প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

আয়লারে সরলা [৩য় পর্ব] | মনোজ চ‍্যাটার্জী

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/১৫ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ‍্যাটার্জী
আয়লারে সরলা
[৩য় পর্ব]

"এখানে শুরুতেই তার তিনগুণ পাবে। যত দিন যাবে রোজগার এত বাড়বে যে তোমার বুড়ো শ্বশুরের আবার যৌবন ফিরে যাবে। তোমার মতো মেয়েই তো বাবুরা খোঁজে।"

 
পূর্বানুবৃত্তি মেঘ উড়ে যাওয়া তো দূরের কথা। গোটা আকাশ ঘন কালো মেঘের সমাবেশ। শ্বশুরমশাই একতলা কোনরকমে ঢালাই করেছিল। সন্ধে ছাড়িয়ে যত রাত হয়, তত ঝড়ের বেগ বাড়ছে, শোঁ শোঁ, গোঁ গোঁ আওয়াজে বড়দেরই বুক গুড়গুড় করছে‌। তারপর…
 
শ্রীহরির তেইশ-পঁচিশ বছরের ছেলেদুটো যে এত বলশালী আর করিতকর্মা, এই দুঃসময় না এলে জানাই হত না। ঘন্টা দুইয়ের মধ্যেই দুটো বড় বড় তক্তা নারকেল গাছগুলোর মাথার কাছে মোটা শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে একটা ঝুলন্ত মঞ্চ তৈরি করে ফেলল। শুধু তাই নয়, শক্ত কাঠটাঠ দিয়ে উপরে ত্রিপল বেঁধে দিয়েছে, অবিরাম বৃষ্টির থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। তার ছেলে মানে সরলার বরকে তেমন কিছু করতেই হয়নি। যাইহোক বড় মই দিয়ে অতি সাবধানে মেয়েদের সেই তক্তার উপরে তোলা হল। জল বাড়ছে তো বাড়ছেই, দোতলা প্রায় ডুবে এসেছে। শুকনো খাবারের বস্তা, কিছু বাসনকোসন ও একটা স্টোভ তোলা হয়েছিল। শ্রীহরির ছেলেদুটো এর মধ্যেই স্টোভে চা আর কিছু তেলেভাজা করে ফেলেছে। চা-এর তৃপ্তিতেই বোধহয় শ্রীহরি বলে উঠল,
-কত্তা, এইভাবে পড়ে থাকলে হবে না, রাত তিনটে থেকে বাসনকোসন বেলনা দিয়ে পেটাতে হবে। ডিজাস্টার ম‍্যানেজমেন্টের জওয়ানরা ঠিক ওদের র‍্যাফ্ট নিয়ে ঘুরবে।
-সেটা আবার কী রে?
-শক্ত রাবারের ভেলা গো, আমাকে ওই উকিলবাবু শিখিয়েছে। তা যেটা বলছিলাম, বাসনের আওয়াজ শুনতে পেলে ওরা ঠিক উদ্ধার করবে। একটা লাল চাদর ও সরু বাঁশের ডগায় বেঁধে দুলাতে হবে। ভাগ্য খুব খারাপ না হলে ওরা ঠিক দেখো আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।
শ্রীহরির বিচক্ষণতার প্রশংসা করতে হয়। লোকে যতই তাকে আড়ালে লম্পট বলুক, সমাজের মহামূল্যবান সুন্দরী রমণীরা তো বিচক্ষণ পুরুষের দিকেই আকৃষ্ট হবে। কত্তা তখনই ছিরুর আগেকার সব চরিত্রদোষ মাফ করে দিলেন। পরেরদিন ভোর হতেই ক্ষীণ আলোর রেখার আভাস দেখা গেল। হঠাৎ ছেলেদুটো জোরে জোরে লাল চাদর দোলাতে শুরু করে।
-বাবা, জলের মধ্যে চ‍্যাপটা গোলমতো কী একটি এগিয়ে আসছে।
-তাহলে র‍্যাফ্ট নিশ্চয়ই।
ছেলেদুটো র‍্যাফ্টে লোক দেখতে না পেলেও জওয়ানরা তাদের শক্তিশালী বাইনাকুলার দিয়ে তাদের দেখতে পেয়েছে। বানের প্রবল উড়নচণ্ডী স্রোত কাটিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগিয়ে আসছে। সবার মুখে আসছে আসছে রব উঠতেই, এই প্রথম কান্না থামিয়ে বাবুসোনা হাততালি দিয়ে ওঠে,
-কী মজা, কী মজা, আমি র‍্যাফ্টে চাপব আর বানের জলকে থাই থাই করে চড় মারব।
সরলা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে, জওয়ানদের চাবুকের মতো চেহারা, অন্যের ভালর জন্য প্রাণ বলি দিতে পর্যন্ত প্রস্তুত মানুষের কী অপরূপ দেহসৌষ্ঠব। পাথরকোঁদা চেহারায় প্রকৃতি দিয়েছেন শিশুর মতো নির্মল চোখের হাসি। তাদের অসীম দক্ষতায় ঘন্টাখানেকেই তারা পৌঁছে গেল সরকারি আশ্রয়শিবিরে। আরো সাতদিন আশ্রয়শিবিরে কোনোরকমে কাটিয়ে সরলারা যখন বাড়ি ফিরল, কাছাকাছি আসতেই চক্ষু চড়কগাছ। এটা তাদের সেই বাড়িটা! মনে হচ্ছে এক বিশালকায় অ্যানাকোন্ডা দাপাদাপি করেছে জলের মধ্যে। সাজানো-গোছানো বাড়িটা ভাঙচুর করেছে ক্রুদ্ধ আক্রোশে। তখনো বাগানে একহাঁটু জল। শ্বশুর-স্বামীর সব কষ্টের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল। বাড়িটা নতুন করে বসবাসের উপযুক্ত করতে। দামি অ্যাসবেসটসের বদলে দোতলায় হল সস্তা টিনের চাল। সবচেয়ে ক্ষতি হল চাষের জমিগুলোর। নোনা জল আর বালির ভয়ানক ছোবলে প্রায় দুবছর সামান্য বিশেষ সবজি ছাড়া কিছুই চাষ হল না। তার পর যা ধান হল, নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে গেল। শ্বশুরমশাই সম্ভ্রান্ত চাষি থেকে লেবার খাটা শুরু করলেন। এই বয়সে অত পরিশ্রম সহ‍্য হয়, অকালবার্ধক্যে ধরল তাকে, সঙ্গে মারাত্মক ক্ষয়রোগ। সরলার বরের অপারেটর ছিল শ্বশুর। অপারেটর বসে গেল তো বর হয়ে গেল দিশেহারা। শাশুড়ি এই চাপ সহ‍্য করতে পারলেন না। অভাবের কালকেউটে তাঁর শরীরে এমন ছোবল দিল যে, পঞ্চাশের আগেই স্বামী ও সখাকে ছেড়ে বিদায় নিলেন। সরলা কাউকে কিছু না জানিয়ে নামখানায় অন‍্যের বাড়িতে রান্নার কাজ ধরল। হাতখরচের পয়সা ও বাড়ির লোকের খাবার দুই জুটবে।
 
