প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

বাপের ঘরে উমা | সঙ্ঘমিত্রা দাস

বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা দাস
বাপের ঘরে উমা

"ফোনটা রাখতে গিয়ে খেয়াল পড়ল একটা পাত্রে জলের মধ্যে মা বেশ কিছু শিউলি ফুল রেখেছে। চারদিকে সুন্দর একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরটা পবিত্র হয়ে গেছে সেই সুবাসে।"

 
তৃণার বিয়ের পরে তিনটে পুজো কেটে গেছে। আবার পুজো আসছে। এই সময় মনটা খুব আকুল হয়। বাইরের রুপালি রোদ, সাদা মেঘের নৌকো মা রওনা দিয়েছেন ওই স্বর্গ থেকে। চারদিকে আগমনির গান, দোকানে দোকানে আলোর রোশনাই, ব্যস্ত কেনাকাটা সবমিলিয়ে মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। বাড়ির জন্য খুব মন খারাপ হয়। সেই পাড়ার পুজোমণ্ডপ, সোমা, বহ্নি, কাকলির সাথে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা। আলুকাবলি, ফুচকা খাওয়া। তারপর রাতে পেট ব্যথায় মায়ের বকুনি, বাবার পিছনে লুকিয়ে থাকা। কত কথা মনে পড়ে যায়। সবকিছু কত তাড়াতড়ি বদলে গেল। বাইশ বছর বয়স পেরোতে না পেরোতেই বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে এলো। স্বামী আর শাশুড়ি নিয়ে ছোট সংসার। এক নতুন ঘর, নতুন মানুষ, বদলে গেল অনেকখানি। সুদর্শন চেহারা, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি ছেলের কোন দাবিদাওয়া নেই। বাবা একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন এমন সম্বন্ধে। রিটায়ারমেন্টের আর দুটো বছর বাকি ছিল তাই তাড়াতাড়ি মেয়েকে পাত্রস্থ করে নিশ্চিন্ত হলেন। বাড়িটা কবে যে বাপের বাড়ি হয়ে গেল টেরই পেল না তৃণা। ছুটির দিন বরের সাথে মাঝেমধ্যে ঘুরে যায় ব্যাস, এটুকুই। থাকা হয় না। ছোট সংসারে একজন না থাকলেই নাকি ওদের খুব ফাঁকা লাগে। নিজের ওই ঘর, বিছানা, উঠোন চোখ বুজলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অন্য সময় যা হোক করে কাটলেও পুজোর সময় মায়ের হাতের নানারকম রান্না, রাতে শুয়ে গল্প করা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা খুব মিস করে তৃণা। কয়েকবার বরমশাইকে বলেছে কিন্তু ওই একই কথা একসাথে যাব, সারাদিন থেকে আনন্দ করে ফিরে আসব। সোমা বহ্নি ওরা এখনো পাড়ার পুজোয় কী সুন্দর মজা করছে। নবমীতে মণ্ডপে বসে একসাথে খাওয়া, মায়ের পিছু পিছু ঠাকুর বরণ এসব এখন অতীত। এই বছর তো তৃণা আবার চুটকুর জন্ম দিয়েছে। ওর ছেলে, আট মাস বয়স। তাকে নিয়েই বড় ব্যস্ত এখন। পুজোয় বোধহয় এত ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে এবছর যাওয়াই হবে না।
 
পুজোর কেনাকাটা সব কমপ্লিট। মা, বাবা, শাশুড়ি-মা, শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন সকলের জন্য জামা, শাড়ি তৃণা নিজে পছন্দ করে কিনেছে। এখন অনেক সুবিধা, অন লাইনে ঘরে বসে অর্ডার দিলে দরজায় এসে হাজির। ছোট বাচ্চা রেখে দোকানে বা মলে যাওয়া সম্ভব নয়। তবুও দু'দিন কয়েক ঘন্টা শাশুড়ির কাছে ছেলেকে রেখে ঘুরে এসেছে শাড়ির দোকানে। অন লাইনে শাড়িগুলো ভাল হয় না। দেখতে দেখতে মহালয়া এসে গেল। কয়েকটা দিন আর বাকি। সবার উপহার এবার শাশুড়ি-মা একাই দিয়ে এসেছেন। মা-বাবার জামাকাপড় দিতে তাদের জামাই গেছিল। মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসে তৃণার। কতদিন বাড়ি যায় না। মা-বাবা আসেন যদিও তাদের নাতির টানে। এরমধ্যে বর্ধমানে তৃণার বরের কোন একটা কাজ পড়ে গেল। শাশুড়ি-মা বায়না ধরলেন তার বোনের বাড়িও বর্ধমানেই, তাই এই সুযোগে ছেলের সাথে যদি একবার ঘুরে আসা যেত। কিন্তু বৌমাকে একা বাড়ি রেখে যাওয়া সম্ভব নয়। বাচ্চা নিয়ে পেরে উঠবে না। তৃণা এমনই একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বলল সেও তাহলে ওই দুটো দিন মায়ের কাছে থেকে আসতে পারে। অন্য সময় হলে শাশুড়ি ঠিক নাকচ করে দিতেন কিন্তু এবার তা হলো না। মহালয়ার আগের দিন ওনারা বর্ধমান  যাবার আগে তৃণাকে ওর বর বাপের বাড়ি রেখে এলেন। দুটো দিন যেন ওর কাছে এক যুগের আনন্দ বয়ে আনল। ভীষণ খুশি তৃণা।
 
সন্ধে নেমেছে, কিন্তু পাড়ার আকাশটা ফ্লাড লাইটের আলোয় ঝলমল করছে। বসুদের ফাঁকা জমিটায় প্যান্ডেল বাঁধা চলছে। গণেশ কাকা, ফটিক দা এবার পাড়ার পুজোর দায়িত্বে। বেশ গম্ভীর মুখে তত্বাবধানে ব্যস্ত। দোতলার ঝুল বারান্দায় বসে মাঠটা পুরো দেখা যায়। তৃণা একমনে সেদিকে চেয়ে আছে। এই কয়েক বছরেই কত বদলে গেছে যেন। নিজেকে কেমন অতিথি মনে হচ্ছে। আগের মতো দৌঁড়ে প্যান্ডেলে যেতে পারছে না তো। বন্ধুরাও অনেকে তাদের শ্বশুরবাড়ি। চেনা সেই মুখগুলো নেই। রান্নাঘর থেকে পোলাও-এর গন্ধ ভেসে আসছে। আহা, কী সুবাস! রাতে মায়ের হাতে রান্না পোলাও, মাংস, ভেবেই জিভে জল চলে এলো। বাবা তো তার নাতির ঘুমন্ত মুখের থেকে চোখ ফেরাতেই চাইছে না। সন্ধে থেকে ওর কাছেই বসে আছে। বিকেলে প্যান্ডেলে একটু আড্ডা দিতেও যায়নি। গণেশ কাকা নীচের থেকে ডাক দিয়েছিল তারপর তৃণাকে দেখে বুঝেছে মেয়ে, নাতি ছেড়ে আজ আর বাবা বের হবে না। রাতে খেতে বসে কত গল্প হলো তিনজনে। বাবা মোবাইলটা ফুল চার্জ করে রেখেছে। সকালে মহালয়া শুনতে হবে যে। আজও এই বাড়িতে ভোরে মহালয়া বাজে। তৃণাও এই বছর বাবা-মায়ের সাথে একসাথে বসে মহালয়া শুনবে। বারবার মা-কে ডেকে দিতে বলল। নিজেও একটা অ্যালার্ম লাগাল ঘড়িতে। ভোর বেলা, তখন অন্ধকার মা চা নিয়ে ডেকে দেয় ওদের। সোফায় গা এলিয়ে বসে তৃণা। পাশের বাড়ির মিনু কাকিমা ওর আসার কথা শুনে সকালে দরজায় কড়া নেড়েছে। একসাথে মহালয়া শুনবে সেই ছোটবেলায় ওরা যখন এই পাড়ায় নতুন এসেছিল সেই সময়ের মতো। বাবা আর কাকু একই অফিসে কাজ করত। এই জমিটা দুজনে ভাগ করে কিনেছিল, সেও বছর কুড়ি আগের কথা। কাকু এলেন কিছু পরে। তার জন্য চা রাখাই ছিল, সবাই মিলে বেশ পুরোনো একটা আবেগে ভেসে গেল। যদিও কাকুর একমাত্র ছেলে কুন্তলও থাকত আগে, এখন সে ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে। পুজোর সময় দিন চারেকের ছুটিতে আসবে।
 
