বাতায়ন/শারদীয়া/অন্য চোখে/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
অন্য চোখে
গৌতম সমাজদার
দেবী দুর্গা ও ধুনুচি নাচ
ধুনোর গন্ধ পূজামণ্ডপ-সহ সর্বত্রই একটা পবিত্রতার আবহ তৈরি করে। বিশ্বাস করা হয়, এই সুগন্ধি ধোঁয়া সমস্ত অশুভ শক্তি বিনাশ করে শুভ শক্তির আগমণ ঘটায়।
বাঙালির
আনন্দে মেতে ওঠার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। আমরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকি এই
আনন্দযজ্ঞর জন্য। সমাজের সব স্তরের মানুষ তার সাধ্যমতো এই পুজোয় সামিল হয়। এই
উৎসবে পিছিয়ে পড়া মানুষেরও হাতে পয়সা আসে, যা আর্থসামাজিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুজোকে কেন্দ্র করে
কোথাও সাবেকি পুজো, কোথাও থিমের পুজো, বিভিন্ন শিল্পীদের হাতে তৈরি
পূজামণ্ডপ, প্যান্ডেল আমাদের
শুধু নজরই কাড়ে না, নতুন ভাবনায়ও
উদ্দীপ্ত করে। 'আলোকের ঝরনাধারায়' পাড়ায় পাড়ায় আনন্দের
বন্যা বয়ে যায়। এবারের পুজো শেষ হলেই পরের দিন থেকে আগামী বছরের পুজোর ভাবনা
শুরু হয়ে যায়।
পৌরাণিক
তথ্য থেকে জানা যায়, এই পুজোর প্রচলন
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ঘটেছে। তবে পুরাণমতে এই পুজো প্রথম শুরু করেন রাজা সুরথ
বা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। ইনি ছিলেন চন্দ্রবংশীয়। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি সমস্ত কিছু
ছেড়ে পথে পথে ঘুরে সবশেষে এসে পৌঁছোন মেধা ঋষির আশ্রমে। আশ্রমিক শান্তি থাকলেও
তিনি পরাজয় মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। উদ্বিগ্নতার মধ্যেই তিনি ঋষির
কাছে এলে তপস্বী ঋষি তাকে চণ্ডীদেবীর মাহাত্ম্যের গল্প শোনালেন, যা থেকে রাজা সুরথ বুঝতে
পারলেন, পৃথিবীর সমস্ত
কার্য্যকর্মই এই দেবীর প্রভাবে ঘটে। তখন রাজা সুরথ শুরু করলেন নিবিড় তপস্যা। তিন
বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরে আয়োজন করলেন দেবী দুর্গার বিশেষ আরাধনা। সময়টা
ছিল বসন্তকাল। এই আরাধনার পরেই দেবীর বরে রাজা সুরথ ফিরে পেলেন তাঁর সেই প্রিয়
রাজ্য। ফিরে পেলেন তাঁর হারানো গৌরব। তবে বাংলায় প্রথম সার্বজনীন বা বারোয়ারী
দুর্গাপুজো শুরু হয় ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় ১২ জন সদস্যকে নিয়ে।
জনশ্রুতি, এই ১২ জন মিলে পুজো
করেছিলেন। সেই থেকেই 'বারোয়ারী' কথার উৎপত্তি। আবার অনেকে মনে
করেন, ১৭ শতকের শুরুতে
নদিয়া জেলার রাজা ভবানন্দ মজুমদার এই পুজোর প্রথম প্রচলন করেন। কারো মতে
তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ শারদীয়া দুর্গাপুজো প্রথম করেছিলেন। কলকাতায় এই পুজো
শোভাবাজার রাজবাড়িতে ১৭৫৭ সালে রাজা নবকৃষ্ণদেব 'কোম্পানী পুজো' নামে শুরু করেন।
কথিত
