বাতায়ন/আতঙ্ক/গল্পাণু/৪র্থ বর্ষ/২য়
সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | গল্পাণু
জয় মণ্ডল
আতঙ্ক
যখন অস্তিত্বের
"হঠাৎ ভিড় ঠেলে এক বৃদ্ধা এগিয়ে এলেন। তিনি মেঘনার হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, "ভয় পাস না মা, আমার পাশে বোস।" সেই ‘মা’ ডাকটা যেন জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করল।"
শহরের ব্যস্ত সিগন্যালে
ট্রাফিক যখন থমকে দাঁড়ায়, মেঘনার বুকটা তখন এক
অজানা আতঙ্কে দুরুদুরু করে। ছাব্বিশ বছরের এই রূপান্তরকামী মানুষটির কাছে রাস্তা
মানেই এক অদৃশ্য কুরুক্ষেত্র। ট্রেনের কামরায় তালি বাজিয়ে হাত পাতা কিংবা মোড়ে
মোড়ে মানুষের বাঁকা চাহনি, এগুলো তার অভ্যাস হয়ে গেছে, কিন্তু আসল আতঙ্কটা দানা বাঁধে ভিড়ের ভেতরকার সেই
নিস্তব্ধতায়।
সেদিন ছিল বৃষ্টির সন্ধে।
মেঘনা যখন শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ দেখল একদল মদ্যপ যুবক তাকে ঘিরে ধরছে। শ্লীলতাহানি বা শারীরিক নিগ্রহের
চেয়েও বড় আতঙ্ক ছিল— পরিচয়হীনতা। সমাজ তাকে যে নাম দিয়েছে, তা সে বর্জন করেছে;
আর যে
নাম সে বেছে নিয়েছে, তা সমাজ মানতে নারাজ।
যুবকদের নোংরা ইঙ্গিতের চেয়েও তাদের চোখে থাকা ঘৃণা মেঘনাকে কুঁকড়ে দিচ্ছিল।
হঠাৎ ভিড় ঠেলে এক বৃদ্ধা
এগিয়ে এলেন। তিনি মেঘনার হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, "ভয় পাস না মা, আমার পাশে বোস।"
সেই ‘মা’ ডাকটা যেন জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করল। মুহূর্তের মধ্যে মেঘনার মনের জমাট
বাঁধা আতঙ্কটা জল হয়ে চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল।
মেঘনা বুঝল, তার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক অন্ধকার নয়, বরং মানুষের মনের বদ্ধ দুয়ার। কিন্তু ওই এক চিলতে সহানুভূতি
তাকে মনে করিয়ে দিল যে, হাজারো তাচ্ছিল্যের
ভিড়েও নিজের অস্তিত্বকে ভালবেসে বেঁচে থাকাটাই আসল বিপ্লব। ২০২৬-এর এই কঠিন
পৃথিবীতেও মেঘনারা আজও ডানা মেলার স্বপ্ন দেখে, যেখানে আতঙ্ক নয়, বরং ‘মানুষ’ হওয়াই
হবে একমাত্র পরিচয়।
~~000~~
No comments:
Post a Comment