বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
ঈষিকা সূত্রধর
শরতের একটা নতুন জামা
অলোকবাবুর নিভৃত হৃদয়ে এক চিরন্তন প্রশ্ন হাহাকার করে ওঠে—এই উৎসবের আলো কি কেবল ধূলিধূসর জানালার বাইরেই স্থির হয়ে থাকবে, নাকি কোনোদিন এই জীর্ণ ভিটের ভেতরেও পূর্ণতা নিয়ে প্রবেশ করবে?
ভাদ্রের
অপরাহ্ণ আলো যখন ধীরে ধীরে আমন ধানখেতের ওপর ক্লান্ত সোনালি আভা ছড়িয়ে নিভে আসছিল, তখন অলোকবাবুর টিনের চালের
বারান্দায় এক বিষণ্ণ নীরবতা। তারের ওপর মেলে দেওয়া ন্যাপথলিনের গন্ধমাখা পুরনো
জামাগুলো বাতাসের আলতো ছোঁয়ায় কাঁপছে। মধ্যবিত্তের হিসেবি খাতার পাতায় পেনসিলের
আঁকা হিজিবিজি অঙ্কগুলো যেন দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। আশ্বিনের দেবীপক্ষ তো
দোরগোড়ায়, কিন্তু সংস্থানের
ভাণ্ডার যে বড় নিঃস্ব, বড় করুণ।
তবুও
এই এক আশ্চর্য ঋতু—যা অভাবের জীর্ণ ভিটেতেও অলৌকিক এক সুবাস বয়ে আনে। ছোট ছেলে
বাপির কাছে শরতের আনন্দ কোনো জটিল অঙ্কের অধীন নয়; তার সমস্ত জগত আটকে আছে পঞ্জিকার পাতায় লাল কালি পড়া
মহালয়ার ভোর আর মণ্ডপের ঢাকের প্রথম কাঠিটার মধ্যে। বড় মেয়ে টুপুর তার শত
দারিদ্র্যের শাড়ির আঁচল ঢেকে বন্ধুদের আড়ালে কেবল হিসাব করে—কার ক'খানি বস্ত্র হলো। আর গৃহিণী
সুমিত্রা; সংসারের সহস্র
অপ্রাপ্তিকে হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে তিনি চাল-ডালের কৌটো ধুয়ে, ঘরের কোণ ঝাড়পোছ করে যেন এক
অদৃশ্য আগমনির পিঁড়ি পাতেন।
গতকাল
রজনীর দ্বিতীয় প্রহরে যখন চণ্ডীমণ্ডপ থেকে ভেসে আসছিল কাাঁসরের মৃদু ঝঙ্কার, অলোকবাবু হাতে একটি ক্ষুদ্র
মোড়ক নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। মোড়ক উন্মোচন করতেই টুপুরের জন্য একখানি নিতান্ত
সাধারণ সুতির পোশাক আর বাপির জন্য একখণ্ড লাল বস্ত্র বেরিয়ে এলো। সুমিত্রার চোখ
দুটি যখন এক অব্যক্ত প্রশ্নে অলোকবাবুর মুখের ওপর স্থির হলো, অলোকবাবু ম্লান হেসে দৃষ্টি
ফিরিয়ে নিলেন—"সামনের মাসে বুঝি বোনাসের বাকি অংশটা মিলবে, তখন তোমার জন্য একখানা
শাড়ি..." কথাটি
সমাপ্ত হলো না, কারণ সুমিত্রা
জানেন—এই 'আগামী মাস' এক চিরন্তন ছলনা। তবুও তিনি
নিপুণ হস্তে সেই সাধারণ বস্ত্রদুটিকে কাঠের বাক্সে গুছিয়ে রাখলেন, যেন উৎসবের ক্ষণস্থায়ী
সুবাসটুকু অন্তত বন্দি থাকে।
আজ
ষষ্ঠীর প্রভাতে নতুন বস্ত্রের আনন্দে উদ্বেল হয়ে শিশুরা যখন পথ ধরে ধাবিত হলো
মণ্ডপের পানে, খালি হয়ে যাওয়া
নিঃশব্দ গৃহের অলিন্দে এসে দাঁড়ালেন অলোকবাবু। নীল আকাশে তখন মেঘের পেঁজা তুলো
ভেসে চলেছে নিরুদ্দেশের পথে। পাশের অট্টালিকা থেকে ভেসে আসছে অর্থবিত্তের
প্রাচুর্যময় উল্লাস, আলোর ঔজ্জ্বল্য।
অলোকবাবুর
হস্তস্থিত মৃৎপাত্রের চা ততক্ষণে শীতল। তিনি চেয়ে রইলেন সুদূর দিগন্তের ধবল
কাশবনের দিকে। সুমিত্রা এসে নীরবে দাঁড়ালেন পাশে; দুজনের কারোর মুখেই কোনো বাক্য নেই। শারদীয় উৎসব এসেছে সত্য, ধরাতল আলোকোজ্জ্বল, ঢাকের কাঠি ভেঙে দিচ্ছে সব
নীরবতা—তবু অলোকবাবুর নিভৃত হৃদয়ে এক চিরন্তন প্রশ্ন হাহাকার করে ওঠে—এই উৎসবের
আলো কি কেবল ধূলিধূসর জানালার বাইরেই স্থির হয়ে থাকবে, নাকি কোনোদিন এই জীর্ণ ভিটের ভেতরেও পূর্ণতা নিয়ে প্রবেশ
করবে?
আশ্বিনের
চঞ্চল বাতাস কাশফুলগুলোকে দোলা দিয়ে যায়, কিন্তু অলোকবাবুর সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নদীর শান্ত জলও রেখে যায় না।
~~000~~
No comments:
Post a Comment