বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | পর্যালোচনা
কবিতা— তবুও প্রেম
কবি— অপর্ণা শীল ভট্টাচার্য
পর্যালোচক— দীপক বেরা
ক্ষণিকের অতিথি | পর্যালোচনা
কবিতা— তবুও প্রেম
কবি— অপর্ণা শীল ভট্টাচার্য
পর্যালোচক— দীপক বেরা
"রবি ঠাকুরের এই উক্তিটি কবিতার বেলায় ঠিক ঠিক খেটে যায়। একসময় ভাবতাম, কবিরা কেন কবিতার পরতে পরতে এমন করে রহস্য বুনে যান? এ কেমন প্রগলভতা? তবে কি ইচ্ছে করেই তাঁরা অমন করেন?"
নিমেষেই সব ভেঙেচুরে খানখান...
কথার আগুনে অনুভূতিগুলো পোড়ে,
নরম আবেগ যায় দেখি সরে সরে।
হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে শুধু ঝরাপাতা...
চমকে দেখি যে শূন্য আমার খাতা।
অস্তরাগের দুঃখ মাখানো গান।
আঁধার রাতেও ছুঁয়ে থাকে মনপ্রাণ।
রাগ, অনুরাগ পাশাপাশি থাকে জানি
মন শোনে কী তা, বড্ড যে অভিমানী!
বৃষ্টিফোঁটায় আগুন কখন ছাই,
চোখের তারায় রামধনু রোশনাই।
হঠাৎ কোথায় বাঁশি বেজে ওঠে দূরে,
সেই মুহূর্তে যাই ভেসে রোদ্দুরে।
বেহাগের রাগ কোমল সুরেই গায়,
বৃথা কেন তবে সময়ের অপচয়।
বেদনার পাশে থাক আলো আর আশা,
জোছনার পথে নেমে এসো ভালবাসা।
এত সাফাই গেয়ে নেবার কারণ হলো, আমি একটি কবিতার পর্যালোচনা লিখতে বসেছি। কবিতাটি পড়ে আমার ভেতরে নতুন যে কবিতাটি জন্ম নিয়েছে, সেটি সম্পর্কে দু’টি কথা জানাতে এসেছি। এর বেশি কিছু নয়! হয়তো আমার এ বোধ নিতান্তই অর্বাচীন। পিপীলিকাসম, —তবু তার পাখা আছে। সেই পাখায় ভর করেই একটু প্রয়াসী হওয়ার চেষ্টা করা মাত্র।
কবিতাটির শুরুতেই প্রেমকে একটি শক্তিশালী ও বিধ্বংসী শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। 'দৃষ্টিতে দিয়ে শান' — কথাটি দিয়ে বোঝানো হয়েছে প্রেমের দৃষ্টি কতটা তীক্ষ্ণ হতে পারে, যা মুহূর্তে পুরোনো সব স্মৃতি বা বর্তমানের স্থবিরতাকে খানখান করে ভেঙে দিতে পারে।
'কথার আগুনে অনুভূতিগুলো পোড়ে' — এই চিত্রকল্পটি বিচ্ছেদের তিক্ততাকে ফুটিয়ে তুলেছে। প্রেম এখানে যতটা না কোমল, তার চেয়ে বেশি দাহ্য!
এখানে মান-অভিমানের তিক্ততাকে আগুনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অনুভূতির এই দহন যখন প্রকট হয়, তখন মনের খাতা অর্থাৎ সঞ্চিত স্মৃতির পাতাগুলো শূন্য মনে হয়। এখানে ঝরাপাতার উপমাটি একাকিত্ব ও নিঃস্বতাকে ফুটিয়ে তুলেছে।
কবিতায় 'রাগ ও অনুরাগ' এবং 'বৃষ্টিফোঁটায় আগুন'-এর মতো বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। এটি মানুষের মনের এক চিরন্তন সত্য— যেখানে গভীর ভালবাসা থাকে, সেখানেই চরম অভিমান জন্ম নেয়। চোখের জলে রামধনুর রোশনাই দেখা যাওয়ার অর্থ হলো, কষ্টের মাঝেও কোথাও একটা আশার আলো বা সৌন্দর্যের আভাস থেকে যাওয়া।
'বেহাগের রাগ'— সাধারণত বিদায় বা বিরহের করুণ সুর বহন করে। কিন্তু কবি এখানে 'বৃথা সময়ের অপচয়' না করার আহ্বান জানিয়ে বিরহকে আঁকড়ে না-ধরে থেকে জীবনের দিকে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাঁশির সুর ও রোদ্দুর এখানে মুক্তির প্রতীক।
কবিতাটি শেষ হয়েছে এক ইতিবাচক প্রার্থনায়। বেদনা থাকলেও তার পাশে 'আলো আর আশা'-কে স্থান দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 'জোছনার পথে নেমে এসো ভালোবাসা' — এই আহ্বানটি বুঝিয়ে দেয় যে, দিনশেষে সব অভিমান ধুয়ে মুছে ভালবাসার স্নিগ্ধতাকেই কবি বরণ করে নিতে চান।
'তবুও প্রেম' কাব্যটি বিরহের বিষাদ থেকে শুরু করে উত্তরণের পথে এক শৈল্পিক যাত্রা—যেখানে অভিমান আর ভালবাসার লড়াই শেষ পর্যন্ত আশাবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এটি আমাদের শেখায় যে, অভিমান থাকলেও ভালবাসা কখনও ফুরিয়ে যায় না, বরং– তা নতুন কোনো সুর বা আলোর অপেক্ষায় জেগে থাকে।
কবিতা পর্যালোচনা করতে গেলে খুব স্বাভাবিকভাবে পাঠক বা পর্যালোচকের বাধ্যবাধকতার একটি দায় এসে পড়ে। তাই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে কবিতাটির ভাল-মন্দ বিষয়গুলির উপর একটি আলোকপাত অর্থাৎ কবিতাটির সবল ও দুর্বল নিয়ে নিচে আলোচনা করলাম—
১) কবিতাটির ছন্দময়তা ও শব্দের প্রয়োগ বেশ সাবলীল। বিশেষ করে 'দৃষ্টিতে শান' বা 'বেহাগের রাগ'-এর মতো শব্দবন্ধগুলো কবিতায় একটি ধ্রুপদী আমেজ তৈরি করেছে।
২) ভাবাবেগের প্রকাশ অত্যন্ত গভীর ও ছোঁয়াচে।
—এই দুটি বিষয় আমার কাছে কবিতাটির সবল দিক বলে বিবেচিত হয়েছে।
১) কবিতায় কিছু ক্ষেত্রে রূপকগুলি একেবারেই পরিচিত বা প্রথাগত (যেমন: ঝরাপাতা, শূন্য খাতা)। আধুনিক কবিতায় এই ধরনের উপমা পাঠকের কাছে অনেক সময় অতি-ব্যবহৃত মনে হতে পারে।
২) কবিতার মাঝখানে ভাবের আকস্মিক পরিবর্তন (দুঃখ থেকে হঠাৎ রোদ্দুরে ভেসে যাওয়া) ঘটেছে, যা কিছুটা দ্রুত পট পরিবর্তন হয়ছে বলে মনে হলো।
—এই দুটি বিষয় আমার পর্যবেক্ষণে কবিতার দুর্বল দিক হিসেবে ধরা পড়েছে।

No comments:
Post a Comment