বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
এম.এম.সাইফুল
ইসলাম
চৈতি
হাওয়া
"এই হাওয়া যেমন তপ্ত, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের এক গভীর সুর। প্রকৃতি যখন নতুনের ডাক শোনে, তখন পুরনোকে ঝরিয়ে দেওয়ার জন্য এমন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে।"
চৈত্রের শেষ বিকেলের তপ্ত
হাওয়ায় যখন ধুলোবালি উড়ছে, তখন মেহরাব সাহেব
জানালার ধারে বসে উদাস মনে বাইরের আকাশ দেখছিলেন। চারদিকে কাঠফাটা রোদ, গাছের পাতাগুলো তৃষ্ণার্ত হয়ে ঝুলে পড়েছে। বৈশাখ আসতে আর
মাত্র কয়েক দিন বাকি, কিন্তু এই চৈতি হাওয়া
যেন আগুনের হলকা হয়ে শরীরে বিঁধছে। মেহরাব সাহেবের মনটা আজ বড্ড অস্থির। তার
একমাত্র নাতনি আয়রা দাদুর পাশে এসে বসল। আয়রার হাতে একটা ছোট তালপাখা, সে দাদুকে বাতাস করতে করতে বলল,
-দাদু, এই গরম কবে কমবে? আকাশটা কেন এমন তামাটে হয়ে আছে?
মেহরাব সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বললেন,
-এটা চৈত্র মাসের শেষবেলার খেলা রে দিদিভাই। এই হাওয়া যেমন
তপ্ত, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে
পরিবর্তনের এক গভীর সুর। প্রকৃতি যখন নতুনের ডাক শোনে, তখন পুরনোকে ঝরিয়ে দেওয়ার জন্য এমন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে।
আয়রা জানালার গ্রিল ধরে
বাইরের জটলা দেখছিল। রাস্তার ওপারে একটি বৃদ্ধ মানুষ এক ঝুড়ি তরমুজ নিয়ে বসে আছেন।
তপ্ত রোদে তার চামড়া পুড়ে কালো হয়ে গেছে। লোকটির গায়ে একটা জীর্ণ ফতুয়া, আর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মেহরাব সাহেবের নজরও সেদিকে
গেল। তিনি দেখলেন, উৎসবে মেতে ওঠা
মানুষগুলো দামী গাড়িতে করে ধুলো উড়িয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ ওই তৃষ্ণার্ত বৃদ্ধের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। মেহরাব সাহেব ভাবলেন, স্রষ্টা আমাদের শিখিয়েছেন অন্যের কষ্ট নিজের হৃদয়ে অনুভব
করতে। কেবল উপাসনা নয়, মানুষের সেবাও তো এক
বড় ইবাদত।
তিনি আয়রাকে সাথে নিয়ে নিচে
নামলেন। গেটের কাছে গিয়ে সেই বৃদ্ধ তরমুজ বিক্রেতাকে ডাকলেন। লোকটা কুঁজো হয়ে ধীর
পায়ে এগিয়ে এল। মেহরাব সাহেব কোমল স্বরে বললেন,
-চাচা, আজ রোদটা খুব বেশি।
আপনি ছায়ায় এসে একটু জিরিয়ে নিন।
তিনি লোকটার ঝুড়ির বেশ কিছু
তরমুজ একবারে কিনে নিলেন। আয়রা ঘর থেকে এক মগ ঠান্ডা লেবুর শরবত আর এক জোড়া নতুন
চটি নিয়ে এল। বৃদ্ধটি যখন শরবতে চুমুক দিলেন,
তখন তার
চোখে-মুখে যে প্রশান্তি ফুটে উঠল,
তা দেখে
আয়রার মনে হলো পৃথিবীর সব মেলা দেখার চেয়ে এই দৃশ্য অনেক বেশি সুন্দর। বৃদ্ধটি
হাসিমুখে বললেন,
-বাবা, এই চৈতি হাওয়ায় যখন
জীবন ওষ্ঠাগত, তখন আপনাদের এই দয়া যেন
রহমতের বৃষ্টির মতো লাগল।
মেহরাব সাহেব বুঝতে পারলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা মানে কেবল সচ্ছল থাকা নয়, বরং প্রতিকূল সময়ে একে অন্যের ছায়া হওয়া। চৈতি হাওয়া যেমন
জীর্ণ পাতা ঝরিয়ে দেয়, তেমনই মানুষের মনের
অহংকার আর দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে পারে সামান্য একটু সহমর্মিতা। বিকেলের সূর্যটা যখন
হেলে পড়ল, তখন এক পশলা দমকা
হাওয়া বইতে শুরু করল। সেই হাওয়া আর তপ্ত নয়,
বরং
মেহরাব সাহেবের মনে হলো তা এক প্রশান্তির বার্তা বয়ে আনছে।
নতুন বছরের আগমনে প্রকৃতি
যেমন নিজেকে প্রস্তুত করছে, মেহরাব সাহেবও তার
নাতনিকে শেখালেন যে, আর্তমানবতার মুখে
হাসি ফোটানোই হলো জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। চৈতি হাওয়ার সেই তপ্ত বিকেলটি তাদের
হৃদয়ে এক মানবিকতার বীজ বুনে দিয়ে গেল।
~~000~~

No comments:
Post a Comment