প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

চৈতি হাওয়া—নববর্ষ

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ , ১৪৩৩ চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | সম্পাদকীয়   চৈতি হাওয়া—নববর্ষ "দুগ্ধপোষ্য...

Wednesday, April 8, 2026

কবিতা— সীমানা | কবি— দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় | পর্যালোচক— দীপক বেরা

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/পর্যালোচনা/৪র্থ বর্ষ/ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | পর্যালোচনা
কবিতা— সীমানা
কবি— দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
পর্যালোচক— দীপক বেরা
 

"বর্ণনাভঙ্গিটি শক্তিশালী। একের পর এক বাধা টপকানোর চিত্রকল্পটি পাঠককে এক ধরনের রোমাঞ্চ ও উদ্দীপনা এনে দেয়।"


[কবির নাম না-জেনে শুধু কবিতা ও শিরোনামের ভিত্তিতে এই পর্যালোচনা]
 
'সীমানা' — পর্যালোচনা করতে গিয়ে এই শিরোনাম থেকে কবিতাটির সীমায়িত উপাদানের মধ্যে কিছু ইঙ্গিত খুঁজে দেখি। দেখলাম, কবিতাটি আমাদের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক সংকটের দিকে নিয়ে যায়। এর মূল বিষয়বস্তু হলো—মানুষ তার বাইরের জগতকে জয় করতে পারলেও নিজের 'অহং' বা 'সত্তা'র সীমাকে অতিক্রম করা সব থেকে কঠিন কাজ।
 
"লোকটা অসাধ্যসাধন করছে
একে একে টপকে চলেছে সব
নদী পাহাড় সমুদ্র মানুষ
ভীষণ উদ্দীপনায় জাগ্রত চেতন..."
 
কবিতার শুরুতেই দেখা যায় 'সীমানা' নামের চরিত্রটি (যা মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক) নদী, পাহাড়, সমুদ্রের মতো প্রাকৃতিক বাধাগুলোকে অনায়াসেই জয় করছে। এটি মানুষের বাহ্যিক উন্নতি এবং জাগতিক সাফল্যের ক্ষেত্রে এক অতিমানবীয় ক্ষমতার প্রতিফলন। মানুষ যখন একের পর এক বাধা টপকায়, তখন তার মধ্যে এক ধরনের 'জাগ্রত চেতনা' বা চরম আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এই উদ্দীপনা তাকে এক অজেয় বীর মনে করতে শেখায়।
 
"লোকটা একে একে সব টপকে
এবার নিজের সামনে এসে দাঁড়াল
 
অনেক চেষ্টার পরও
নিজেকে আর টপকাতে পারল না"
 
কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী মোড় হলো এই শেষ অংশটি। সব বাধা পেরোনোর পর যখন লোকটা নিজের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন সে থমকে গেল। এর মানে হলো, বাইরের পৃথিবীকে চেনা বা জয় করা যতটা সহজ, নিজের অহংকার, সীমাবদ্ধতা এবং আত্মপরিচয়কে জয় করা বা ছাপিয়ে যাওয়া ততটাই কঠিন। অর্থাৎ— সব বাধা পেরোনোর পথে তার চূড়ান্ত বাধা হলো একটা অনতিক্রম্য দেয়াল, তা হলো— নিজের 'সত্তা'
মানুষ যখন নিজেকেই অতিক্রম করতে চায় (অর্থাৎ নিজের চেনা গণ্ডি বা দোষ-ত্রুটি থেকে বের হতে চায়), তখন সে বুঝতে পারে যে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী সে নিজেই। নিজেকে টপকাতে না পারার অর্থ হলো— মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং নিজের 'অহং'-এর কাছে পরাজয়। এটাই মনুষ্য জীবনের ব্যর্থতার দর্শন।
কবিতাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্বজয় করা কারুর কাছে খুবই সহজসাধ্য কিংবা কঠিন হলেও তা হয়তো সম্ভব। কিন্তু আত্মজয় বা নিজেকে অতিক্রম করা এক মহত্তম এবং দুঃসাধ্য বা প্রায় অসম্ভব সাধনার ধন।
 
শেষকালে পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিতে আর একটু সূক্ষ্মতর পর্যালোচনায় কবিতার সবল ও দুর্বল দিকগুলি নিয়ে যে-সকল অনুভব উঠে আসে, তার উন্মোচন—
 
সবল দিক:
কবিতাটিতে কবি যে রূপকধর্মী এবং জীবনদর্শনের এক গভীর সত্যকে তুলে ধরেছেন, তা প্রশংসনীয়। বাইরের জগৎ (নদী, পাহাড়, সমুদ্র) জয় করা যতটা সহজ, নিজের অহং বা নিজেকে অতিক্রম করা তার চেয়েও কঠিন—এই গভীর দার্শনিক সত্যটি এখানে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। এটিই কবিতাটির সবল দিক বা মূল শক্তি এবং উপসংহার।
তা ছাড়া কবিতায় পরিলক্ষিত হয়েছে খুব সহজ ভাষা এবং গতি। অর্থাৎ কবিতার শব্দচয়ন খুব সাধারণ, কিন্তু বর্ণনাভঙ্গিটি শক্তিশালী। একের পর এক বাধা টপকানোর চিত্রকল্পটি পাঠককে এক ধরনের রোমাঞ্চ ও উদ্দীপনা এনে দেয়।
কবিতার শেষে একটি আকস্মিক মোচড় বা twist পরিলক্ষিত হয়েছে—'নিজেকে টপকাতে না-পারা'র যে অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে, তা পাঠককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এটি কবিতার নাটকীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে নিঃসন্দেহে।
 
দুর্বল দিক:
কবিতাটি অনেকটা গদ্যধর্মী। প্রথম দিকে বর্ণনাগুলো খুব রৈখিক, যা কিছুটা একঘেয়ে মনে হয়েছে।
'নদী-পাহাড়-সমুদ্র'—এই রূপকগুলো বাংলা কবিতায় খুব সাধারণ বা বহুল ব্যবহৃত। নতুন কোনো চিত্রকল্প ব্যবহার করলে কবিতাটি আরও অনন্য হতো।
লোকটা কেন নিজেকে টপকাতে চাইছে বা 'নিজেকে টপকানো' বলতে কবি ঠিক কী বুঝিয়েছেন (অহংকার জয় করা নাকি নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা?) তা কিছুটা অস্পষ্ট। কবিতার শেষে আরও একটি স্তবক সংযুক্ত করে কবিতার অস্পষ্ট ভাবটিতে পূর্ণতা আনা যেত এবং কবিতাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠত।
 
ভবিষ্যতে কবির কবিতায় ছুঁয়ে যাক যাপনের বিচিত্রতা। ভাবে, ভাষায় ও ব্যঞ্জনায় কবিতা পরিপূর্ণতা লাভ করুক এবং পাঠককূলকে আরও সমৃদ্ধ করুক—সেই প্রত্যাশা রেখে প্রিয় কবিকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করলাম।
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)