প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

কবিতা— রাজরঙ্গ | কবি— অজয় দেবনাথ | পর্যালোচক— সাধন চন্দ্র

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | পর্যালোচনা
কবিতা— রাজরঙ্গ
কবি— অজয় দেবনাথ
পর্যালোচক— সাধন চন্দ্র

"শিরোনাম সার্থক ও অভিনবত্বমণ্ডনে সুন্দর। সাধারণ মানুষের বঞ্চনা যন্ত্রণার বিনিময়ে শাসক যদি নিজের প্রতিষ্ঠা ও সুখকে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে যেতে পারেতাহলে তা রঙ্গ বটেই তার কাছে — শ্লেষের সুর ভালোই লাগছে এই রাজরঙ্গ শিরোনামে।"

 
মানবিক দায়বদ্ধতায় উত্তীর্ণ, তবে শৈল্পিক উপস্থাপনে কিছু চাহিদা রয়ে গেল:
রাজরঙ্গ কবিতার ওপরে কিছু অক্ষরালাপ
 

ব্যক্তিগত পরিসরের বাইরে নিজের সংবেদনশীলতার পরিধিটাকে সামাজিকতায় পৌঁছে দিতে পারেন যে-কবি, তিনি মানবতাদেবীর বেদীমূলে হৃদয় ও মননের উপযুক্ত অর্ঘ্যটিকে ঠিক অর্পণ করতে পারেন। সেই অর্পণযজ্ঞ সম্পন্ন করতে পেরেছেন রাজরঙ্গ কবিতার সৃজক।

অভিনন্দন।

কারও কোনো বৈশিষ্ট্য অপর একজনের কাছে আকর্ষণীয় হলে দ্বিতীয়জন অনেকসময়েই প্রথমজনের সান্নিধ্যে আসতে চায়, ওই বৈশিষ্ট্য থেকে ইন্দ্রিয়সুখ পেতে চায়। আর তাই ঘনিষ্ট সম্পর্কের পথ-প্রস্তুতির কাজে লেগে পড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় জনের উপলব্ধিতে এটা থাকে না যে, সম্পর্ক ব্যাপারটা একটা মিথস্ক্রিয়া। সেটা ইতিবাচক সরগমে বেজে উঠলেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ক্রমশ তর-তমের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই প্রথমজনের পছন্দটা সেখানে আবশ্যিক। কিন্তু প্রথমজনের অপছন্দ হলেও দ্বিতীয়জন যদি ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা করে যায়, প্রথমের কাছে তা বিড়ম্বনা, ক্রমে বিরক্তি এবং ফলত বাধা। দ্বিতীয়ের কাছে তা অপমান, ক্রমে ক্রোধ এবং ফলত কামান্ধতা থেকে ক্রোধান্ধতার পথ ধরে আক্রমণ:
 
"ফুল ফুটলে ভ্রমর আসে, গুনগুন করে
ফুলের পছন্দ-অপছন্দের কথা কে ভাবে!
সে নানা রঙে শোভা দেয়, সৌরভ ছড়ায়
 
একই সঙ্গে ঘটনা এবং দুর্ঘটনা ঘটে যায়
কখনও অপরিচিত, কখন-বা পরিচিত, অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ
 
নৃশংস হিংস্র পশু সংযম জানে নাকি!"
 
এই 'হিংস্র পশু'র হাতে রাজদণ্ড থাকলে অথবা মাথায় রাজশক্তির প্রশ্রয়ের শক্তপোক্ত ছাদ থাকলে সে পার পেয়ে যায়, বেড়ে যায় এই দুষ্কর্মের সুযোগ-সাহস।
অথচ অনেক সময় নিরপরাধ মানুষের ওপরেই অপরাধীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয় অপরাধীকে আড়াল করতে অথবা প্রতিবাদ দমন করতে:
 
"রাজরোষ কখন কার ওপরে বর্ষায়
কত নিরপরাধ যুবক অন্ধকূপে তলিয়ে যায়"
 
শাসকের ভয়ে অথবা শাসকের কাছ থেকে প্রাপ্তির আশায় অথবা ব্যক্তিক বা সামাজিক পটভূমিতে বঞ্চিত প্রতারিত আক্রান্ত হয়ে অপরাধ এমনকি হিংসাত্মক দুষ্কর্মে জড়িয়ে পড়ে কত তারুণ্য। কেউ কেউ আবার রাজশক্তির বা সমাজের উচ্চকোটির স্তাবক হয়ে সম্মান ও সুবিধা ভোগ করতে থাকে:
 
"আস্তিনে লুকানো অস্ত্রে সাড়ম্বরে বিচরণ করে কেউ
আবার কেউ-কেউ মগজ খাটিয়ে
                        বহুমূল্য দরে
                        মগজের রসে মেরুদণ্ড নমনীয় করে
তাদের জন্য রাজসভা, দেবসভা অপেক্ষায় থাকে"
 
কিন্তু বঞ্চনা  অপমান ও হিংসাত্মক কার্যকলাপে অকালপ্রয়াত হয় যেসব প্রাণ, তাদের বিষয়টি মর্মন্তুদ হয়ে ওঠে খুব অল্পসংখ্যক প্রাণেই:
 
"শুধু অকালে ঝরে যায় যে
তার মর্মবেদনা জানতে পারে না কেউ"
 
তবে দর্শনকে কবি অভিনব নান্দনিক অক্ষরশরীর দেবেন — এই আশাও তো কাব্যরসগ্রাহী করবেন।
সেই দিকে কিছুটা অভাববোধ যে রয়ে গেল! ব্যঞ্জনা রয়েছে, বিবৃতি হয়ে যায়নি— এটা ঠিক: ফুল ভ্রমর রাজসভা দেবসভা অন্ধকূপ প্রভৃতি অনুষঙ্গে রূপকায়িত উপস্থাপনে ব্যঞ্জনা এসেছে। তবে এইসব রূপকের ব্যবহার তো বাংলা কবিতায় বহু আগেই বহুবার হয়েছে। আর আস্তিনে লুকানো, ঘটনা এবং দুর্ঘটনা ঘটে যায়, নৃশংস হিংস্র পশু— এই সমস্ত শব্দবন্ধও বহুব্যবহৃত। তাই উপস্থাপনে অভিনবত্বের স্বাক্ষর মিলল না। শিল্পের প্রবাহ তো কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানাভাবে বাঁক নিয়েছে এবং নেবে এটাই স্বাভাবিক আর এটাই তো শিল্পস্রোতস্বিনীর প্রাণপ্রাচুর্যের সূচক। অপেক্ষায় রইলাম, কবির পরবর্তী সৃজনে এই কাঙ্ক্ষিত ঐশ্বর্যের ভাস্বরতার।
তবে শিরোনাম সার্থক ও অভিনবত্বমণ্ডনে সুন্দর। সাধারণ মানুষের বঞ্চনা যন্ত্রণার বিনিময়ে শাসক যদি নিজের প্রতিষ্ঠা ও সুখকে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে যেতে পারে, তাহলে তা রঙ্গ বটেই তার কাছে — শ্লেষের সুর ভালোই লাগছে এই রাজরঙ্গ শিরোনামে।
তাছাড়াও রাজরঙ্গ-তে র-এর অনুপ্রাসে সুন্দর একটি ধ্বনিগত অভিঘাত জাগছে পাঠক তথা শ্রোতার অনুভবে।
 

No comments:

Post a Comment

গঙ্গার পাড়ে সূর্যাস্ত


Popular Top 10 (Last 7 days)