বাতায়ন/ক্ষণিকের
অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের
অতিথি | ছোটগল্প
প্রকাশ
চন্দ্র রায়
সুখটান
"অকস্মাৎ আমার বামবাহু ধরে মারল জোরে একটা হ্যাঁচকা টান। হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম দুজনেই, গিন্নির বুকের উপরে আমি। হাঁটুতে আর কনুইতে আঘাত পেলাম খুব, ওর কিচ্ছু হয়নি, মাথার পিছনে খোঁপা বাঁধা থাকায় আঘাত থেকে বেঁচে গেছে তার মাথা।"
[সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি: সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য
ক্ষতিকর]
একটা টান! যে টানে না, সে কিচ্ছুটি জানে না একটা টানের কী অপার মহিমা! গিন্নির
দৃষ্টি এড়িয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেবল একটা টান দিলাম, আহ্! বুকটা ভরে গেল,
সমস্ত
অবসাদ দূর হয়ে গেল মাত্র একটা টানে! সরি! ভুল হয়ে গেল বোধহয়! গিন্নির দু'চোখ তো ঘুমে ঢুলুঢুলু,
এতক্ষণে
বোধহয় ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছে। যাক, আবার একটা সুখটান দিলাম খুব জোরে।
রাত ১:৩০ মি, মনে মনে ভাবলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে
ছোট্ট একটা গল্পের প্লট খুঁজব। গল্প লেখার প্রচণ্ড ইচ্ছাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে
প্রায় সময় কিন্ত পারি না লিখতে অন্যান্যদের মতো। এ দুঃখ রাখি
কোথায়? সিগারেট টানছি আর ভাবছি, কেমন ধাঁচের গল্প লিখব, রোমাণ্টিক, প্যাথেটিক নাকি ভৌতিক? হঠাৎ খেয়াল হল,
আজকের
রাতটা তো জ্যোৎস্নালোকিত রাত, এ রাতে ভৌতিক গল্পের
প্লট খোঁজাটা বোকামিই হবে। আবার টানছি, আবার ভাবছি। হঠাৎ করে আমার বাম কাঁধে কার যেন হাতের ছোঁয়া
অনুভব করলাম! চমকে উঠলাম খুব! ঘাড় ফিরিয়ে দেখি ওরে বাবা! যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়! চট করে আধখাওয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেললাম
দূরে। গিন্নি আফসোসের সুরে বলল,
-ইস্! ফেললে কেন?
আমি তো
তোমার সুখটান দেখতেই উঠে এলাম।
এ পাগল বলে কী রে! গিন্নির কথায়
হতবাক আমি! বললাম,
-এ কী বলছ তুমি! জানো না ধূমপানে কত ক্ষতি হয় স্বাস্থ্যের!
-ঘণ্টা হয়! তুমিই জানো না, ধূমপানরত অবস্থায় দেখলে তোমাকে কীরকম ম্যানলি লাগে আর এই দৃশ্য দেখে আমি কতটা
গর্বিত হই, মনে মনে ভাবি, আমার হাজব্যান্ড কতটা স্মার্ট।
-হোয়াট! বলছ কী তুমি?
‘বিধিবদ্ধ
সতর্কীকরণ’ জানো না, ধূমপান মানে বিষপান।
-রাখো তোমার সতর্কীকরণ! কতশত জন চেইন স্মোকারকে জানি, আজীবন মিনিট তোপের মতো সিগারেট টেনেও কিচ্ছুটি হয়নি তাঁদের, আবার সারাজীবন একটা টানও টানেনি তারাই মরেছে লাংস-ক্যান্সার, যক্ষা বা অন্যান্য বক্ষ ব্যধিতে।
ওর সঙ্গে তর্কে না গিয়ে বললাম,
-শোন, তুমি হলে আমার
লক্ষ্মীবধূঁ, সকল প্রকার অহিতকর কার্যকলাপ
থেকে স্বামীকে দূরে রাখাই তো একজন স্ত্রীর প্রধান কর্তব্য।
তবুও পূর্বের জের টেনে গিন্নি
বলল,
-ধুলোবালি, বাতাস,
পানি, এসব জীবাণু পরিবাহী,
আর
ধোঁয়া, বিশেষ করে গরম ধোঁয়া জীবাণুর
বাহক তো নয়ই, কিছু কিছু দূর্বলতর জীবাণুকে
নাকি ধ্বংস করে, এ কথা তো তুমিই বলেছ।
-তা তো বলেছিই পাগলি! তবে কথা আরো আছে, সিগারেটের ধোঁয়ায় যে নিকোটিন থাকে, তা ফুসফুসে জমলে শ্বাসপ্রশ্বাসের যাতায়াতের রন্ধ্রগুলোকে
রুদ্ধ করে দেয় ফলে নানা প্রকার রোগের সৃষ্টি হতে পারে। শ্বাসযন্ত্রের মিউকাস
মেমব্রেনে ক্ষত সৃষ্টি করে।
-এত দীর্ঘদিন থেকে যে তুমি ধূমপান করে আসছ, কই এখন পর্যন্ত তো তোমার কিচ্ছুই হয়নি!