আছে বহু যুগ আগে মহিষাসুর নামে এক শক্তিশালী অসুর একশো বছর ধরে চলা যুদ্ধে জিতে
দেবতাদের স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেন। স্বভাবতই বিতাড়িত দেবদেবীরা ক্রুদ্ধ হন। সকলে
আলোচনা করে সবার মিলিত শক্তি একত্রিত করে সমাধান করার কথা ভাবলেন, আর সমস্ত তেজঃপুঞ্জ একত্রিত
হয়ে এক নারীর জন্ম দিলেন,
যার কাজ
হবে দেব-নরের দুর্গতি নাশ করে শান্তি ফিরিয়ে আনা। সেই থেকে দেবীর নাম হল দুর্গা।
দেবী দুর্গা একে একে সেই অসুরবাহিনীর সবাইকে শেষ করার পর মহিষাসুর নিজে যুদ্ধ করতে
এসে বিভিন্ন মায়ায় দেবীকে প্রভাবিত করতে চাইলেও দেবী দুর্গা এক ফোঁটাও বিচলিত
হলেন না। ফলে মহিষাসুর প্রবল গর্জন শুরু করলেন। দেবী দুর্গা মহিষাসুরের কাঁধে চড়ে
তাকে হত্যা করলেন। তা দেখে কিছু জীবিত মহিষাসুর সেনারাও দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ
করলেন। ফলে দেবদেবীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ আবার ফিরে পেলেন। সেই থেকে
শুক্লপক্ষের সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিথিতে দেবী দুর্গাকে
পুজো করা শুরু হয় এবং দশমীতে মহিষাসুর মৃত্যুবরণ করেন।
এই
উৎসবে আজকের দিনে পুজোর সাথে আরও আনন্দের উপকরণ থাকে, যেমন নাচ,
গান, ঢাকের বাদ্যি, যা অবশ্য আগেও ছিল। কিন্তু
বর্তমানে তা অনেক আধুনিক হয়েছে। এই পুজোর অন্যান্য সবকিছুর সাথে ধুনুচি নাচ একটি
উল্লেখযোগ্য বিষয়। ধর্মীয় বিভিন্ন আচার, ভক্তিগান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ষষ্ঠী
পুজোর দিন থেকেই এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়, আর সঙ্গে থাকে ধুনুচি নাচ। এই নাচের মাহাত্ম্য অনেক, এই নাচেরও একটা অর্থ
ও নিয়মনীতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ধুনুচিতে জ্বলন্ত কয়লা, ধূপকাঠি, ধূনো দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়, মনে করা হয় এই সুগন্ধি
ধোঁয়া দেবী দুর্গাকে খুশি করে,
আনন্দ
দেয়। এই ধুনোর গন্ধ পূজামণ্ডপ-সহ সর্বত্রই একটা পবিত্রতার আবহ তৈরি করে। বিশ্বাস করা হয়, এই সুগন্ধি ধোঁয়া সমস্ত অশুভ
শক্তি বিনাশ করে শুভ শক্তির আগমণ ঘটায়। ধুনুচি মাটির তৈরি হয় এবং এর মধ্যে
পবিত্র ফল নারকেলের ছোবড়া দেওয়া হয়, যা আগুন জ্বালাতে ও ধোঁয়া তৈরিতে কার্যকরী। বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি বিশেষ
পর্যায় হচ্ছে এই ধুনুচি নাচ। পূজামণ্ডপে যখন একত্রে ঢাক, কাঁসর,
শাঁখের
শব্দ, ধুনুচির সুগন্ধি
ধোঁয়া নির্গত হয়ে একটা সুন্দর পবিত্র মোহময় পরিবেশ তৈরি করে, তখন মনেও শুদ্ধতা, শান্তি ও পবিত্রতা আনে।
মূলত
বাংলার জমিদার ও রাজারা শুরুতে এই পুজো করলেও বর্তমানে প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই এই
পুজো হয় আড়ম্বরে। আমরা জানি আগের দিনে যুদ্ধে যাবার আগে সেনাবাহিনী জ্বলন্ত মশাল, ধুনুচি নিয়ে নাচ করে মায়ের
আশীর্বাদ চাইত। সেই নাচের মূল সুর ছিল তাদের যুদ্ধ জেতানোর আহ্বান, যা পরে দুর্গাপূজার মণ্ডপেও
এসে যায়।
আমরা
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দ মঠ'-এ সন্তানদলের উল্লেখ
করতে গিয়ে 'বন্দে মাতরম্' ও ধুনুচি নাচ দেশপ্রেমেরও ডাক নিয়ে এল। স্বাধীনতা
সংগ্রামের সময়ও বিপ্লবীরা এই ধুনুচি নাচের মাধ্যমে ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে লোক
জড়ো করত। পূর্বে গ্রামাঞ্চলে বিজয়ার পর এই ধুনুচি নাচ হত। আজ কলকাতা-সহ বড় বড় বারোয়ারী
পুজো ও বাড়ির পুজোতেও এই নাচের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। শুরুটা পুরুষরা করলেও
আজ মহিলারাও এই নাচে যথেষ্ট পারদর্শী, যা মুহূর্তে সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের নজরে আসে। আগে শুধু নবমীর দিন এই
ধুনুচি নাচ হলেও বর্তমানে সন্ধিপুজোর সময়, বিসর্জনের আগে এই নাচ হয়, বোল তুলছে ঢাক, সাথে ধুনুচি নাচ অতি পরিচিত। এই নাচ দুর্গাপুজোর আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
নারী-পুরুষ সবাই ধুনুচি নাচে মেতে ওঠে। এই নাচ কিন্তু বহু আগে থেকেই প্রজন্মের পর
প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। ধুনুচি কখনো হাতে, কখনো মুখে, কখনো বা কোমরে রেখে
ঢাকের তালে পা মিলিয়ে নাচের মুদ্রা নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন শিল্পী, প্রতিযোগীরা। বিশ্বাস করা হয়, এই নাচের মাধ্যমে নিজেকে দেবী
দুর্গার কাছে সমর্পণ করা হয়। আবার শারদীয়ার সময় আদিবাসীরাও দুর্গাকে খোঁজে, নাচের মাধ্যমে চলে দেবীর
খোঁজ। আজও হয় এই নাচ। এই নাচের মাধ্যমে তাদের ভগবান 'হুদুড় দুর্গা'কে খুঁজে বেড়ানোই নিয়ম।
আসলে দাসাই আদিবাসীদের এটা যুদ্ধের নাচ। অনেকে বলেন, মহিষাসুরের স্মৃতির সঙ্গে এই নাচ জড়িয়ে আছে,
অবশ্য
এই নাচ তাদের কাছে দুঃখের।
ধুনুচি
নাচ প্রকৃতপক্ষে বিজয় ও ক্ষমতায়নের বিষয়। এই নাচ যেমন দেবীর প্রতি আত্মসমর্পণের
প্রতীক, তেমনই এই ধুনুচি নাচ
নৃত্যশিল্পীর শক্তি, ছন্দ, তাল লয়ের সমন্বয়। সবচেয়ে
বড় বিষয় হল এই নাচের মাধ্যমে নারীশক্তিকে স্বীকার করা ও নারীশক্তির প্রতি সম্মান, সৌজন্য প্রদান করা। এই নাচ
অনেক মানুষকে একত্রিত করে,
ফলে
মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে।
স্নায়ুবিজ্ঞান
বলে, অন্য মানুষের সাথে
তাল মিলিয়ে নড়াচড়া করলে তাদের নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা, সহানুভূতি ও বিশ্বাসের সেতু তৈরি হয়, কারণ একত্রিত হয়ে নাচ করলে
শরীরে অক্সিটোসিন হরমোন নির্গত হয় যা বন্ধন ও স্নেহের সাথে সম্পর্কিত।
~~000~~
No comments:
Post a Comment