বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
নবনীতা রায়
আয়নার
ওপারে
আতঙ্ক | ছোটগল্প
নবনীতা রায়
"ঠিক তখনই লোডশেডিং। ঘর অন্ধকার। মোবাইলের আলোয় অ্যালবামের দিকে তাকিয়ে অর্ণব দেখল আট নম্বর বাচ্চাটা এখন আর হাসছে না। ছবির ভেতর তার ঠোঁট নড়ছে। অন্ধকার ঘরে মোবাইলের আলো কাঁপছে।"
অর্ণব দেখল। ছবিটা ১৯৯৮ সালের। বরানগরের কোনো পুজো প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে সাতটা বাচ্চা। ছ’জনের মুখে লাল কালি দিয়ে ক্রস কাটা। সপ্তম বাচ্চাটার মুখ পরিষ্কার। সপ্তম বাচ্চাটা অর্ণব নিজে।
অর্ণবের মাথা দপদপ করছে। এই দুটো মুখ সে চেনে না। একেবারেই না। অথচ ছবিতে তার কাঁধে হাত রেখেছে অষ্টম ছেলেটা। বন্ধুর মতো। হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটোবেলায় মা বলত,
বাকিটা কখনও বলেনি। ঠিক তখনই লোডশেডিং। ঘর অন্ধকার। মোবাইলের আলোয় অ্যালবামের দিকে তাকিয়ে অর্ণব দেখল আট নম্বর বাচ্চাটা এখন আর হাসছে না। ছবির ভেতর তার ঠোঁট নড়ছে। অন্ধকার ঘরে মোবাইলের আলো কাঁপছে। অর্ণব অ্যালবাম বন্ধ করে ফেলল। বুক ধড়ফড় করছে। সে তো পুলিশ। খুনি ধরাই তার কাজ। অথচ ছয়টা লাশের সাথে তার ছোটবেলার ছবি কেন?
অর্ণবের ফোনে গ্যালারি খুলল। গতকাল রাত ১০টা ৪০। একটা সেলফি। লালবাজারের পার্কিং লটে। সে একা দাঁড়িয়ে, কিন্তু পেছনের গাড়ির কাচে আবছা একটা রিফ্লেকশন। আরেকজন ছিল তার সাথে। পরের ছবি রাত ১টা। সে নিজের বিছানায় শুয়ে। শার্টে রক্ত নেই। কবজি পরিষ্কার। মাঝের দু'ঘণ্টা? ফোনে কোনো কল লগ নেই, কোনো লোকেশন নেই। ড্রয়ার খুলতেই পাওয়া গেল একটা চাবির রিং। চাবিটা তার না। আর একটা ভাঁজ করা কাগজ। তাতে তার নিজের হাতের লেখা— ৬ নম্বর শেষ। আর একটা বাকি। সপ্তমটা আমি।
হঠাৎ বুঝল ফটোর আট নম্বর বাচ্চাটা কেউ আলাদা না। ওটাই সে। তার অন্য নাম। ছোটবেলায় মা আদর করে ডাকত ‘অংশু’ বলে। রেগে গেলে বাবা বলত, ‘অংশুকে ঘুম পাড়া, অর্ণবকে ডাক।‘ সে ভাবত বকুনি। আসলে ওটা ছিল নির্দেশ। আয়নার সামনে দাঁড়াল অর্ণব। চোখে চোখ রাখল নিজের সাথে। ফিশফিশ করে বলল— অংশু?
-ছ’টা কাঁটা সরিয়েছি। ওরা আমাদের চুরির কথা জেনে গিয়েছিল, মনে নেই? প্যান্ডেলের পেছনে বাক্সটা? আমরা ভাগ করিনি বলে ওরা মাকে বলে দেবে বলেছিল।
অর্ণবের মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল একটা স্মৃতি। অন্ধকার ঘর। সাতটা বাচ্চা। একটা টিনের বাক্স। ভেতরে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। কার টাকা কে জানে। তারা নিয়েছিল। তারপর... তারপর ফাঁকা।
-তুই মারলি ওদের?
-আমি আমাদের বাঁচালাম। এখন শুধু তুই বাকি। চিরকুটে লিখেছি তো। সপ্তমটা তুই। কারণ তুই দুর্বল। তুই থানায় যাবি, সব বলে দিবি। আমি ধরা পড়ে যাব।
ঘরের লাইট কাঁপতে লাগল। অর্ণব টের পেল তার ডান হাত উঠছে। নিজে থেকে না। হাতটা গলার দিকে এগোচ্ছে। আঙুলগুলো শক্ত হচ্ছে। অংশু জেগে উঠছে, মানে অর্ণব ঘুমিয়ে পড়ছে। অর্ণবের ডান হাত তখন গলায়। নখ বসে যাচ্ছে চামড়ায়। সে বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতের কবজি চেপে ধরল। নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। আয়নার অংশু খিলখিল করে হাসছে,
ঘরের সব ড্রয়ার হাট করে খুলে গেল। ফাইল উড়ছে। ছ’টা ভিক্টিমের ফটো হাওয়ায় ভাসছে। প্রতিটা মুখ অর্ণবের দিকে তাকিয়ে। চোখে একটাই প্রশ্ন— কেন?
অর্ণব চিৎকার করে উঠল। টেবিলের কোণায় মাথা ঠুকে দিল নিজের। কপাল ফেটে রক্ত। এক সেকেন্ডের জন্য হাতের জোর কমল। সেই ফাঁকে সে ছুটে গেল রান্নাঘরে। ছুরি। এক কোপে শেষ করে দেবে এই খেলা। ছুরি তুলতেই আয়নার অংশুর গলা ভেসে এল পেছন থেকে,
কথাটা বলার সাথে সাথে ঘরটা চুপ হয়ে গেল। ফ্যানের শব্দ থামল। ফটোগুলো ধপ করে মেঝেতে পড়ল। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখল অংশু আর হাসছে না। শুধু তাকিয়ে আছে। চোখে জল।
অর্ণব মোবাইলটা তুলে ডায়াল করল। লালবাজার কন্ট্রোল রুম।
-হ্যালো, আমি সাবইন্সপেক্টর অর্ণব সেন বলছি। একটা সেলফ-স্যারেন্ডার আছে। চার্জ— সিরিয়াল কিলিং। ভিক্টিম ছ’জন। সপ্তম জন এখনও বেঁচে... আমাকে নিতে আসুন।
বাইরে পুলিশের সাইরেন বাজছে। স্যারেন্ডারের ২০ মিনিটের মাথায় লালবাজারের টিম অর্ণবের ফ্ল্যাটে। হাতকড়া পরানোর আগেই অর্ণব বলল,
ডাক্তারি পরীক্ষা — SSKM হসপিটাল, সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ড*
ডা. সান্যাল রিপোর্ট দেখে চশমা খুললেন। Dissociative Identity Disorder, অফিসার। ছোটবেলার ট্রমা থেকে তৈরি। MRI-তে দেখা যাচ্ছে আপনার ব্রেনের অ্যামিগডালা আর হিপোক্যাম্পাসে অস্বাভাবিক অ্যাক্টিভিটি। যখন ‘অংশু’ অ্যাক্টিভ হয়, তখন আপনার কনশাস মেমরি অফ হয়ে যায়। তাই দু'ঘণ্টার গ্যাপ। হাতের নখের আঁচড়, শার্টের রক্ত — সব ভিক্টিমের DNA-এর সাথে মিলে গেছে। কিন্তু আপনার কোনো স্মৃতি নেই কারণ খুনগুলো আপনি করেননি, অংশু করেছে। একই শরীর, আলাদা মানুষ।
নারকো টেস্টের ট্রান্সক্রিপ্টে অর্ণবের গলা হঠাৎ পালটে যায়। রেকর্ডিংয়ে শোনা যায় খসখসে স্বর,
পুলিশি তদন্ত — ফরেনসিক রিপোর্ট*
CCTV ফুটেজে দেখা গেল গতকাল রাত ১১টায় অর্ণব একা বেরোচ্ছে। পরনে সাদা শার্ট। ফিরছে রাত ১টায়। শার্টে লাল ছোপ। হাঁটার ধরন আলাদা। কাঁধ ঝুঁকে, পা টেনে টেনে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট বলল, ‘দুটো আলাদা মানুষের হাঁটা’।
পুরনো ১৯৯৮ সালের কেস ফাইল খোলা হলো। বরানগর থানার GD। পুজোর চাঁদার ৮০ হাজার টাকা চুরি। সাতটা বাচ্চাকে জেরা করা হয়েছিল। সাত নম্বর বাচ্চা, অর্ণব সেন, জেরার মাঝে অজ্ঞান হয়ে যায়। কেস ক্লোজ। টাকা উদ্ধার হয়নি। এখন ছ’জন ভিক্টিম সেই সাত বাচ্চার ছ’জন। বেঁচে আছে শুধু অর্ণব।
অর্ণবের ফ্ল্যাটের তোশকের তলা থেকে উদ্ধার হলো একটা টিনের বাক্স। ভেতরে শুকনো রক্ত মাখা ৮০ হাজার টাকা। আর একটা কাগজ। বাচ্চা হাতের লেখা— ভাগ করিনি। তাই ওরা মরল। আমি বাঁচলাম। — অংশু
হসপিটালের সেল। অর্ণব জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে। নার্স এসে ঘুমের ওষুধ দিল। ওষুধ খেয়ে শোবার আগে আয়নায় তাকাল। ফিশফিশ করে বলল— গুড নাইট অংশু।
~~000~~

No comments:
Post a Comment