প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Tuesday, May 5, 2026

আয়নার ওপারে | নবনীতা রায়

বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
নবনীতা রায়
 
আয়নার ওপারে

"ঠিক তখনই লোডশেডিং। ঘর অন্ধকার। মোবাইলের আলোয় অ্যালবামের দিকে তাকিয়ে অর্ণব দেখল আট নম্বর বাচ্চাটা এখন আর হাসছে না। ছবির ভেতর তার ঠোঁট নড়ছে। অন্ধকার ঘরে মোবাইলের আলো কাঁপছে।"

 
রাত সাড়ে এগারোটা। লালবাজারের কন্ট্রোল রুমে এসি চলছে, তবু ঘামছিল সাবইন্সপেক্টর অর্ণব সেনের কপাল। টেবিলের উপর ছড়ানো ছটা ফটো। ছটা লাশ। ছটা আলাদা পাড়া, আলাদা বয়স, আলাদা পেশা। মিল একটাই। প্রত্যেকের বুকের উপর রাখা একটা পুরনো, ঝাপসা হয়ে যাওয়া ফ্যামিলি ফটো।
 
ফরেনসিক অফিসার ফটোটা জুম করে অর্ণবের দিকে ঠেলে দিল,
-স্যার, ভালো করে দেখুন।
অর্ণব দেখল। ছবিটা ১৯৯৮ সালের। বরানগরের কোনো পুজো প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে সাতটা বাচ্চা। ছজনের মুখে লাল কালি দিয়ে ক্রস কাটা। সপ্তম বাচ্চাটার মুখ পরিষ্কার। সপ্তম বাচ্চাটা অর্ণব নিজে।
 
তার ফোন বাজল। অচেনা নাম্বার। ওপাশ থেকে শুধু একটা লাইন ভেসে এল আমাদের খেলাটা শেষ হয়নি রে, অর্ণব। অর্ণব থানায় কাউকে কিছু বলল না। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সোজা বাড়ি। দরজা লাগিয়ে প্রথম কাজ করল ছোটোবেলার ট্রাঙ্কটা নামানো। ধুলো, ন্যাপথলিনের গন্ধ। তার ভেতরে রাখা সবুজ মলাটের অ্যালবাম। পাতা ওলটালো। ১৯৯৮ সালের পুজো। একই গ্রুপ ফটো। বরানগরের প্যান্ডেল। সাতটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে। কিন্তু না। এখানে বাচ্চা আটটা। অর্ণবের হাত কাঁপছে। পুলিশের ফটোতে সে সপ্তম বাচ্চা ছিল, ক্রস ছাড়া। এই অ্যালবামে সে ষষ্ঠ। সপ্তমে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে, ফ্রক পরা, চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত। অষ্টম বাচ্চাটা... অর্ণবের পাশে। একদম গা ঘেঁষে। ছেলেটার মুখে হাসি নেই। শুধু অর্ণবের দিকে তাকিয়ে আছে।
অর্ণবের মাথা দপদপ করছে। এই দুটো মুখ সে চেনে না। একেবারেই না। অথচ ছবিতে তার কাঁধে হাত রেখেছে অষ্টম ছেলেটা। বন্ধুর মতো। হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটোবেলায় মা বলত,
-তোর তো একটা জমজ ভাই ছিল রে, জন্মেই...
বাকিটা কখনও বলেনি। ঠিক তখনই লোডশেডিং। ঘর অন্ধকার। মোবাইলের আলোয় অ্যালবামের দিকে তাকিয়ে অর্ণব দেখল আট নম্বর বাচ্চাটা এখন আর হাসছে না। ছবির ভেতর তার ঠোঁট নড়ছে। অন্ধকার ঘরে মোবাইলের আলো কাঁপছে। অর্ণব অ্যালবাম বন্ধ করে ফেলল। বুক ধড়ফড় করছে। সে তো পুলিশ। খুনি ধরাই তার কাজ। অথচ ছয়টা লাশের সাথে তার ছোটবেলার ছবি কেন?
সে ওয়াশরুমে গেল। মুখে জল দেবে। বেসিনের আয়নায় তাকাতেই পেট গুলিয়ে উঠল। তার শার্টের কলারে লাল ছোপ। টাটকা রক্ত। কখন লাগল? সে তো আজ সারাদিন থানাতেই ছিল। কাঁপা হাতে শার্ট খুলল। তার ডান হাতের কবজিতে নখের আঁচড়। চারটে গভীর দাগ, জমাট রক্ত। ব্যথা করছে না কেন? কখন হলো এটা? টেবিলে ফিরে এসে ফরেনসিকের ফটোগুলো আবার দেখল। শেষ ভিক্টিম, মালদার এক স্কুলমাস্টার। খুন হয়েছে গতকাল রাত ১১টায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে খুনি বাঁ-হাতি না। ডান হাতেই গলা টিপে ধরেছিল। ভিক্টিম ধস্তাধস্তি করেছিল। খুনির কবজিতে নখ বসিয়ে দিয়েছিল।
অর্ণবের ফোনে গ্যালারি খুলল। গতকাল রাত ১০টা ৪০। একটা সেলফি। লালবাজারের পার্কিং লটে। সে একা দাঁড়িয়ে, কিন্তু পেছনের গাড়ির কাচে আবছা একটা রিফ্লেকশন। আরেকজন ছিল তার সাথে। পরের ছবি রাত ১টা। সে নিজের বিছানায় শুয়ে। শার্টে রক্ত নেই। কবজি পরিষ্কার। মাঝের দু'ঘণ্টা? ফোনে কোনো কল লগ নেই, কোনো লোকেশন নেই। ড্রয়ার খুলতেই পাওয়া গেল একটা চাবির রিং। চাবিটা তার না। আর একটা ভাঁজ করা কাগজ। তাতে তার নিজের হাতের লেখা ৬ নম্বর শেষ। আর একটা বাকি। সপ্তমটা আমি।
চিরকুটটা হাতে নিয়ে অর্ণবের গলা শুকিয়ে গেল। সপ্তমটা আমি। মানে আজ রাতেই শেষ খুন। আর খুন হবে সে নিজে। সে পুরনো ডায়েরি খুঁজে বের করল। ক্লাস এইটে লেখা শেষ করেছিল। মাঝের পাতাগুলো ছেঁড়া। শেষ পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
-আমরা দুজন। ও রাগলে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আমি ঘুমালে ও জেগে ওঠে। তারিখ ১৯৯৮, পুজোর পরের দিন।
হঠাৎ বুঝল ফটোর আট নম্বর বাচ্চাটা কেউ আলাদা না। ওটাই সে। তার অন্য নাম। ছোটবেলায় মা আদর করে ডাকত ‘অংশু’ বলে। রেগে গেলে বাবা বলত, ‘অংশুকে ঘুম পাড়া, অর্ণবকে ডাক। সে ভাবত বকুনি। আসলে ওটা ছিল নির্দেশ। আয়নার সামনে দাঁড়াল অর্ণব। চোখে চোখ রাখল নিজের সাথে। ফিফি করে বলল অংশু?
আয়নার ভেতর ঠোঁটটা বেঁকে গেল। হাসল। কিন্তু অর্ণব হাসেনি। আয়নার অর্ণব কথা বলল। গলাটা তারই, কিন্তু স্বরটা খসখসে।
-টা কাঁটা সরিয়েছি। ওরা আমাদের চুরির কথা জেনে গিয়েছিল, মনে নেই? প্যান্ডেলের পেছনে বাক্সটা? আমরা ভাগ করিনি বলে ওরা মাকে বলে দেবে বলেছিল
অর্ণবের মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল একটা স্মৃতি। অন্ধকার ঘর। সাতটা বাচ্চা। একটা টিনের বাক্স। ভেতরে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। কার টাকা কে জানে। তারা নিয়েছিল। তারপর... তারপর ফাঁকা।
-তুই মারলি ওদের?
অর্ণব জিজ্ঞেস করল আয়নাকে। আয়নার অংশু মাথা নাড়ল।
-আমি আমাদের বাঁচালাম। এখন শুধু তুই বাকি। চিরকুটে লিখেছি তো। সপ্তমটা তুই। কারণ তুই দুর্বল। তুই থানায় যাবি, সব বলে দিবি। আমি ধরা পড়ে যাব।
