বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | পর্যালোচনা
কবিতা— রাজরঙ্গ
কবি— অজয় দেবনাথ
পর্যালোচক— সাধন চন্দ্র
তূয়া নূর সংখ্যা | পর্যালোচনা
কবিতা— রাজরঙ্গ
কবি— অজয় দেবনাথ
পর্যালোচক— সাধন চন্দ্র
"শিরোনাম সার্থক ও অভিনবত্বমণ্ডনে সুন্দর। সাধারণ মানুষের বঞ্চনা যন্ত্রণার বিনিময়ে শাসক যদি নিজের প্রতিষ্ঠা ও সুখকে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে যেতে পারে, তাহলে তা রঙ্গ বটেই তার কাছে — শ্লেষের সুর ভালোই লাগছে এই রাজরঙ্গ শিরোনামে।"
রাজরঙ্গ কবিতার ওপরে কিছু অক্ষরালাপ
ব্যক্তিগত পরিসরের বাইরে নিজের সংবেদনশীলতার পরিধিটাকে সামাজিকতায় পৌঁছে দিতে পারেন যে-কবি, তিনি মানবতাদেবীর বেদীমূলে হৃদয় ও মননের উপযুক্ত অর্ঘ্যটিকে ঠিক অর্পণ করতে পারেন। সেই অর্পণযজ্ঞ সম্পন্ন করতে পেরেছেন রাজরঙ্গ কবিতার সৃজক।
অভিনন্দন।কারও কোনো বৈশিষ্ট্য অপর একজনের কাছে আকর্ষণীয় হলে দ্বিতীয়জন অনেকসময়েই প্রথমজনের সান্নিধ্যে আসতে চায়, ওই বৈশিষ্ট্য থেকে ইন্দ্রিয়সুখ পেতে চায়। আর তাই ঘনিষ্ট সম্পর্কের পথ-প্রস্তুতির কাজে লেগে পড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় জনের উপলব্ধিতে এটা থাকে না যে, সম্পর্ক ব্যাপারটা একটা মিথস্ক্রিয়া। সেটা ইতিবাচক সরগমে বেজে উঠলেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ক্রমশ তর-তমের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই প্রথমজনের পছন্দটা সেখানে আবশ্যিক। কিন্তু প্রথমজনের অপছন্দ হলেও দ্বিতীয়জন যদি ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা করে যায়, প্রথমের কাছে তা বিড়ম্বনা, ক্রমে বিরক্তি এবং ফলত বাধা। দ্বিতীয়ের কাছে তা অপমান, ক্রমে ক্রোধ এবং ফলত কামান্ধতা থেকে ক্রোধান্ধতার পথ ধরে আক্রমণ:
ফুলের পছন্দ-অপছন্দের কথা কে ভাবে!
সে নানা রঙে শোভা দেয়, সৌরভ ছড়ায়
একই সঙ্গে ঘটনা এবং দুর্ঘটনা ঘটে যায়
কখনও অপরিচিত, কখন-বা পরিচিত, অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ
নৃশংস হিংস্র পশু সংযম জানে নাকি!"
এই 'হিংস্র পশু'র হাতে রাজদণ্ড থাকলে অথবা মাথায় রাজশক্তির প্রশ্রয়ের শক্তপোক্ত ছাদ থাকলে সে পার পেয়ে যায়, বেড়ে যায় এই দুষ্কর্মের সুযোগ-সাহস।
অথচ অনেক সময় নিরপরাধ মানুষের ওপরেই অপরাধীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয় অপরাধীকে আড়াল করতে অথবা প্রতিবাদ দমন করতে:
কত নিরপরাধ যুবক অন্ধকূপে তলিয়ে যায়"
আবার কেউ-কেউ মগজ খাটিয়ে
বহুমূল্য দরে
মগজের রসে মেরুদণ্ড নমনীয় করে
তাদের জন্য রাজসভা, দেবসভা অপেক্ষায় থাকে"
"শুধু অকালে ঝরে যায় যে
তার মর্মবেদনা জানতে পারে না কেউ"
সেই দিকে কিছুটা অভাববোধ যে রয়ে গেল! ব্যঞ্জনা রয়েছে, বিবৃতি হয়ে যায়নি— এটা ঠিক: ফুল ভ্রমর রাজসভা দেবসভা অন্ধকূপ প্রভৃতি অনুষঙ্গে রূপকায়িত উপস্থাপনে ব্যঞ্জনা এসেছে। তবে এইসব রূপকের ব্যবহার তো বাংলা কবিতায় বহু আগেই বহুবার হয়েছে। আর আস্তিনে লুকানো, ঘটনা এবং দুর্ঘটনা ঘটে যায়, নৃশংস হিংস্র পশু— এই সমস্ত শব্দবন্ধও বহুব্যবহৃত। তাই উপস্থাপনে অভিনবত্বের স্বাক্ষর মিলল না। শিল্পের প্রবাহ তো কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানাভাবে বাঁক নিয়েছে এবং নেবে এটাই স্বাভাবিক আর এটাই তো শিল্পস্রোতস্বিনীর প্রাণপ্রাচুর্যের সূচক। অপেক্ষায় রইলাম, কবির পরবর্তী সৃজনে এই কাঙ্ক্ষিত ঐশ্বর্যের ভাস্বরতার।
তবে শিরোনাম সার্থক ও অভিনবত্বমণ্ডনে সুন্দর। সাধারণ মানুষের বঞ্চনা যন্ত্রণার বিনিময়ে শাসক যদি নিজের প্রতিষ্ঠা ও সুখকে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে যেতে পারে, তাহলে তা রঙ্গ বটেই তার কাছে — শ্লেষের সুর ভালোই লাগছে এই রাজরঙ্গ শিরোনামে।
তাছাড়াও রাজরঙ্গ-তে র-এর অনুপ্রাসে সুন্দর একটি ধ্বনিগত অভিঘাত জাগছে পাঠক তথা শ্রোতার অনুভবে।

No comments:
Post a Comment