বাতায়ন/ক্ষণিকের
অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের
অতিথি | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
আসা
যাওয়ার পথে...
"বাগবাজারের মায়ের ঘাটের সামনে দাঁড়িয়ে অমিতাভ আর প্রণব। আশেপাশে পড়ে আছে কিছু দেবীর কাঠামো, রং জ্বলে গেছে, চুল প্রায় জট পড়ে উঠে গেছে। চোখ ফিরিয়ে নেন অমিতাভ।"
পঁয়ষট্টি বছর আন্দাজে মাথার
চুল বেশ ঘন, নুন মরিচ চুলে সুঠাম শরীরে
সুপুরুষ অমিতাভবাবুকে তৃণাঞ্জন প্রায়ই ইয়ার্কি মেরে বলে একটা বন্ধু বানা,
কিছু
একাকিত্ব আছে যা কাজ আর বন্ধুরা দূর করতে পারে না, বলেই চোখটা কুটুস করে মারে। এত বিরক্তি লাগে, ভদ্র না হয়ে অমিতাভবাবু যদি রূপালী পর্দার নায়কটির মতো হতেন বাছা বাছা কটা গাল
খেত তৃণাঞ্জন। অক্ষমের জ্বালা নিয়ে শুধুই গুমরে মরেন বেচারা অমিতাভবাবু।
বাসস্ট্যান্ডে এসে অমিতাভ দেখেন প্রণববাবু দাঁড়িয়ে আছেন, একই পাড়ায় থাকেন বটে কিন্তু অমিতাভবাবুর সাথে আলাপটুকুই আছে
দোস্তি নেই।
একগাল হাসেন প্রণব অমিতাভকে
দেখে, কিন্তু সকাল থেকেই
অমিতাভবাবুর মনে আজ এত বৃষ্টি হয়েছে যে একফালি রোদ বাদলাটা কাটাতে পারবে কি! সে
নিজেই সংশয়ে আছে। তবু অমিতাভবাবু ভীষণ ভদ্রলোক প্রত্যুত্তরটা দিয়ে জানতে চাইলেন,
-আজ আপনার
বেরোতে দেরি হলো নাকি!
-না না দশটার এস-থার্টি-ওয়ানটা ধরি
আমি। কর্মচারী যে আছে দোকান খুলে,
পরিষ্কার
করে। ততক্ষণে আমি পৌঁছে যাই। গ্রাহক আসলে ম্যানেজ করে। বিশ্বাসী লোক আমার। আপনি
কোন দিকে?
বলবে না বলবে না ভাবতে ভাবতে
অমিতাভবাবু বলতে থাকেন,
-আসলে আমি জানি না কোথায় যাব। বাড়িতে ভাল লাগছিল না আজ।
থতমত খায় প্রণব, মসজিদ পাড়ার বহু পুরোনো বাসিন্দা প্রণবরা, ওদের চোখের সামনেই রায় বাড়ি ভেঙে চারতলা ফ্ল্যাট বাড়িটা উঠল
ওই সাতানব্বই সাল নাগাদ,
তখনও
ওদের পাড়ার বাকি বাড়ি, বারান্দা, মাঠ, কেরোসিনের দোকান সব
বেঁচে। সেই চারতলা বাড়ির একটা ফ্ল্যাটে এলেন অমিতাভবাবু আর তাঁর সুন্দরী বৌ। বলতে
লজ্জা নেই সেই সময় বছর আটাশের প্রণব আড়াল থেকে বৌদিকে দেখত। বৌদির সাজ, হাসি, কথা বলার ধরণ আহা!
মনে মনে এরকমই একটা বৌ চাইত প্রণব। সেই বৌদি কয়েক বছর আগে একমাথা সিঁদুর, দু’ পায়ে আলতা মেখে রওনা দিলেন না ফেরার দেশে। আজ বৌদির মৃত্যুদিন
না তো! কী করে জিজ্ঞেস করব? ভাবতে থাকে প্রণব।
-আপনার বাস আসছে প্রণববাবু।
গায়ে হাত দিয়ে ঘোর কাটাতে
কাটাতে বলেন অমিতাভ। লজ্জা পেয়ে যায় প্রণব,
-অমিতাভবাবু আমার দোকানে যাবেন? চলুন না, কাজও হবে গল্পও।
দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত মলটার
সামনে এসে বসার জায়গা পান অমিতাভ, অফিস টাইমে বড় ভিড়!
প্রণব টিকিটটা কেটেছেন, ঝোঁকের মাথায় রাজি তো হলেন
প্রণবের সাথে ওর দোকানে যেতে, নেমে পড়লে হয়। বলব
কাজ আছে, এইমাত্র মনে পড়ল। সিদ্ধান্তটা
কার্যকর করতে গিয়ে দেখেন বাস যাদবপুর থানার সামনে। আর নেমে লাভ নেই, স্টেশন রোডেই প্রণবের ব্লাউজ, সায়া, হোসিয়ারি জিনিসের চালু দোকান, 'প্রতিমা'। দোকানে প্রবেশ করতে
করতে অমিতাভবাবু শোনেন প্রণব বলছে,
-বৌদি আমার কাছ
থেকে ব্লাউজ কিনতেন, কী যে হয়ে গেল। আজ কি
বৌদির মৃত্যু দিন?
একটু গিয়েই যাদবপুর স্টেশন, সাড়ে দশটা বেজে গেছে,
সামনে
বড় রাস্তায় বাইক, সাইকেল, মানুষ, সবকিছুর জমজমাট ভিড়।
কত আলো, কত রঙ! নিবেদিতা যখন এখানে
আসত এরকমই দেখেছিল নিশ্চয়ই। সবই একইরকম আছে শুধু ও নেই। চশমার ঝাপসা কাচটা মুছতে
থাকেন।
প্রণবের কষ্ট হয় মানুষটার
জন্য, কোনদিনও সেরকম ভাবে গল্প না
হলেও প্রণব বোঝে মানুষটা সঙ্গীকে হারানোটা মেনে নিতে পারছে না। আবারও জিজ্ঞেস করে,
-আজ কি বৌদির
মৃত্যুদিন?
-কিছু বলছিলেন না! আসলে আমি ঠিক...
কুন্ঠায় আর কথাটা শেষ করতে
পারেন না অমিতাভ।
-কিছু না। আপনার শেয়ার বাজারের খবর কী?
কথা ঘোরায় প্রণব।
-আজ বাড়িতে ভাল লাগছিল না, আরতিকেও আসতে মানা করলাম। বেরিয়ে পড়লাম নিজের মতো থাকব বলে। আজ আমাদের বিয়ের
জন্মদিন।
চুপ করেন অমিতাভ। প্রণব
উপলব্ধি করেন কী ভয়ানক অন্যমনস্ক আজ অমিতাভবাবু, কী কথার কী উত্তর দিলেন, নাহ্ মানুষটাকে
আজ একা ছাড়া যাবে না, দেখি দোকানটা সামলে কী করা যায়, মনে মনে ভাবে প্রণব। অমিতাভের কাঁধে একটা হাত রেখে বলে,
-এক মিনিট সময় দিন,
আমি
আসছি।
প্রণব দোকানের কাজে একটু
ব্যস্ত হয়ে পড়েন...
-দুঃখিত একটু বেশি সময় অপেক্ষা করালাম বলে, চলুন প্রায় দেড়টা বাজে আগে খেয়ে নিয়ে বরং ঘুরতে যাই। সংসার আর ব্যবসার চাপে বহু
দিন ঘোরা হয় না।
কিন্তু অমিতাভর খিদেও পায়নি, ঘুরতে যেতেও ইচ্ছে করছে না। তবু আজ কিচ্ছু ভাল লাগছে না সেখানে একজন
সঙ্গী থাকুক সঙ্গে কারণ একা থাকতেও ইচ্ছে করছে না আবার আত্মীয়বন্ধুদেরও ভাল লাগছে
না। আজ অমিতাভর না-বাচক দিন। এই বিশেষণটি বেশ পছন্দ, হেসে ফেলেন মনে মনে।
বাগবাজারের মায়ের ঘাটের সামনে
দাঁড়িয়ে অমিতাভ আর প্রণব। আশেপাশে পড়ে আছে কিছু দেবীর কাঠামো, রং জ্বলে গেছে, চুল প্রায় জট পড়ে উঠে
গেছে। চোখ ফিরিয়ে নেন অমিতাভ। স্টিমারটা আওয়াজ করতে করতে আহিড়িটোলা ঘাট
থেকে চলল হাওড়ার দিকে।
-আসুন
অমিতাভবাবু আমরা বরং একটু জলে পা ডোবাই।
আজ নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে
দিয়েছেন প্রণবের হাতে, যা বলবে তাই করবে অমিতাভ। আর সেটা এখনো অবধি খুব ভাল না
লাগলেও খারাপ লাগছে না। আবার একটা স্টিমার আসছে আহিড়িটোলা কী বাগবাজার ঘাটের দিক থেকে। জলটা সজোরে ওদের দু’জনের পায়ে ধাক্কা মেরে দুলে দুলে এগিয়ে গিয়ে জলের মধ্যে মিশে গেল। এভাবে
নৌকা বা স্টিমারের আসা যাওয়ার পথে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউগুলো ওদের
পায়ে ধাক্কা মেরে আবার পালিয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট বাচচাদের মতো একবার দৌড়ে এসে ছুঁয়েই পালাচ্ছে। মজা পেয়ে যান
অমিতাভবাবু জলের সাথে খেলায়।
প্রণবও অনেকক্ষণ পরে
অমিতাভবাবুর মুখে হাসি দেখেন যাক এখানে আনা
সার্থক।
-অমিতাভবাবু
একটু বাগবাজার স্টেশনটার দিকে হাঁটবেন?
ঘাড় নেড়ে সায় দেন অমিতাভ, রেল লাইন ধরে কিছুটা গিয়ে ওরা প্ল্যাটফর্মে ওঠে, আজ প্রণব বক্তা অমিতাভ শ্রোতা।
-জানেন অমিতাভবাবু আমরা ছিলাম ওপার বাংলার মানুষ, পঞ্চাশ সালের আশেপাশে ওই দেশ থেকে প্রায় খালি হাতে
প্রাণটা নিয়ে দাদু-বাবা এপারে আসেন। দাদা হয় আটষট্টিতে আমি সত্তর। কী অভাব দেখেছি তবু আমাদের মধ্যে বড়
ভালবাসা ছিল। একে একে দাদু, ঠাকুমা, বাবা, পিসিমা, বড় জামাইবাবু সবার চলে যাওয়া দেখেছি মেনেও নিয়েছি কিন্তু দাদা আমার বন্ধু, আমার সঙ্গী ওরটা মানতে পারিনি।
অমিতাভবাবুর মনে পড়ে নিবেদিতা
যাওয়ার কিছু মাস পরে প্রণববাবুর দাদা চলে গেছে।
-আসুন অমিতাভবাবু আমরা এখানে বসি।
সিমেন্টের সিটে ধুলো ঝেড়ে দেয়
প্রণব, চক্র রেলে চড়তে বড় ভালবাসত
নিবেদিতা, পুরোনো কলকাতা, গঙ্গার ঘাটগুলো ছুঁয়ে
চলে যেত দমদম। নিবেদিতা ব্যাগ ঝুলিয়ে,
অমিতাভের
হাত ধরে যেত বোনের বাড়ি।
কানে আসে প্রণব বলছে কিছু, নিজের ভাবনাটা সরিয়ে দেয় অমিতাভ, মন দেয় প্রণবের কথায়।
-জানেন অমিতাভবাবু,
দাদা
মানুষটা বড় নরম, গাছ, পাখি, পশু সব্বাইকে
ভালবাসত। ছাদে যে কত গাছ লাগিয়েছিল! আমি এখন কী করি জানেন ওর লাগানো জবা গাছ, গোলাপ গাছ, কাঠ গোলাপ গাছের মধ্যে, গাছের ফুলগুলোর মধ্যে ওকে খুঁজি। ওকে দেখি। এইবার গাঁদা গাছে কী সুন্দর ফুল
এসেছে, আমি স্নান করে সূর্য প্রণাম
করতে গিয়ে সেই ফুলগুলোর মধ্যে ওকে দেখি। আদর করি। মনে হয় ও দাদা না ও আমার ছেলে।
কথারা মনে হয় পথ হারিয়ে
ফেলেছে, তাই স্টেশনে যাত্রীদের কলরব
শুনেও ওদের একটাও শব্দ খরচ করতে ইচ্ছে করে না। চটকা ভাঙে কোকিলের ডাকে, অমিতাভবাবু লক্ষ্য করেছেন বসন্ত কাল এসে গেলে অদ্ভুত ভাবে
কোকিলের স্বর ফিরে আসে। গঙ্গার জল এখন গলানো সোনা, সেই সোনালি জলের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে অমিতাভবাবু জানতে চান,
-কিন্তু
প্রণববাবু ফুল তো একটা সময় পরে পাপড়ি সব খসিয়ে ফেলে হারিয়ে যাবে। তখন কী করবেন?
-ওই ফুলটা
হারাবে আরো অন্য ফুল তো
থাকবে। আসলে কী জানেন অমিতাভবাবু যতই আমি আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করি না কেন মুঠো আলগা
করে আমরা সবাই আমাদের প্রিয় সব কিছু
একদিন হারিয়ে যাবে। তাই আমি প্রতিটা ফুলে দাদাকে দেখি। একবার চলে আসবে আবার কিছু দিন থেকে আনন্দ দিয়ে অনেক দূরে চলে
যাবে। থাকবে না পুরোপুরি কাছে কোনদিন।
টাক মাথা, সাধারণ পোশাক পরা তার চেয়ে বয়েসে বেশ খানিকটা ছোট, লোকটার দিকে
আড় চোখে তাকান অমিতাভ কী অনায়াসে কত গভীর কথা বলল প্রণব। কালের গহ্বরে তো সবাই
একদিন মিশে যাবে, আজ থেকে বত্রিশ বছর
আগের দিনটা যেমন হারিয়ে গেছে। আজকের এই গঙ্গার ঘাট প্রণবের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলোও হারিয়ে যাবে।
একদিন অমিতাভও চলে যাবে অন্য কোথাও। কিছুই তো পুরোপুরি থাকবে না। তবে এই অন্ধকারকে
নিয়ে কেন বেঁচে থাকবেন অমিতাভ কেন? গঙ্গার বুকে ভেসে
যাওয়া নৌকাটার সাথে চলে যেতে থাকে অমিতাভবাবুর বাদলা মনটা।
~~000~~

No comments:
Post a Comment