বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/১৫ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
আয়লারে সরলা
[৩য় পর্ব]
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
আয়লারে সরলা
[৩য় পর্ব]
"এখানে শুরুতেই তার তিনগুণ পাবে। যত দিন যাবে রোজগার এত বাড়বে যে তোমার বুড়ো শ্বশুরের আবার যৌবন ফিরে যাবে। তোমার মতো মেয়েই তো বাবুরা খোঁজে।"
-সেটা আবার কী রে?
শ্রীহরির বিচক্ষণতার প্রশংসা করতে হয়। লোকে যতই তাকে আড়ালে লম্পট বলুক, সমাজের মহামূল্যবান সুন্দরী রমণীরা তো বিচক্ষণ পুরুষের দিকেই আকৃষ্ট হবে। কত্তা তখনই ছিরুর আগেকার সব চরিত্রদোষ মাফ করে দিলেন। পরেরদিন ভোর হতেই ক্ষীণ আলোর রেখার আভাস দেখা গেল। হঠাৎ ছেলেদুটো জোরে জোরে লাল চাদর দোলাতে শুরু করে।
-বাবা, জলের মধ্যে চ্যাপটা গোলমতো কী একটি এগিয়ে আসছে।
-তাহলে র্যাফ্ট নিশ্চয়ই।
ছেলেদুটো র্যাফ্টে লোক দেখতে না পেলেও জওয়ানরা তাদের শক্তিশালী বাইনাকুলার দিয়ে তাদের দেখতে পেয়েছে। বানের প্রবল উড়নচণ্ডী স্রোত কাটিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগিয়ে আসছে। সবার মুখে আসছে আসছে রব উঠতেই, এই প্রথম কান্না থামিয়ে বাবুসোনা হাততালি দিয়ে ওঠে,
সরলা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে, জওয়ানদের চাবুকের মতো চেহারা, অন্যের ভালর জন্য প্রাণ বলি দিতে পর্যন্ত প্রস্তুত মানুষের কী অপরূপ দেহসৌষ্ঠব। পাথরকোঁদা চেহারায় প্রকৃতি দিয়েছেন শিশুর মতো নির্মল চোখের হাসি। তাদের অসীম দক্ষতায় ঘন্টাখানেকেই তারা পৌঁছে গেল সরকারি আশ্রয়শিবিরে। আরো সাতদিন আশ্রয়শিবিরে কোনোরকমে কাটিয়ে সরলারা যখন বাড়ি ফিরল, কাছাকাছি আসতেই চক্ষু চড়কগাছ। এটা তাদের সেই বাড়িটা! মনে হচ্ছে এক বিশালকায় অ্যানাকোন্ডা দাপাদাপি করেছে জলের মধ্যে। সাজানো-গোছানো বাড়িটা ভাঙচুর করেছে ক্রুদ্ধ আক্রোশে। তখনো বাগানে একহাঁটু জল। শ্বশুর-স্বামীর সব কষ্টের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল। বাড়িটা নতুন করে বসবাসের উপযুক্ত করতে। দামি অ্যাসবেসটসের বদলে দোতলায় হল সস্তা টিনের চাল। সবচেয়ে ক্ষতি হল চাষের জমিগুলোর। নোনা জল আর বালির ভয়ানক ছোবলে প্রায় দুবছর সামান্য বিশেষ সবজি ছাড়া কিছুই চাষ হল না। তার পর যা ধান হল, নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে গেল। শ্বশুরমশাই সম্ভ্রান্ত চাষি থেকে লেবার খাটা শুরু করলেন। এই বয়সে অত পরিশ্রম সহ্য হয়, অকালবার্ধক্যে ধরল তাকে, সঙ্গে মারাত্মক ক্ষয়রোগ। সরলার বরের অপারেটর ছিল শ্বশুর। অপারেটর বসে গেল তো বর হয়ে গেল দিশেহারা। শাশুড়ি এই চাপ সহ্য করতে পারলেন না। অভাবের কালকেউটে তাঁর শরীরে এমন ছোবল দিল যে, পঞ্চাশের আগেই স্বামী ও সখাকে ছেড়ে বিদায় নিলেন। সরলা কাউকে কিছু না জানিয়ে নামখানায় অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ ধরল। হাতখরচের পয়সা ও বাড়ির লোকের খাবার দুই জুটবে।
-তুমি কি ঝি-এর কাজ কর না কি? তোমাকে দেখে তো সেরকম ঘরের মেয়ে-বৌ বলে মনে হয় না।
-না, না, ঝি নয় আমি রান্নার লোকের কাজ করি।
-ওই হল ঝাড়ুদার নও জমাদার।
-কিন্তু তোমার এ মরণ কেন? ঘরে অভাব না মনে অভাব? তোমার বাড়ি কোথায়?
-তুমি কার মাসি গো?
-আমি কি পারব? আর কেমন পয়সা দেবে? তোমার মতন তো আমি এক্সপার্ট নয়। আর কলকাতা যাতায়াত করতে তো অনেক সময় লাগবে।
-কেন আমি করছি যে, আর তুমি তো আমার আধঘণ্টা আগেই নিশ্চিন্তপুরে নেমে যাবে। লোকের বাড়ি রান্না করে যা রোজগার কর, এখানে শুরুতেই তার তিনগুণ পাবে। যত দিন যাবে রোজগার এত বাড়বে যে তোমার বুড়ো শ্বশুরের আবার যৌবন ফিরে যাবে। তোমার মতো মেয়েই তো বাবুরা খোঁজে।
নমিতার কথায় আলগা অশ্লীল ইঙ্গিত ভাসে। তবে সরলা ঠিক ধরতে পারে না। সে সত্যিই সরলা। টাকার প্রয়োজনে আর বাবুসোনাকে মানুষ করার চিন্তা করে সরলা কলকাতায় কাজ নেওয়াই ঠিক করল। কয়েকদিন ধরে ব্যবস্থাপত্র সব করার পর অক্ষয়তৃতীয়ার শুভদিনে সরলা কাজে জয়েন করবে। নমিতার সাথে কথা হয়েছিল, নিশ্চিন্তপুরে পেছনের লেডিস বগিতে উঠবে ফার্স্ট লোকালে। বাড়িতে স্বামীকে বলে রেখেছিল, এখন থেকে সেই বাবুসোনাকে সারাদিন দেখবে। সরলা সব ব্যবস্থা করে ডিউটি যাবে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment