বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/অন্য চোখে/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| অন্য চোখে
সাথী
মুখোপাধ্যায়
কালবৈশাখী
"সমস্ত প্ল্যানিং ঠিক করার পর এবার অপেক্ষা ঝড় ওঠার। ঝড় দেবতা এলেন ঠিক সময়মতো। জানালার পাল্লায় ঝাপটা মেরে জানান দিল সে এসেছে। সেনাবাহিনী পা টিপেটিপে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।"
-চুপচাপ মটকা
মেরে শুয়ে থাক। মা-কাকিমারা যেন টের না পায়। ঝড় উঠলেই আমরা চুপচাপ বেরিয়ে যাব ঘর থেকে। ততক্ষণে মা- কাকিমারা দিবানিদ্রায় শরীরের ক্লান্তি দূর
করায় মগ্ন থাকবে।
কেউ টের পাবে না। একান্নবর্তী
পরিবারের ধকলটাও বেশি থাকে। যদিও কাজ ভাগাভাগী করে বেশ সুচারুভাবেই তারা সংসার
সামলানোতে হয় পারদর্শী। যাইহোক,
আসল
প্রসঙ্গে আসা যাক। বোনদের সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়ে কালবৈশাখীর আছড়ে পড়ার
অপেক্ষা করতে লাগল তারা। শুয়ে শুয়েই তারা এলাকা ভাগ করে নিল। ওরা যেমন অপেক্ষা
করছে ঝড়ের, ঠিক একইভাবে পড়শিদের ঘরের
ছানাপোনারাও অপেক্ষায় আছে এলাকা দখলের।
এলাকা দখলের জন্য কেউ
দায়িত্ব পেল ফজলি আমগাছটার আর কেউ দায়িত্ব পেল কাঁচামিঠা আমগাছের। সমস্ত
প্ল্যানিং ঠিক করার পর এবার অপেক্ষা ঝড় ওঠার। ঝড় দেবতা এলেন ঠিক সময়মতো।
জানালার পাল্লায় ঝাপটা মেরে জানান দিল সে এসেছে। সেনাবাহিনী পা টিপেটিপে বেরিয়ে এলো ঘর
থেকে। হাতে প্রত্যেকের একটা করে মস্ত ঝুলি, যার মধ্যে নিজের জায়গা বানাবে নানা স্বাদের আম। প্ল্যানিং মোতাবেক আমগাছের
তলায় হাজির যোদ্ধারা। তাদের মতোই আরো অনেক যোদ্ধাদের আগমনে সরগরম আমবাগান।
প্রত্যেকেই যেন অঙ্গীকারবদ্ধ, "বিনা যুদ্ধে নাহি দিব
সূচার্গ্য মেদিনী।" মহাসমরের জন্য প্রস্তুত সৈনিকরা। কালবৈশাখীও তাদের ঝুলি
ভরে দিল উজার করে। ঝড়ের তাণ্ডব শেষে ফিরে আসা নিজের নিজের রাজ্যে। বাড়ি ফেরার পর
কখনো মিলত বকুনি আবার কখনো মিলত পিঠে উত্তম-মধ্যম। সেটা নির্ভর করত পরিবারের
বয়োজ্যেষ্ঠদের মুডের ওপর। কিন্তু তাই-বলে তারা কি আম কুড়ানো বন্ধ করে দিত? কখনোই নয়, পরবর্তী ঝড়ের
অপেক্ষাতে থাকত কচিকাঁচা বাহিনী।
তখনকার শৈশবের সাথে এখনকার
শৈশবের আকাশপাতাল ফারাক রয়েছে। এখনকার শৈশব ভয় পায় কালবৈশাখীর তাণ্ডবকে। আর
আমাদের শৈশব অপেক্ষাতে থাকত কালবৈশাখীর। এখনকার শৈশব ঝড় দেখলে সেঁধিয়ে যায় ঘরের
সুরক্ষিত কোণে। আর আমাদের শৈশব মাতোয়াড়া হতো ঝড়কে গায়ে মাখতে। নগরায়নের দাপটে
এখন আর আগের মতো যথেচ্ছ আমবাগান নজরে পড়ে না। কালবৈশাখীও এখন আর ঘনঘন আসে না।
কালবৈশাখীও জানে এখনকার কৈশোর ঝড় দেখে ভয় পায়। ঝড় উঠলে ঘরের সুরক্ষিত স্থানে
আশ্রয় নেয়। সর্বোপরি ঝড় কিশোর-কিশোরীদের এখন আর আকৃষ্ট করে না। এখনকার
কৈশোর তাই জানে না কালবৈশাখী শুধু তাণ্ডবলীলায় মাতে না। ঝড় শেষে উপহার দেয়
সুশীতল বর্ষণ। কাঠফাটা গরমে যখন নাজেহাল হয়ে ওঠে নাগরিক জীবন তখন সেই এনে দেয় শিরশিরানী ঠান্ডা বাতাস। কালবৈশাখীর এই রূপের সাথে পরিচিত হতে চায় না আজকের
কচিকাঁচারা। তাদের কাছে কালবৈশাখীর অর্থ তাণ্ডব আর আমাদের কাছে কালবৈশাখী দহনের পর
কিছুটা স্বস্তি। ঝড় শেষে প্রকৃতি শান্ত হয়, সুশীতল বারিষ
ধারায় স্নাত হয়ে ওঠে প্রকৃতি,
পাখপাখালি।
~~000~~

No comments:
Post a Comment