বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪১তম সংখ্যা/১লা ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
সুরঞ্জন ঘোষ
হতভাগ্য
[২য় পর্ব]
"আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু শঙ্করের মা আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি ওর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করো তবে তুমি ওর মরা-মুখ দেখবে।’ তাই নিজের মতো অগোছাল ভাবে আছি।"
পূর্বানুবৃত্তি
-পরেশ বলছি, এমএ ইংরেজি ২০০৪-এর ব্যাচ।
-আরে অত বলতে
হবে না কেমন আছিস তাই বল।
ও বলল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-তুই?
-যদি বলিস
স্বচ্ছলতাই জীবনের শেষ কথা তবে আমি খুব ভাল আছি কারণ আমি একটি প্রাইভেট কোম্পানির মালিক। কিন্তু আমি এ জীবনে শঙ্করকে খুব মিস করি। ওকে বাদ দিয়ে আমি আধলা
হয়ে বেঁচে আছি।
-কিন্তু তোর তো
বড় ঘরে বড়ো বরে বিয়ে হয়ে গেছে শুনেছি।
-প্রথমটা ঠিক
শুনেছিস কিন্তু, বড় বর কথাটা মিথ্যে। একটা মাতাল, অত্যাচারী, জুয়াড়ি। ভুল বুঝতে পেরে
বাবা আমাকে শুভেন্দুর থেকে ডিভোর্স করিয়ে কোম্পানির দায়িত্ব আমাকে দিয়ে বাবা
অন্যত্র আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন। আমি রাজি হইনি। এভাবেই চলছে।
আমি বললাম,
-শঙ্করের কোনো খবর জানিস?
-না।
ও জবাব দিল। তারপর বলল,
-আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু
শঙ্করের মা আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি ওর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা
করো তবে তুমি ওর মরা-মুখ দেখবে।’ তাই
নিজের মতো অগোছাল ভাবে আছি। আমার সুখের চেয়ে শঙ্করের বেঁচে
থাকাটা বড়। পরেশ এতদিনে সেও তো
আমার খোঁজ করেনি। হয়তো আমাকে ভুলে সে ভালই আছে, হয়তো অন্য কারো সাথে…
বলতে গিয়েও বলতে পারল না
নবনীতা।
-বুঝেছি সবার
চাওয়াটা পূরণ করার দায় ভগবানের নেই তার কিছু নিজস্ব ভাবনা আছে। তুই কী করছিস এখন?
আমার সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে
সারলাম। তারপর ওর ভুল ধারণাগুলো শুধরে দিয়ে বললাম,
-ভগবান অনেক কিছুই অতি
বিলম্বে করে থাকেন হয়তো। শঙ্করের মা তোকে যে কথা বলেছেন তা ওর যন্ত্রণাদীর্ণ
অনুভূতির প্রকাশ মাত্র। তুই যখনকার কথা বলছিস ততক্ষণে তোকে অন্য কারো হয়ে যাওয়ার
পাঁজর-ভাঙ্গা বেদনার ভার বইতে না পেরে শঙ্কর পাগল হয়ে গেছে। তাই মায়ের মন
তোকেই দায়ী করে এরকম বলতে পারেন।
নিবেদিতা লেখাপড়া জানা
বুদ্ধিমতী মেয়ে। বলল,
-সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি
তো…!
ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
-তুই আরো জানিস না যে শঙ্কর
একদিন রাতে বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেছে।
-সত্যি আমি
কিছুই জানি না। আমি মিথ্যে অভিমান আমার বুকের মধ্যে বড় করেছি। ও এবার সশব্দে
কাঁদছে আর নিজেকে দোষারোপ করে কষ্ট পাচ্ছে। ওকে একটু সহজ করার জন্য একটু স্থুল
রসিকতা করে বললাম,
-আসলে ভগবান তোদের পুড়িয়ে
পাকা করে নিয়ে তবে প্রেমের তাজমহল গড়তে চান।
ও হয়তো কিছু বুঝতে পারল না।
তারপর হাজারিবাগ স্টেশনের ঘটনাটা সবটা শুনে ও নিজেই বলল,
-আমি আসব রে পরেশ, আমি আসব। আমাকে আসতেই হবে। তুই শুধু একটু ওকে চোখে রাখিস।
আমার শঙ্করকে আমি আর হারাতে দেব না।
আমি ওকে পুরো ঠিকানা দিয়ে
দিলাম।
আমার কোয়ার্টারের ব্যালকনি
থেকে প্লাটফর্মের সব কিছু দেখা যায়। আমি মাঝে মাঝে জানলার কাচে চোখ রেখে দেখতে
থাকি যাকে শঙ্কর ভাবছি সেই পাগলটা আছে কিনা। তাছাড়া একটু নিশ্চিন্তই ছিলাম কেন না
প্লাটফর্মের দু-একজন লোক আমাকে জানিয়েছিলেন যে পাগলটা স্টেশনের বাইরে কখনও যায় না।
প্রহর গুনছি কখন ওরা সবাই এসে পৌঁছায়। নবনীতা আর শঙ্করকে ওদের হাতে তুলে দিতে
পারার আনন্দটা আমি সামলাতে পারছিলাম না। একদিন পর সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ একটা
কালো রঙের গাড়ি এসে দাঁড়ায় আমার কোয়ার্টারের সামনে। ওরা এসে গেছে। সঙ্গে একজন
সুপুরুষ। বুঝলাম টুসকির বর হবে। আমি নীচে নেমে এলাম। আরো একটা কালো রঙের গাড়িতে
নবনীতা। নবনীতাকে দেখে সকলেই আশ্চর্য হল। কেউ মুখ খোলার আগেই আমি নবনীতার জীবনের
আসল ঘটনাটা সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। মাসিমা নবনীতাকে বললেন,
-আমি শুধু শুধু তোমাকেই
দোষারোপ করেছি মা তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো।
নবনীতা পায়ে হাত দিয়ে
প্রণাম করে বলল,
-আজ আমাকে ফেরাবেন না তো?
মাসিমা বললেন,
-তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী।
সকলে মিলে স্টেশনের দিকে
এগিয়ে চলেছি। দূরে লাইনের পরে একটা ভিড় জমেছে মনে হল। আরো এগিয়ে যেতেই একজন
জানাল আজ ভোরের এক্সপ্রেস ট্রেনে একটা লোক মানে একটা পাগল কাটা পড়েছে। বুকের
ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। মাসিমা একপ্রকার দৌড়ে চলে গেলেন অকুস্থলে। নবনীতাও। আমরাও ছুটে
গেলাম। মাসিমা সনাক্ত করলেন ও-ই শঙ্কর। হায়-রে বিধি! সব শেষ। সেই
মুহূর্তের দৃশ্যটি বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার জানা নেই।
নবনীতা ও মাসিমা আর টুসকির সেই হৃদয় ভাঙার কান্নার সুর আর উন্মাদের মতো প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত সকলেই হাউ-হাউ করে কাঁদতে
থাকলাম। অনেকেই রুমালে চোখ মুছল। সত্যি ঘটনা না হয়ে যদি শুধু গল্প হত তবে মাসিমার
হাতে ছেলে-বৌমাকে তুলে দিয়ে আমরা সবাই খুশি হতে পারতাম।
কিন্তু তা হল না। হতভাগ্য যে তার ভাল করার কেউ নেই। কেউ পারে না।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment