বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | ছোটগল্প
আবদুস সালাম
মলাট
"খীমার ভিতর হঠাৎ ওয়াইফাই কানেক্ট হয়ে যায়। কোন এক হাজী সাহেবের ফোনে বেজে ওঠে ভূপেন হাজারিকার সেই গানটি ‘মানুষ মানুষের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু…"
সালাম মীনার খীমাতে ঢুকছে। কামরেজ
বলছে দ্যাখো দ্যাখো হজরত, ওই দ্যাখো সালাম ভাই এস্যাছে।
ওরা ভূত দেখছে যেন—!
দুজনেরই চোখ ছানাবড়া। হতচকিত
হয়ে পড়েছে। ওরা চিন্তাই করতে পারেনি যে সালাম আবার ঘুরে আসবে। যে অবস্থায় ফেলে
এসেছিল তাতে সালামের না বাঁচারই কথা, নয়তো কোনো হাসপাতালে
ভর্তি থাকার কথা। এখানে সে আসবে কেমন করে?
হিসেব
কিছুতেই মেলাতে পারে না হজরত। অথচ সেই লোকটা কি না ওদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে।
সুন্দর করে, শান্ত ভাবে কথা বলছে।
হজরত বলছে আপনি বেঁচে ফিরেছেন
এটাই তো আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। নয়তো আমি আপনার ছেলেমেয়েদের কী জবাব দিতাম।
নিজের সাফাই গাইতে বলতে লাগল আপনার কাছে যেতে বললাম কামরেজ
ভাইকে। ও বললে যেতে পারবে না।
হজরত নিজেই জানে সে একজন
অসহায় মেয়েকে কেমন অচেনা-অজানা জায়গায় ফেলে এসেছে। যে মেয়েটি বাংলা ছাড়া অন্য কোনো
ভাষা জানে না। কোন যানবাহন পাওয়া যায় না। অসুস্থ স্বামী যে দাঁড়াতে পারছে না। উল্টে
পড়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের মতো অটো,
টোটো, রিক্সা, ট্যাক্সি পাওয়া যায়
না। এখানে ওই লোকটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। গরম চাটুর মতো ধুলোময় রাস্তায় উল্টে
পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। কোনও দিকে
খেয়ালই নেই। যে মেয়েটাকে সে রাস্তার কুকুরের মতো ফেলে এলো, সেই মেয়েটি তার অসুস্থ স্ত্রীকে মদিনা থেকে আগলে আগলে
রেখেছে। একবারও তার মনে হয়নি যে এই মেয়েটা না থাকলে আমার স্ত্রীর করণীয় কাজগুলো
বেশিরভাগটাই করতে পারত না। ওকে নিয়ে আমারও কোনও জায়গায় সঠিক
কাজ করা হতো না। কৃতঘ্ন মেয়েটাও বলল না যে একটু থেমে যাও না।
সর্বক্ষণের পরিসেবা দেওয়া
ডাক্তারবাবুরা এসে বরফের ব্যাগ মাথায় চেপে ধরল বেশ কিছুক্ষণ। চোখে-মুখে ঠান্ডা
পানি ঘষতে ঘষতে যখন জ্ঞান ফিরল তখন ডাক্তারবাবুরা অন্য
রোগীদের সেবায় ছুটলেন গাড়ি নিয়ে।
হজরত আলী সালামকে বসিয়ে ছুটল
তার স্ত্রীকে আনতে। যেখানে সালামের স্ত্রীও ছিল। ওরা তো একসঙ্গেই ফিরছিল মুজদালিফা
থেকে। ওর স্ত্রীকে কাছে বসিয়ে দিয়ে ধমকের সুরে বলেন, ‘সুস্থ হলে নিয়ে যাবেন’।
সালামের স্ত্রী হজরতের হাতে-পায়ে ধরে
বলছে, ‘একটু থেমে যান ভাই’। একটু সুস্থ হলেই নিয়ে যাব খীমাতে।
বিরক্তির সুরে হজরত বলে, ‘আমার এখন রেস্টের দরকার। এক মিনিটও দাঁড়াতে পারব না। পরে ফোন করবেন’। যতই বলে আমার ফোনের চার্জ বসে গ্যাছে ভাই, ফোন
করতে পারব না আর ওর নেট না থাকলে কথা বলা হয় না। ততই বিরক্তির সুরে মুখ বিকৃত করে
অবলীলায় ফেলে পালাল। যেন মনে মনে সে এটাই চাইছিল! ঠিক
হয়েছে ব্যাটার। আমাদেরকে টেক্কা দিয়ে সব কিছু আগে করতে যাওয়া। ঠিক ঠিক করে সময়
মতো নামাজ পড়া, সঠিক সময় তাওয়াফ
করা ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা না ঠিক ঠিক নামাজ পড়ছে, না কোন কাজ সঠিক ভাবে করছে।
রাস্তার নিরাপত্তা রক্ষায়
যারা আছেন তারা রাস্তায় যাতে জঞ্জাল না থাকে তার জন্য অবাঞ্ছিত কাউকে রাস্তায় দেখতে
পেলে সরিয়ে দিচ্ছেন। কে মরছে কে বাঁচছে তাদের দেখে লাভ নেই। মাথায় পানি রগড়ে
যখন মানুষটি একটু সুস্থ হয়ে ওঠবার চেষ্টা করছেন, দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন তখনই আবার উল্টে পড়ছেন। কোনও জ্ঞান থাকছে
না। রীনা তখন হাউমাউ করে কাঁদছে আর নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে-পায়ে
ধরছে, সাহায্য করার জন্য। বহু কষ্টে
বাংলাকে একটু থেঁতলিয়ে হিন্দি বলার চেষ্টা করছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা আরবি, উর্দু অথবা ইংরেজি বললে বুঝতে পারছেন। অসুস্থ স্বামীকে কীভাবে সুস্থ
করবে, এটাই তার মাথায় ঘুরপাক
খাচ্ছে। দাঁত ভাঙা হিন্দিতে বলছে, ‘হামার
স্বামী ভীষণ অসুস্থ হ্যায়। উঠতে নাহি পারতা হ্যায়’।
অঙ্গভঙ্গি করে ওদের বোঝাতে চেষ্টা করছেন আর হাউমাউ করে কাঁদছেন। যত দোয়া-দরুদ জানা ছিল সব পড়ছেন আর মাথায় পানি
বুলিয়ে দিচ্ছেন। এই উত্তপ্ত দিনে খোলা আকাশের নীচে কী
অসহায় অবস্থা বলে বোঝানো যাবে না। চেষ্টা করছে যাতে ট্যাক্সি বা হুইল চেয়ার
নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা যায়। নিরাপত্তা রক্ষীদের কোন সাহায্য তো দূরের কথা
হটজা হাজ্জী, হটজা হাজ্জী বলে
তাড়িয়ে দিচ্ছেন। ওরা সব পাথরের দেশের লোক। তাদের অন্তরটাও যেন পাথর হয়ে গ্যাছে।
কোনও অনুনয়-বিনয় তাদের মন গলাতে পারছে না।
দু হাত আকাশে তুলে আল্লাহ
তালার কাছে ফরিয়াদ করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। কিছুই যখন ভেবে সমাধান সূত্র
বের করতে পারছেন না তখন হঠাৎ বিহার থেকে আসা কোনও এক
ছেলেমানুষ হাজী ওই রাস্তা দিয়ে হোটেলে ফেরার জন্য ওই পথ দিয়েই আসছিল। ওরাই তাদের ফেরার ব্যবস্থা করে দেয়।
খীমার ভিতর হঠাৎ ওয়াইফাই
কানেক্ট হয়ে যায়। কোন এক হাজী সাহেবের ফোনে বেজে ওঠে ভূপেন হাজারিকার সেই গানটি ‘মানুষ মানুষের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে
পারে না ও বন্ধু…’
~~০০~~

বাতায়নের সকল কর্মকূশলীবৃন্দ কে জানাই হার্দিক শুভেচ্ছা।
ReplyDeleteসুন্দর সূচীপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের (বাতায়ন)
অনেক অনেক শুভেচ্ছা।