ঘরের লাইট কাঁপতে লাগল। অর্ণব টের পেল তার ডান হাত উঠছে। নিজে থেকে না। হাতটা গলার দিকে এগোচ্ছে। আঙুলগুলো শক্ত হচ্ছে। অংশু জেগে উঠছে, মানে অর্ণব ঘুমিয়ে পড়ছে। অর্ণবের ডান হাত তখন গলায়। নখ বসে যাচ্ছে চামড়ায়। সে বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতের কবজি চেপে ধরল। নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। আয়নার অংশু খিলখিল করে হাসছে,
-পারবি না রে অর্ণব। আমি তোর অন্ধকার। অন্ধকারকে মারা যায় না।
ঘরের সব ড্রয়ার হাট করে খুলে গেল। ফাইল উড়ছে। ছটা ভিক্টিমের ফটো হাওয়ায় ভাসছে। প্রতিটা মুখ অর্ণবের দিকে তাকিয়ে। চোখে একটাই প্রশ্ন কেন?
অর্ণব চিৎকার করে উঠল। টেবিলের কোণায় মাথা ঠুকে দিল নিজের। কপাল ফেটে রক্ত। এক সেকেন্ডের জন্য হাতের জোর কমল। সেই ফাঁকে সে ছুটে গেল রান্নাঘরে। ছুরি। এক কোপে শেষ করে দেবে এই খেলা। ছুরি তুলতেই আয়নার অংশুর গলা ভেসে এল পেছন থেকে,
-মার আমাকে। মারলেই তুইও মরবি। আমরা একই শরীর, ভুলে গেলি?
হাত থেমে গেল অর্ণবের। সত্যিই তো। অংশুকে মারতে গেলে শরীরটা তো তারই। ছুরিটা কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে পড়ে গেল। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। লড়াই শেষ। দম শেষ। গলা দিয়ে গোঙানির মতো আওয়াজ বের হলো,
-আমিই মেরেছি ওদের। আমি, অংশু... আমরা। টাকার জন্য না। ভয়ের জন্য। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে।
কথাটা বলার সাথে সাথে ঘরটা চুপ হয়ে গেল। ফ্যানের শব্দ থামল। ফটোগুলো ধপ করে মেঝেতে পড়ল। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখল অংশু আর হাসছে না। শুধু তাকিয়ে আছে। চোখে জল।
অর্ণব মোবাইলটা তুলে ডায়াল করল। লালবাজার কন্ট্রোল রুম।
-হ্যালো, আমি সাবইন্সপেক্টর অর্ণব সেন বলছি। একটা সেলফ-স্যারেন্ডার আছে। চার্জ সিরিয়াল কিলিং। ভিক্টিম ছজন। সপ্তম জন এখনও বেঁচে... আমাকে নিতে আসুন।
ফোন রাখতেই পেছনের আয়নায় শেষবারের মতো তাকাল। অংশু আস্তে মাথা নাড়ল। এবার শান্তি। দুজনেরই।
বাইরে পুলিশের সাইরেন বাজছে। স্যারেন্ডারের ২০ মিনিটের মাথায় লালবাজারের টিম অর্ণবের ফ্ল্যাটে। হাতকড়া পরানোর আগেই অর্ণব বলল,
-আমার মেডিক্যাল টেস্ট করান স্যার। ব্রেন স্ক্যান, নারকো, সব। আমি জানতে চাই আমার ভেতরে কে আছে।
ডাক্তারি পরীক্ষা — SSKM হসপিটাল, সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ড*
ডা. সান্যাল রিপোর্ট দেখে চশমা খুললেন। Dissociative Identity Disorder, অফিসার। ছোটবেলার ট্রমা থেকে তৈরি। MRI-তে দেখা যাচ্ছে আপনার ব্রেনের অ্যামিগডালা আর হিপোক্যাম্পাসে অস্বাভাবিক অ্যাক্টিভিটি। যখন ‘অংশু’ অ্যাক্টিভ হয়, তখন আপনার কনশাস মেমরি অফ হয়ে যায়। তাই দু'ঘণ্টার গ্যাপ। হাতের নখের আঁচড়, শার্টের রক্ত — সব ভিক্টিমের DNA-এর সাথে মিলে গেছে। কিন্তু আপনার কোনো স্মৃতি নেই কারণ খুনগুলো আপনি করেননি, অংশু করেছে। একই শরীর, আলাদা মানুষ।
নারকো টেস্টের ট্রান্সক্রিপ্টে অর্ণবের গলা হঠাৎ পালটে যায়। রেকর্ডিংয়ে শোনা যায় খসখসে স্বর,
-আমি অংশু। আমি বাঁচিয়েছি আমাদের। অর্ণবটা ভীতু। ও থানায় গিয়ে সব বলে দিত।
পুলিশি তদন্ত — ফরেনসিক রিপোর্ট*
CCTV ফুটেজে দেখা গেল গতকাল রাত ১১টায় অর্ণব একা বেরোচ্ছে। পরনে সাদা শার্ট। ফিরছে রাত ১টায়। শার্টে লাল ছোপ। হাঁটার ধরন আলাদা। কাঁধ ঝুঁকে, পা টেনে টেনে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট বলল, ‘দুটো আলাদা মানুষের হাঁটা
পুরনো ১৯৯৮ সালের কেস ফাইল খোলা হলো। বরানগর থানার GDপুজোর চাঁদার ৮০ হাজার টাকা চুরি। সাতটা বাচ্চাকে জেরা করা হয়েছিল। সাত নম্বর বাচ্চা, অর্ণব সেন, জেরার মাঝে অজ্ঞান হয়ে যায়। কেস ক্লোজ। টাকা উদ্ধার হয়নি। এখন ছজন ভিক্টিম সেই সাত বাচ্চার ছজন। বেঁচে আছে শুধু অর্ণব।
অর্ণবের ফ্ল্যাটের তোশকের তলা থেকে উদ্ধার হলো একটা টিনের বাক্স। ভেতরে শুকনো রক্ত মাখা ৮০ হাজার টাকা। আর একটা কাগজ। বাচ্চা হাতের লেখা ভাগ করিনি। তাই ওরা মরল। আমি বাঁচলাম। — অংশু
কোর্টের রায়: ভারতীয় দণ্ডবিধি ৮৪ ধারা। Insanity defenseঅর্ণবকে খুনি সাব্যস্ত করা হলো না। পাঠানো হলো পাভলভ মেন্টাল হসপিটালে। ট্রিটমেন্ট চলবে।
হসপিটালের সেল। অর্ণব জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে। নার্স এসে ঘুমের ওষুধ দিল। ওষুধ খেয়ে শোবার আগে আয়নায় তাকাল। ফিফি করে বলল গুড নাইট অংশু।
 
আয়নার ভেতর থেকে কেউ উত্তর দিল না। এই প্রথমবার।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)