বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/অন্য চোখে/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| অন্য চোখে
অশোক
বন্দ্যোপাধ্যায়
ক্ষণিকের
অতিথি
"কখনো-কখনো যাবার আগে তাকে ফোন করে জানিয়ে দিলে শত কাজের মধ্যেও সময় বের করে ছুটে আসেন চঞ্চলা হরিণীর মতো নাচতে নাচতে হাসিতে খুশিতে উচ্ছল প্রাণবন্ত হয়ে।"
বিন্দু থেকে যেমন সিন্ধু হয়
তেমনি মুহূর্ত থেকে শুরু হয় সময়। এমনি একটি মুহূর্তের ছবি তুলে
ধরছি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে।
ভদ্রমহিলা এক ছোট ডাকঘরের
কর্মী সুন্দরী যুবতী। কর্মোপলক্ষ্যে তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ এমনকি ছিল ফোনেও
যোগাযোগ। কখন যে এই সুযোগে আমাদের পরস্পরের প্রতি ভাল লাগা শুরু হয় মনে নেই। তবে
দেখেছি যে আমার ক্ষণিক সান্নিধ্য বা উপস্থিতি সেই ভদ্র মার্জিত সুন্দরী যুবতীর হৃদয়ে
আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমার সঙ্গে স্বল্প সাক্ষাতেও উদ্বেলিত হৃদয়ে খানিক প্রগলভ
হয়ে ওঠেন সেই নারী। কথায় যেন খই ফোটে কথা বলা শুরু হলে। কোন কাজে গেলে তার
তাৎক্ষণিক সহায়তায় অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ হয়ে যায়। তারপর গল্প করতে করতে খেই
হারিয়ে ফেলেন সব ভুলে। কখনো-কখনো যাবার আগে তাকে ফোন করে জানিয়ে দিলে
শত কাজের মধ্যেও সময় বের করে ছুটে আসেন চঞ্চলা হরিণীর মতো নাচতে নাচতে হাসিতে
খুশিতে উচ্ছল প্রাণবন্ত হয়ে।
তারপর, অনেক দিন আর দেখা নেই। দরকার হয়নি কোনো কাজে সেই ছোট ডাক
ঘরে যাওয়ার। হঠাৎ করেই কী একটা দরকারে ধুমকেতূর মতো হাজির হলাম একদিন সেখানে। এক মনে
কম্পিউটারে কাজ করছিলেন সেই মিষ্টি হাসির রমণী। কম্পিউটারের স্ক্রিনে তার চোখ।
কাউন্টারের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে একটা
প্রশ্ন ছুড়ে দিই তার দিকে কোন একটা বিষয়ে জানতে। উনি হঠাৎ করে জানালার বাইরে
আমাকে দেখে যেন ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেন। তৎক্ষণাৎ কেমন যেন
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। ঠিক বুঝতে পারেন না, ওটা সত্যিই আমি তো? যাকে সেই মুহূর্তে
দেখছেন সে কি সত্যিই জানালায় দাঁড়িয়ে না কি তার কম্পিউটারের স্ক্রিনে? সব কিছু কেমন যেন গুলিয়ে যায় তার। যন্ত্রের মতো আমাকে
আমার সেই প্রশ্নের উত্তর দেন ঠিকই, তবে সেটা যেন কোন
ঘোরের মধ্যে। হয়তো ভাবছিলেন, এটা কোন স্বপ্ন নয়
তো?
আশেপাশে আরও মানুষ ছিলেন।
কাজটুকু হয়ে যেতেই সেকেন্ডের মধ্যে টুক করে সরে পড়ি সেই জানালার সামনে থেকে।
জানি এমনটা আমার ঠিক হয়নি, কিন্তু সেদিন আমার
সত্যিই সময় ছিল না যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে
আরো দুটো কথা বলব সেই পোস্টাল সুন্দরীর সঙ্গে। পরে এই বিষয়ে যখন অবসরে নতুন করে ভাবতে
বসি তখন আমার মনে হয় যে সেদিন আমার মতো এক প্রিয় পরিচিত অথচ সেই দিনের এক
ক্ষণিকের অতিথির এহেন কান্ডের জন্য না জানি তার কুসুম কোমল নারী হৃদয়ে কী ভয়ঙ্কর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল আর প্রিয়জনকে হঠাৎ পেয়ে হঠাৎ করেই এমন
হারিয়ে ফেলার জন্য মনোজগতে কী হাহাকারের চিনচিন বেদনা
সৃষ্টি করেছিল সে শুধু তিনিই জানেন। হয়তো আমার সেদিনের সেই ক্ষণিক উপস্থিতি কোন
নিস্তরঙ্গ দীঘির বুকে ঢিল ছোড়ার মতো মুহূর্তেই উথালপাতাল করে দিয়েছিল তার শান্ত মন আর তারপর হয়তো সারা দিন ঠিক ভাবে কাজে মন
দিতে পারেননি সেই রমণী যার জন্য এই ক্ষণিকের অতিথিই দায়ী।
সেদিন আমার এমন ধুমকেতুর মতো
ক্ষণিকের উপস্থিতি বাদল মেঘের ঘন আঁধারের বুক চিরে যে বিদ্যুৎ চমকের সৃষ্টি করেছিল
তার মনে যে হাজার কাজের ফাঁকে থেকে থেকে স্মৃতি পটে ভেসে উঠেছিল হয়তো এক পলকের এক
ঝলক দেখা একটি প্রিয় মুখ দীর্ঘ অদর্শনের প্রহর শেষে। না, আর দেখা হয়নি তার সাথে সেদিনের পরে। রয়ে গেলাম স্মৃতিতে
তার ক্ষণিকের অতিথি হয়েই।
~~000~~

No comments:
Post a Comment