বাতায়ন/আতঙ্ক/রম্যরচনা/৪র্থ বর্ষ/২য়
সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | রম্যরচনা
জয় মণ্ডল
আতঙ্ক
যখন নিত্যসঙ্গী— একবিংশ শতাব্দীর ভয়-দর্পণ
"ভুল করে অফিসের বসের ছবিতে ‘লাভ’ রিঅ্যাক্ট পড়ে গেল—ব্যাস! সেই রাতে আর ঘুম নেই। মনে হয়, কাল গেলেই বস নির্ঘাত বলবেন, “বাবু, খুব যে ভালবাসা উথলে পড়ছে, তা প্রজেক্টের কাজটা কতদূর?”
আগেকার দিনে মানুষের আতঙ্ক
ছিল বাঘ-ভালুক বা তেনাদের (যাঁদের নাম নিলে রাতে পপকর্ন খাওয়ার মতো দাঁত কিড়মিড়
করে) নিয়ে। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাঙালির আতঙ্কের সংজ্ঞা পুরোপুরি পাল্টে
গেছে। এখন আমাদের বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা লাগে না, কিন্তু স্মার্টফোনের ব্যাটারি ২ শতাংশে নামলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় হয়।
এই যে সারাক্ষণ একটা ‘কী হয় কী হয়’ ভাব,
এরই নাম
হলো আধুনিক ‘আতঙ্ক’।
সকালবেলা ঘুম ভাঙার আগেই
প্রথম আতঙ্ক শুরু হয় অ্যালার্ম ঘড়ি নিয়ে। ভাবি, অ্যালার্মটা কি বেজেছিল? নাকি আমি সেটাকে
ঘুমের ঘোরে ‘স্নুজ’ করতে গিয়ে ডিলিট করে দিয়েছি? অফিসে ঢোকার মুখে বড় আতঙ্ক হলো—সোয়াইপ মেশিনটা কি লাল বাতি জ্বালাবে? যদি লেট মার্ক পড়ে যায়, তবে মাসের শেষে পকেটে যে গর্তটা হবে,
সেখানে
আস্ত একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা যাবে।
তবে সবথেকে বড় আতঙ্ক হলো
সোশ্যাল মিডিয়া। একটা ছবি পোস্ট করার পর যদি পাঁচ মিনিটে দশটা লাইক না পড়ে, তবে মনে হয়—পৃথিবীটা কি আমায় ভুলে গেল? নাকি আমার নেটওয়ার্কটাই জ্যাম? আবার ধরুন, ভুল করে অফিসের বসের
ছবিতে ‘লাভ’ রিঅ্যাক্ট পড়ে গেল—ব্যাস! সেই রাতে আর ঘুম নেই। মনে হয়, কাল গেলেই বস নির্ঘাত বলবেন, “বাবু, খুব যে ভালবাসা উথলে পড়ছে, তা প্রজেক্টের কাজটা কতদূর?”
রাস্তায় বেরোলে আর এক
আতঙ্ক—ট্র্যাফিক পুলিশ আর কিউআর কোড। পকেটে মানিব্যাগ নেই, অথচ ফোনটা যদি হ্যাং করে যায়? ফুচকাওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে তখন মনে হয়,
দয়া করে
পৃথিবীটা যেন এখনই থমকে না যায়! ওদিকে বাড়িতে গিন্নি বা মায়ের আতঙ্ক অন্য লেভেলের।
সিলিন্ডারের গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে কাজের মাসির ‘কাল আসব না’—এই
শব্দব্রহ্মগুলো পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
আসল আতঙ্ক তো হয় ডাক্তারের
চেম্বারে গেলে। গুগলে সামান্য মাথা ব্যথার উপসর্গ খুঁজতে গিয়ে যখন দেখি রেজাল্টে
লিখেছে ‘হয়তো আপনার মাথায় কাঁঠাল গাছ গজাতে পারে’, তখন থেকেই নিজের ডেথ সার্টিফিকেট ড্রাফট করতে ইচ্ছে করে। আসলে আমরা এমন এক
যুগে বাস করছি যেখানে মশার কামড়কেও মনে হয় ড্রাগনের কামড় আর বৃষ্টির ছিঁটেকে মনে
হয় অ্যাসিড বৃষ্টি।
তবে মজার ব্যাপার হলো, আমরা বাঙালিরা এই আতঙ্কগুলোকেও উপভোগ করি। তাই তো চায়ের
দোকানে বসে ‘সব গেল সব গেল’ বলে চিৎকার করার পর পরম তৃপ্তিতে আর এক কাপ চা আর
বিস্কুট গিলে ফেলি। আতঙ্ক আছে বলেই তো বেঁচে থাকার রোমাঞ্চটা আছে। জীবনটা যদি মসৃণ
হতো, তবে তো সেটা হাসপাতালের ইসিজি
রিপোর্টের সেই সোজা লাইনের মতো হতো—যেখানে শান্তি আছে ঠিকই, কিন্তু মানুষটা আর নেই!
তাই তো বলি, আতঙ্ককে পকেটে নিয়ে চলুন, হৃদয়ে নয়। কারণ দিনশেষে আমাদের সবথেকে বড় আতঙ্ক হলো—‘আজকালকার দিনে কিছুই আর
আগের মতো নেই!’ অথচ আমরাই সেই ‘আগের মতো’ জিনিসগুলোকে বদলে ফেলেছি।
~~000~~
No comments:
Post a Comment