-হয়নি সেটা দেহের ইমিউনিটির উপর নির্ভর করে।
-ইমিউনিটি! সেটা আবার কী?
-ইমিউনিটি হল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, রোগ সৃষ্টির সর্বপ্রকার উত্তেজক কারণকে ধ্বংস করে দেয় এই
ইমিউনিটি। হোমিওপ্যাথিতে যাকে বলে জীবনীশক্তি বা ভাইটাল ফোর্স।
-আর উত্তেজক কারণটা কী?
-অতিরিক্ত পরিশ্রম,
অতিভোজন, জীবাণু দূষণ, অধিকক্ষণ জলে ভেজা
বা অধিকক্ষণ রৌদ্র লাগানো, অনাহারে থাকা বা
আজেবাজে কিছু খাওয়া, এসব উত্তেজক কারণের
মধ্যে পড়ে।
-তা হলে তো আগুনে পোড়া,
জলে
ডুবে যাওয়া বা অ্যাক্সিডেন্টে হাত-পা ভাঙা,
এসবও
উত্তেজক কারণের মধ্যে পড়ে।
-না, এসব নয়, এসবকে আগন্তুক ব্যাধি বা স্ট্রেঞ্জার ডিজিজ বলে।
-ও, বুঝেছি, করোনা ভাইরাস নিশ্চয়ই একটি উত্তেজক কারণ।
-ঠিক, এবার বুঝেছ ঠিক।
-যার ইমিউনিটি প্রবল আছে, তার দেহে করোনা সংক্রমন জনিত অসুবিধাগুলো দেখা দেবে না।
আমার কথা শুনে গিন্নী বিস্ময়ে
অভিভূত হয়ে গেল। চট করে বলে ফেলল,
-তাহলে লোকজন মাস্ক,
স্যানিটাইজার
ব্যবহার করছে কেন?
যৌক্তিক প্রশ্নে আমিও আপ্লুত
হয়ে বললাম,
-সুন্দর প্রশ্ন করেছ,
শোনো
কার শরীরের ইমিউনিটি কত প্রবল, তা কিন্তু কেউ জানে
না, এমনকি চিকিৎসক পর্যন্ত ঠাওর
করতে পারেন না এই ইমিউনিটির মাত্রা।
এবার প্রসঙ্গ বদলে ফেলে গিন্নি বলল,
-আমাদের ইমিউনিটি বেশ প্রবলই আছে, চলো ছাদে গিয়ে দুজনে মিলে সুখটান টানি।
-এ কী বলছ গো! তুমি তো ধুমপান করো না!
-করি না, তবুও আমার সুখটান আছে, তুমি ছাদে চলো।
বললাম,
-না, আমি ছাদে যাব না, আমি গল্পের প্লট খুঁজব, তুমি ঘরে যাও।
এ কথা শুনে গিন্নি অকস্মাৎ
আমার বামবাহু ধরে মারল জোরে একটা হ্যাঁচকা টান। হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম দুজনেই, গিন্নির বুকের উপরে আমি। হাঁটুতে আর কনুইতে
আঘাত পেলাম খুব, ওর কিচ্ছু হয়নি, মাথার পিছনে খোঁপা বাঁধা থাকায় আঘাত থেকে বেঁচে গেছে তার
মাথা। আমাকে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল সে, কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
-এই হলো আমার সুখটান।
মেঘের আড়াল হতে পূর্ণিমার
চাঁদটাও বের হয়ে এসে, ঝকঝকে জোছনা ছড়াতে
ছড়াতে হেসে উঠল ফিকফিক করে।
~~000~~

No comments:
Post a Comment