুমি সাড়া দিলে,
না হয়
আমি একটু বেশিই বকবক করি।
-আমি তোমার মিষ্টি গলার স্বর মন দিয়ে উপভোগ করছিলাম।
-থাক থাক আমাকে আর আপে
তুলতে হবে না, তুমি হয়তো খুব বুদ্ধিমান, আমাকেও খুব একটা বোকা ভেব না, সে যাই হোক, তোমার নাম্বার পেয়ে
আমার খুব ভাল লাগছে, আমি কিন্তু প্রায়ই
ফোন করব, বিরক্ত হলে চলবে না।
-আমার খুব সৌভাগ্য,
আর
দুর্ভাগ্য এটাই যে এতদিন তোমার সাথে যোগাযোগ হয়নি।
-যা বলেছ, আমি ছিলাম একটা বোকা
আর তুমি একটা হাঁদা। তাহলে কবে আমাদের বাড়ি আসছ, এই রবিবার চলে এস-না।
-যাও, দুম করে কোন কারণ
ছাড়া তোমাদের বাড়ি গেলে তোমার মা-বাবা কী ভাববেন?
-সে তোমাকে ভাবতে হবে না, আমি সব বলে রাখব আর বাপি তো দিনরাত তোমার কথা বলে, তুমি এলে ওরা আমার চেয়েও বেশি খুশি হবে। মা তো তোমাকে একদিন
খাওয়ানোর জন্য বাপিকে প্রায়ই বলে,
শোন এই
রবিবার, সকাল সকাল আমাদের বাড়ি চলে
আসবে, একেবারে সন্ধেবেলায় বাড়ি যাবে, বাড়িতে বলে আসবে। আমাকে কিছু করতে হবে না, তোমার সাথে ফোনে কথা হয়েছে শুনলে, আমার মা তোমাকে ফোনে এই কথাই বলবেন। তুমি যেন পাল্টি মেরো
না।
-তাই হবে, তাপসী পান্নুর কথা আর
কী করে অমান্য করি।
-কী, কী বললে?
বল্টু তড়িঘড়ি ফোন কেটে দেয়। ওইদিক
থেকে আবার ফোন আসে। বল্টু ধরতেই,
-ভীতু কোথাকার।
বলে ঐশিকা ফোন কেটে দেয়। বল্টু
চিন্তায় পড়ে যায়, এ আবার কী হলো, মেয়েটা রেগে গেল নাকি,
এত
তাড়াতাড়ি তাপসী পান্নু বলাটা ঠিক হয়নি। তারপরেই আবার ঐশিকার ফোন,
-এই যে, আমি তাপসী পান্নু
বলছি, প্রত্যেকদিন অন্তত দু’বার যেন আমাকে
ফোন করবে। দিস ইজ মাই অর্ডার। বলেই খিলখিল করে
একটানা হাসির পর ফোনটা কেটে যায়। এক রক্তিম আবেগের টানে বল্টুর কান লাল হয়ে আসে।
-কী বল্টু, এ কী কান্ড, কোন সুন্দরীর কাছে গেছিলে গো, যে কান একেবারে লাল হয়ে গেল?
পাড়ার মুখপাতলা বৌদি বলে,
-দেখে নয়, ফোনে কথা শুনেই।
বল্টু স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে বলে
ওঠে,
-উ মা গো, কে গো এই ক্যাটরিনা
কাইফ, যে একদিনে তোমাকে
বদলে দিল, শোন শোন সবাই শোন আজ থেকে
আমাদের কদর কমে গেল।
পাড়ার আরো বৌদিদের ডেকে বলে,
-ক্যাটরিনা নয় বৌদি,
এ হল
তাপসী পান্নু।
এইভাবেই বল্টু আর ঐশিকার
মধ্যে যেন কোন পূর্বনির্ধারিত ভাবেই প্রেম হয়ে গেল। বেশ কিছু মাস প্রেম চলার পর
ঐশিকা একদিন বল্টুকে বলে,
-তোমাকে একটা কথা বলব,
কিছু
মনে করবে না তো?
-কী বলো।
-বলছি, তুমি তো এইচএসের পর
আর পড়াশুনো করলে না, এই বাজারে ওতে
মোটামুটি ভাল মাইনের চাকরি পাওয়া খুব মুশকিল,
আর সব সময়
তো আমরা শুধু প্রেম করব না, এক সময় তো বিয়ে করে
সংসার পাতব। তাই এখন থেকেই তার প্রিপারেশন নেওয়া ভাল না?
বল্টু অবাক হয়ে যায় সে তো
কোনদিন এসব কথা ভাবেইনি, কে যেন বলছিল মেয়েরা
অল্প বয়সেই অনেক পরিণত হয়ে যায়, সত্যি সবে টুয়েলভে
উঠতেই ঐশিকা কত পরের কথা চিন্তা করতে শুরু করেছে।
-আমি সব খোঁজখবর নিয়েছি, পাড়ার কলেজের দিদিদের কাছ থেকে, সবচেয়ে ভাল হয় প্রথমে
তুমি একটা ওপেন
ইউনিভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েশনে ভর্তি হও, বাড়িতে বসেই হয়ে যাবে, কিছু খরচাও হবে না,
অল্পস্বল্প
পড়লেই হয়ে যাবে আর এর সাথে নিট থেকে ডেটা সায়েন্স ও পাইথন প্রোগ্রামিং-এর এক বছরের
একটা কোর্স করো। তবে এটাতে ভাল খরচ আছে, প্রায় লাখদেড়েক। করতে পারলে ওরাই ভাল কোম্পানিতে প্লেসমেন্ট দেয়। বাড়িতে কথা
বলে এর ব্যবস্থা করো।
-আবার পড়াশোনা, তুমি তো জানো ওটা
আমার ঠিক আসে না, আমাকে তুমি যে কোন
হাতের কাজ শিখতে বলো আমি খুব তাড়াতাড়ি শিখে নেব, আমি পারিও অনেক কাজ, ইলেকট্রিকের কাজ, ফ্রিজের কাজ, এমনকি এসির কাজও শিখে
নিচ্ছি।
-না বল্টু আমার বাবা সারাজীবন লেবারের কাজ করে অনেক কষ্ট করে
বাড়িতে টিউটর রেখে আমাকে ভাল করে পড়াশুনো শেখাচ্ছেন, অনেক আগে থেকেই বাড়িতে বলেন আমার ঐশিকার বিয়ে আমি কোন অফিসারের সাথে দেবো, কোন লেবারের সাথে জীবন থাকতে বিয়ে দেবো না। আমাদের নিজেদের
ভালর জন্য তোমাকে এটা করতেই হবে।
-আচ্ছা বাড়িতে কথা বলি তাহলে।
ঐশিকাকে এই বলে চলে এসেই সে
ভাবতে লাগল, বাবার কাছে কোন জিনিস কেনার
জন্য পাঁচশো-হাজার টাকা চাইলেই বাবার মাথায় হাত পড়ে যায়, মাঝে মাঝেই পাওনাদার অনেকে বাবাকে তাগাদা করতে আসে, বাড়িতে বলে কোন লাভ নেই, বাবা আবার কোথাও টাকা ধার করবে, শেষে রাস্তাঘাটে
লোকের হাতে মার খাবে। আজ কদিন হল ঐশিকার সাথে দেখাও হয়নি, ফোনে একটু-আধটু কথা হয়েছে, তাও বল্টুর কাছে বাবার পাওনাদারদের
কথার মতোই লাগছিল।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment