বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৮তম সংখ্যা/২২শে আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
আয়লারে সরলা
[৪র্থ পর্ব]
"তারপর যা হল, সে কাউকে বলা যায় না। শুধু বেরোনোর সময় বাবু চারটে কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট তার হাতে ধরিয়ে দিল।"
পূর্বানুবৃত্তি দুটো বড় বড় তক্তা নারকেল গাছগুলোর মাথার কাছে
মোটা শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে একটা ঝুলন্ত মঞ্চ তৈরি করে ফেলল। শুধু তাই নয়, শক্ত কাঠটাঠ দিয়ে উপরে ত্রিপল
বেঁধে দিয়েছে, অবিরাম বৃষ্টির থেকে
রক্ষা পাওয়ার জন্য। জল বাড়ছে তো বাড়ছেই, দোতলা প্রায় ডুবে এসেছে। তারপর…
ভোর
থেকেই কোথায় ঢাকের বাদ্যি বাজছে। শুভ অক্ষয়তৃতীয়া। কার যে শুভ, কটা লোকের যে শুভ, মানুষগুলো সে চিন্তা কোনদিন
না করেই পুরনো দিন থেকেই তান কুরাকুর বাদ্যি বাজিয়ে যায়। মস্তিষ্কের শুভ
চিন্তাশক্তি হারিয়ে যায় বাদ্যির তীব্র আওয়াজে। ঘুমন্ত বাবুসোনার কপালে আলতো চুমু
দিয়ে সরলা রওনা হয় অজানা ভবিষ্যতের দিকে।
-ও নমিতা মাসি, এ আবার কোন পটের বিবি উঠছে গো
ফার্স্ট লোকালে?
-চোপ চোপ ও আমার লোক, আমার চেনা মেয়ে, আমি কাজ দেখে দিয়েছি, আজকে জয়েন করতে যাচ্ছে। তা
সরলা তুমি মান্থলি করেছ তো,
যদিও এ
লাইনে চেকিং হয় না, তবে একবারে শিয়ালদায়
নামলে লাগবে। শিয়ালদার মান্থলি করেছ তো?
সরলা
ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। নতুন পরিবেশে তার কেমন কেমন লাগছিল। নেহাত নমিতাদি আছে তাই।
নইলে তো ভাবত এ কোন অকূলপাথারে পড়লাম!
-তা একে কী বলে ডাকব মাসি? সরলামাসি না সরলারানী?
-তোদের যা মন চায় ডাক। তবে
ট্রেন থেকে নেমে দুদিন অটো ধরলেই ও মাসি হয়ে যাবে।
খিলখিল
করে গোটা বগি হেসে ওঠে। দু-চারটে কচি মাসি আবার সরলার গাল টিপে দিয়ে যায়। সরলা লজ্জায়
আর সংকোচে লাল হয়ে যায়। প্রথম দিন সবে ট্রেন থেকে নেমে অটোতে বসেছে, একটা উনিশ-কুড়ির ছেলে বলে উঠল,
-ও মাসি, একটু চেপে বসো না, আমাকেও তো যেতে হবে।
সরলা
ট্রেনে নমিতাদির ভবিষ্যৎবাণীর হুবহু মিলে যাওয়া দেখে ফিক করে হেসে ফেলে।
-ন্যাকার মতো না হেসে, একটু চেপে বসো, রোজ যে কোথা থেকে নতুন নতুন
লোক আসে!
সরলা
আর কিছু না বলে একটু সরে যায়। প্রায় ছমাস ভালই চলছিল। বিকেল পাঁচটার ট্রেনটা পেয়ে যাচ্ছিল।
আটটার আগেই বাড়ি। বাবুসোনাও শোওয়ার আগে তাকে অনেকক্ষণ পেত বলে খুশি ছিল। নমিতাদি
একদিন হঠাৎ জিগ্যেস করল,
-কীরে কাজ কেমন চলছে? ফেরার সময় তো আর দেখিই না।
কটার ট্রেনে ফিরছিস? মাইনে দিচ্ছে তো?
-ভালই তো। চারটে বা পাঁচটার
ট্রেনে ফিরি, ছেলেটাকে একটু যত্ন
করতে পারি। তবে মাইনে আর বাড়ায়নি।
-বাহ্ বাহ্ খুব ভাল। আমাকে তো কই মিষ্টি
খাওয়ালি না?
-মিষ্টি না তোমাকে একদিন
বাড়িতে ডেকে খাওয়াব। ওইমাসে বাবুসোনার জন্মদিন। তোমাকে নেমন্তন্ন করব। না করতে
পারবে না।
-বেশ বেশ নিশ্চয়ই যাব। তবে
খাসির মাংস খাওয়াতে হবে। আর পেটভরে মিষ্টি দই। আমি ভাবছি মেয়েটার কী হল? আর শোন না, রোজগার বাড়াতে চাইলে প্রথমদিন
ট্রেনে যে মেয়েগুলো তোর গাল টিপে দিয়েছিল, ওদের সাথে আড়ালে কথা বলিস। ওরা তোকে শিখিয়ে দেবে, কীভাবে রোজগার বাড়াতে হয়। ওই
মাইনে আর কী।
সরলা
অবাক হয়ে যায় নমিতাদির কথা শুনে। ওই মেয়েগুলো জানে আর সে জানে না। তাকে বোধহয় কিছু
লুকিয়ে যাচ্ছে। তবু দিনের দিন যা খরচ বাড়ছে, ওই মেয়েগুলোর সাথেই কথা বলতে হবে।
-শোন সরলাদি, রোজগার বাড়াতে হলে ওই চারটে-পাঁচটার ট্রেন ধরলে
হবে না, মিনিমাম আটটার ট্রেন
ধরতে হবে। কোনরকমে মেরেকেটে তুমি ওটা সাতটা করতে পারবে। দেখো পারবে কি না? তবেই বলব।
-কেন? ওভারটাইম করতে হবে?
-ও তো তুমি হসপিটালের কাজ করো।
রোজগার বাড়াতে হলে ছুটির পর অফিসারবাবুদের অফিসে গিয়ে তাদের অফিসের কাজ করে যদি মন
জয় করতে পারো, তখন মাইনে বাড়বে, ওভারটাইম করে আর কটাকা বেশি
পাবে।
সরলার
সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। বাবুদের কাছে যাওয়া, মন জয় করা এসব কথার মানে কী? তবু বাবুসোনার ভবিষ্যতের কথা ভেবে মেয়েগুলোর কথায় রাজি হয়ে
যায়। যথারীতি হসপিটালের পর সেদিন এক বাবুর অফিসে গেছিল। অফিসের কাজ করতে করতে ছটা
পেরিয়ে গেল। অফিস প্রায় খালি। তবু
বাবু তাকে ছাড়ে না। তারপর যা হল,
সে
কাউকে বলা যায় না। শুধু বেরোনোর সময় বাবু চারটে কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট তার হাতে
ধরিয়ে দিল। তখন ছটা চল্লিশ বেজে গেছে। সরলা মাসির আর ভাবার সময় নেই। ধড়ফড় করে অফিস
থেকে বেরিয়ে বাইপাসের বাস ধরল। আর তারপর থেকে সাতটার ট্রেন ধরার জন্য ছুটছে তো
ছুটছেই, সে এখন মাসি হয়ে গেছে, পাগলের মতো ছুটতে তার আর কোন
লজ্জা নেই।
~~000~~
No comments:
Post a Comment