বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা
দাস
স্বাস্থ্য
পরীক্ষা
"বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছেন রমলাদেবী। নাতি বিভু ঘাবড়ে গিয়ে মায়ের কোলে চুপটি করে বসে আছে। সব জায়গায় খোঁজ করা হয়েছে। অনেকেই বাজারে দেখেছেন। মাংসওয়ালা মাংস কেনার কথাও জানিয়েছে।"
১
ভবেশবাবু রিটায়ার্ড কাষ্টম অফিসার। নাতি, ছেলে বৌমা নিয়ে সুখের সংসার তার। স্ত্রী রমলাদেবী স্বামীর
যত্নের কোন ত্রুটি রাখেন না। কাজ বলতে শুধু রবিবার সকাল সকাল বাজার করে দেওয়া।
নাকেমুখে গুঁজে ছেলেটা রোজ অফিস যায় এই ছুটির দিনটা আয়েশ করে খাবে তাই মা একটু
ভালমন্দ আয়োজন করে আর কী। সেই মতো এই রবিবার ভবেশবাবু বাজারের
থলি নিয়ে চললেন বাজারে। কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে যায় ফেরার নামই নেই। সকালের চা, পরে পরোটা আলু-চচ্চড়ি খাওয়াও হয়ে গেল সবার। কিন্তু
মানুষটা গেল কোথায়? বাসি মুখে বেরিয়েছে, এসে খাবে। ছেলেকে ঠেলে পাঠালেন রমলাদেবী,
-একটু রাস্তার মুখটায় দেখ বাবা ফিরছে কি না?
সময় গড়িয়ে এগারোটা। এবার
চিন্তা বাড়তে থাকল। রমলাদেবী কান্নাকাটি শুরু করেছেন। বৌমা তাকে সামলাতে ব্যস্ত।
-মা! বাবা কোথাও কাজে আটকে আছেন। এসে যাবেন, চিন্তা কর না।
চিন্তা তো হচ্ছেই। এখনো
রান্না চড়েনি। এত দেরি হবার কথা না! কিছু খাননি সকাল থেকে।
২
ভবেশবাবু বাজার করে মাংসের
দোকানের লাইনে, মাথার উপর মাইকে
বাজছে— আজ বাজার কমিটির তরফ থেকে রক্তদান আর স্বাস্হ্য
শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা, চক্ষু পরীক্ষা,
দন্ত
পরীক্ষা, সুগার প্রেসার টেষ্ট করান।
মাংস কেনা হয়ে গেছিল।
ভবেশবাবুর এই মাসেই সব ক'টা টেষ্ট করানোর কথা।
নয় নয় করে হাজার দুয়েকের খরচা। আটটাও বাজেনি, খালি পেট। টেষ্টগুলো করিয়ে নিলে মন্দ কী?
যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। ঢুকে গেলেন শিবিরে। নাম রেজিষ্টার করে একটা ঘরে
বসতে দেওয়া হল। পাশের বড় হল ঘরে এক একটা টেবিলে বিভাগ লেখা। এখনো কেউ আসেনি। দোতলায়
রক্তদানের আয়োজন চলছে টের পেলেন। কিছু সময়ের মধ্যেই ভবেশবাবু বুঝতে পারলেন বিরাট
ভুল হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলেছে,
কিছুই
শুরু হচ্ছে না। মাইকে প্রচার চলছে শুধু— এখনো পর্যন্ত পঞ্চাশ জন নাম নথিভুক্ত
করেছেন স্বাস্হ্য পরিসেবায়। ত্রিশজন রক্তদাতা উপস্থিত আমাদের মধ্যে।
ভবেশবাবু গুটিগুটি একবার
বেরোবার চেষ্টা করলেন। একটি ছেলে আবার বসিয়ে দিল।
-এই তো জেঠু, শুরু করে দেব। আপনার
নাম তো প্রথম দিকে। হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি।
আজ মাংসটা গেল পচে। জ্যান্ত
ত্যালাপিয়াগুলো ব্যাগের মধ্যে খাবি খাচ্ছে। বাড়িতে খবর দেবারও উপায় নেই। ফোন
আনেননি, বাজার করতে অসুবিধা হয়। বাড়িতে
নিশ্চিত এতক্ষণে হুলুস্থুলু বেধে গেছে। গিন্নি কী করছেন কে জানে? আজ বাড়ি ফিরে কপালে দুঃখ আছে। কেন যে লোভ করতে গেলেন? টেষ্ট করে কী হবে? টেনশনে প্রেশার
মাথায় উঠেছে। সুগারটাও বেড়ে যাচ্ছে। মাইকের চিৎকারে এখন— রক্তদাতা
পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে, স্বাস্হ্য পরিসেবায় একশো।
শেষে অপেক্ষার অবসান।
এগারোটায় ডাক পড়ল— ভবেশ হালদার মহাশয়, না খেয়ে থাকলে চলে আসুন ব্লাড টেষ্টের টেবিলে।
এতক্ষণে খেয়াল হল পেটে
ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে।
৩
বারোটা বেজে গেছে। ভবেশবাবু
এখনো ফেরেননি। বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছেন রমলাদেবী। নাতি বিভু ঘাবড়ে
গিয়ে মায়ের কোলে চুপটি করে বসে আছে। সব জায়গায় খোঁজ করা হয়েছে। অনেকেই বাজারে
দেখেছেন। মাংসওয়ালা মাংস কেনার কথাও জানিয়েছে। তবু পাড়ায়, পথে কোথাও নেই। মানুষটা কী উবে গেল?
দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে
যাচ্ছে। এবার পুলিশে জানাতে হবে। ভবেশবাবুর ছেলে এক বন্ধুকে নিয়ে থানার দিকে বের
হবে সেই মুহূর্তে নাতির চিৎকার,
-ওই তো দাদান! এসে গেছে।
ভবেশবাবু তখন মুখ কাঁচুমাচু করে
ব্যাগ হাতে রিক্সা থেকে নেমে ঘরে ঢুকছেন। কীভাবে যে এবার
সবটা সামলাবেন সেই চিন্তাই এখন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
~~০০০~~

No comments:
Post a Comment