মহালয়া শেষ হতে বাবা বলল, "যাবি নাকি ছোটবেলার মতো সকালে ফুল তুলতে। আগে তো বেরোতাম আমরা, আবার একবার হবে নাকি?" মা মৃদু আপত্তি করলেও তৃণা প্রায় লাফিয়ে উঠল। সে রাজি। ভোরের আলো এখনো ভাল করে ফোটেনি। একটা ফুলের সাজি নিয়ে বাবা মেয়েতে বেরিয়ে পড়ল। পাড়ায় ঘুরে টগর, গোলাপ, স্হল পদ্ম, শিউলি আরো আরো কত ফুল কুড়াল। বেশিরভাগ বাড়িই অন্ধকার, এখন মহালয়া শুনতে অত ভোরে অনেকেই ওঠে না। হাঁটতে হাঁটতে ঝিল পাড়ের কাছে এসে গোপাল দার সাথে দেখা। ওদের কয়েকটা বাড়ি পরে বাড়ি। সেও মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েছে ওদের মতোই। ছোট্ট মেয়েটা কী খুশিতে ফুল তুলছে। কারোকে দেখলেই আবার লুকিয়ে পড়ছে। নিজের ছোটবেলাটা চোখের সামনে ভেসে উঠল তৃণার।
 
দুজনে মিলে আরও অনেক ফুল তুলল, জবা নীলকন্ঠ আরও কত। সাজি ভরে উঠল ওদের। বাচ্চা মেয়েটি এমন একজন সঙ্গী পেয়ে দারুণ খুশি। হাসি মুখে ঘরে ফিরল ওরা তখন সূর্য উঠে গেছে। সকালে বাবা বাজার থেকে জিলিপি নিয়ে এলো। রুটি আর জিলিপি তৃণার খুব প্রিয়। মিনু কাকিমা আজ সারাদিন ওদের বাড়িতে। দুজন মিলে ফুল দিয়ে মালা গাঁথল, চন্দন বাটল। মা পুজোর ঘর, ঠাকুরের আসন ফুল মালায় সাজিয়ে ধূপ ধুনো আর নারকেলের নাড়ু দিয়ে পুজো সারলেন। বাইরে রাস্তায় মাইক লেগেছে পুজোর। মাঝে মাঝেই তাতে মহালয়া ভেসে আসছে। মা নাতির কপালে সুন্দর করে চন্দনের টিপ দিয়েছে। ধূপধুনোর গন্ধে মা দুগ্গা যেন আজই নেমে এসেছেন ওদের ঘরে। সারাটা দিন কীভাবে যেন কেটে গেল। আজ রাতে তৃণা রান্না করবে। মা-বাবাকে তো নিজে রান্না করে খাওয়ানো হয় না। মিনু কাকিমা থাকবে সাথে। খিচুড়ি আর পাঁচমিশালি তরকারি হল। কাকিমা বেগুনি ভাজলেন। মা-বাবা কাকু তাদের নাতিকে নিয়ে আনন্দে সময় কাটালেন বেশ। রাতে হইহই করে একসাথে খাওয়াদাওয়া হল। এতদিনের সব চাওয়া যেন একটা দিনেই মিটিয়ে নিল তৃণা।
 
সব কাজ সেরে মায়ের কাছে এসে বসল যখন অনেকটা রাত হয়ে গেছে। মা নাতিকে পায়ে দোল দিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে। বাবা নিঃশব্দে টিভিতে পুরোনো কোন ম্যাচে মনোনিবেশ করেছে। ফোনটা বেজে উঠল তৃণার, বরের ফোন। কাল বিকেলের ট্রেনে ফিরছে ওরা। তাই পরশু অফিস সেরে বিকেলে ফেরার পথে ওকে নিতে আসবে। তার মানে আরো দুটো দিন মায়ের কাছে থাকতে পারবে। মনে মনে বেশ কিছু প্ল্যান বানিয়ে ফেলল নিমেষে। কিন্তু বরমশাইকে তা বুঝতে দিল না। ফোনটা রাখতে গিয়ে খেয়াল পড়ল একটা পাত্রে জলের মধ্যে মা বেশ কিছু শিউলি ফুল রেখেছে। চারদিকে সুন্দর একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরটা পবিত্র হয়ে গেছে সেই সুবাসে। বেশ ক্লান্ত লাগছে। সারাদিন হইহুল্লোড়ে পুজোর শুরুটা সত্যি দারুণ জমে গেল। মায়ের পাশে বসে বকবক করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল। দেবীপক্ষের শুরুটা স্বপ্নের মতো কেটে গেল। কতদিন ধরে এমন একটা দিনের স্বপ্ন ও দেখেছিল।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)