ফেরার পথে রোজ একটা বৌ-এর সাথে দেখা হয়। খুব ঠাটবাট। কলকাতা থেকে কী কাজ করে বাড়ি ফেরে। কয়েকদিন দেখার পর নিজে থেকেই তার সাথে কথা বলল।
-তুমি কি ঝি-এর কাজ কর না কি? তোমাকে দেখে তো সেরকম ঘরের মেয়ে-বৌ বলে মনে হয় না।
-না, না, ঝি নয় আমি রান্নার লোকের কাজ করি।
-ওই হল ঝাড়ুদার নও জমাদার।
-কিন্তু তোমার এ মরণ কেন? ঘরে অভাব না মনে অভাব? তোমার বাড়ি কোথায়?
সরলা আয়লার পর থেকে সব কথা তাকে খুলে বলে। কথায় কথায় জানা গেল সে হল নমিতা মাসি। কলকাতায় বাইপাসের ধারে হসপিটালে কাজ করে।
-তুমি কার মাসি গো?
নমিতা হেসে ফেলে,
-সবাই আমাকে নমিতা মাসি বলে গো। সাতের বছরের ছোঁড়া থেকে সত্তর বছরের বুড়ো। সে যাইহোক, তোমাকে আমি হসপিটালে কাজে ঢুকিয়ে দিতে পারব। বাবুরা কর্মঠ চালাকচতুর মেয়ে খোঁজে। লোক এনে দিলে আমার মাইনে বাড়িয়ে দেবে। অনেককে নিয়ে গেছি, বাবুদের পছন্দ হয়নি। তবে তোমাকে না করবে না, সেটা তোমাকে প্রথম দেখাতেই বুঝেছি।
-আমি কি পারব? আর কেমন পয়সা দেবে? তোমার মতন তো আমি এক্সপার্ট নয়। আর কলকাতা যাতায়াত করতে তো অনেক সময় লাগবে।
-কেন আমি করছি যে, আর তুমি তো আমার আধঘণ্টা আগেই নিশ্চিন্তপুরে নেমে যাবে। লোকের বাড়ি রান্না করে যা রোজগার কর, এখানে শুরুতেই তার তিনগুণ পাবে। যত দিন যাবে রোজগার এত বাড়বে যে তোমার বুড়ো শ্বশুরের আবার যৌবন ফিরে যাবে। তোমার মতো মেয়েই তো বাবুরা খোঁজে।
নমিতার কথায় আলগা অশ্লীল ইঙ্গিত ভাসে। তবে সরলা ঠিক ধরতে পারে না। সে সত্যিই সরলা। টাকার প্রয়োজনে আর বাবুসোনাকে মানুষ করার চিন্তা করে সরলা কলকাতায় কাজ নেওয়াই ঠিক করল। কয়েকদিন ধরে ব‍্যবস্থাপত্র সব করার পর অক্ষয়তৃতীয়ার শুভদিনে সরলা কাজে জয়েন করবে। নমিতার সাথে কথা হয়েছিল, নিশ্চিন্তপুরে পেছনের লেডিস বগিতে উঠবে ফার্স্ট লোকালে। বাড়িতে স্বামীকে বলে রেখেছিল, এখন থেকে সেই বাবুসোনাকে সারাদিন দেখবে। সরলা সব ব‍্যবস্থা করে ডিউটি যাবে।
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)