প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

আত্মার আত্মীয় [২য় পর্ব] | শিবরাম দে

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/০৮ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
শিবরাম দে
আত্মার আত্মীয়
[২য় পর্ব]

"কচুখালী এসে নয়নতারা তার বাপের কাছে শেখা লবণ তৈরি করতে শুরু করল। সে তৈরি করে, অঘোরনাথ ঝুড়ি ভরে হাটে নিয়ে বিক্রি করে।"

 
পূর্বানুবৃত্তি নয়নতারার যত ভাবনা তার নিজির মানুষটার জন্যি। বড়ই সাদাসিধে মানুষটা। সুন্দরবনের এই নিচু এলাকায় নোনা জলের মধ্যেই বছরের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয় এদের। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। আর ঝোপে ঝাড়ে মা মনসার চেলাদের অবাধ বিচরণ। তারপর…
 
লতিফ এবং তার বউ রুক্সি বেগম ধরাধরি করে ঘরের ভেতর চাটাইয়ের ওপর শুইয়ে দিল।
রুক্সি লতিফের কানের কাছে মুখ নিয়ে মিহি সুরে, 'মনে হয় সারাদিন দিদির প্যাটে দানাপানি কিছু পড়ে নাই। তাড়াতাড়ি বাড়িগে দুটো গরম ভাত ফুটোইয়ে নে আসি চল। প্যাটে গরম ভাত পড়লি দুজনেই সুস্থ হবেনে।'
'এর মধ্যি দুজন পালি কোতায়?’ লতিফের সাদা চোখে যা দেখা যাচ্ছে, সে সেকথাই বলল,
'আরে, দিদি পোয়াতি না? প্যাটে আরেক জন বাড়তিছে না! বোকা কনকারের! তাড়াতাড়ি চল।'
লতিফ হেসে 'হ্যাঁ পা চালাইয়ে চল।' তারপরেই কী একটা ভেবে বলল, কিন্তু বড়দিরি এই অবস্থায় একা ফেলি রাইখে গেলি তো হবে না। এক কাজ করি, বাড়িগে দু'টো গরম ভাত আমি ফুটোইয়ে আনিগে, সঙ্গে পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা। তুই একেনে থাক। দিদিরি পাহারা দে।'
'তুমি পারবানে?'
'এই বড়দি, আমারে আর লক্ষণরে নিজি হাতে লবণ তৈরি করা শিখইল। ভাইয়ের মতো ভালবাসত। কতদিন দিদির হাতের গরম ভাত দু'জনে মিলে খাইছি। আইজ সেই দিদির প্যাটে ভাত নাই। আমার যে পারতি হবেইরে রুক্সি। আল্লার যে কী ইচ্ছা তা আল্লাই জানে!' - কথাগুলি বলে লতিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, তারপর রাতের আঁধারে নিজের বাড়ির দিকে ছুটল।
অঘোরনাথের আত্মীয়স্বজন এ গ্রামে কেউ নেই। বিপদে-আপদে পাশে থাকার মতো ওই লতিফ মিঞা আর তার বউ রুক্সি। এক্ষেত্রেও সেই রুক্সি ঘরের ভেতরে মাটির ঘড়া থেকে জল এনে নয়নতারার চোখে মুখে ছিটিয়ে দিল। ফলে দুর্বল ফ্যাকাশে চোখ দুটো ধীরে ধীরে খোলবার চেষ্টা করল নয়নতারা।
'লতিফ ভাই কই রুক্সি?'
তোমার ভাই দু'টো গরম ভাত ফুটোয়ে আনতি বাড়ি গেছে। সারাডা দিন প্যাটে দু'টো ভাত না পড়লি, এই পোয়াতি অবস্থায় শরীর খারাপ তো হবেই দিদি!'
'তোমার লতিফ ভাই বড়বাবুরি কইয়ে আসিছে, ছার একটা দিন আমাদের সময় দেন। কাইল সকালে আমরা আসবানে। কাইল ভোর ভোর তোমায় নিয়ে আমরা থানায় যাব। তুমি বেশি ভাবনা কইরে না তো। আমরা সবাই আছি না?'
সে রাতে লতিফ মিঞা এবং রুক্সি বেগমের ভালবাসার পরশ পেয়ে নিজেকে অনেকটা সামলে নিতে পেরেছিল নয়নতারা। কিন্তু যত রাজ্যের ভাবনা তার মনে এসে ভিড় করতে লাগল।
কচুখালী এসে নয়নতারা তার বাপের কাছে শেখা লবণ তৈরি করতে শুরু করল। সে তৈরি করে, অঘোরনাথ ঝুড়ি ভরে হাটে নিয়ে বিক্রি করে। নয়নতারার বুদ্ধি এবং পরিশ্রমে সংসারের হাল কিছুটা ফিরেছিল। অন্তত না খেয়ে থাকতে হতো না।
কচুখালীর মানুষের কাছে এই লবণ তৈরির খবর পৌচ্ছতে বেশি সময় লাগল না। দু'চারজন উঁকিঝুঁকি মারা শুরু করল। এদের মধ্যে বাগদি পাড়ার লক্ষণ আর নিকিরি পাড়ার এই লতিফও ছিল। দু'জনে তখন এক মাচার বন্ধু।   অল্প বয়স, খালপাড়ে বাঁশের বাখারি দিয়ে মাচান বানিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়ে দিত। এই ছেলে দুটোই নয়নতারার দুর্বলতার কারণ হল। ওদের কোন ভাই না থাকায়। ভাইয়ের স্নেহ, ওই ছেলে দু'টোর ওপর ঝরে পড়ল। নয়নতারাকে বড়দি বলে ডাকা শুরু করে দিল তারা। ফলে নয়নতারার মন সহজেই নরম হয়ে পড়ল। সেই লবণ তৈরির কৌশল নিজের হাতে তার ধর্ম ভাইদের পরম যত্নে শেখাতে লাগল। লক্ষণ বাগদি আর লতিফ দুজনেই সারাদিন তাদের বড়দির কাজে সাহায্য করত। নয়নতারা হাত পুড়িয়ে তার দুই ভাইকে গরম ভাত রান্না করে খাওয়াত। অঘোরনাথ সাদা মনের মানুষ, সে নয়নতারার ওপর কোনও কথা বলত না। তাকেও এরা জামাইবাবু বলে ডাকে। খারাপ লাগে না অঘোরনাথের। কিন্তু তখন কি বুঝেছিল নয়নতারা যে, এই লক্ষণ বাগদি পুলিশের টিকটিকি হয়ে তারই মুখের ভাত কেড়ে নেবে!
লতিফ আর তার বউ রুক্সি অনেক আগেই বাড়ি চলে গেছে। নয়নতারার প্যাটে গরম ভাত পড়ায় শরীরটা আগের থেকে অনেক ভাল লাগছে। আবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আকাশের সেই ঝলকানি ঘরের ফাঁকফোকর দিয়ে মাঝেমধ্যে ঘরের আঁধার ভেদ করে ঝলসে উঠছে। বিছানায় উঠে বসে নয়নতারা। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
নয়নতারার মনে হয় একবার লক্ষণ বাগদির সামনে গিয়ে দাঁড়াইয়ে জানতি চালি কেমন হয়, সে যে লবণ বানায়, এ লবণ বেআইনি সে জানল কী করে? এ লবণ তার এই হাড়মাস কালি করা ফসল, চুরির ফসল নয়!
নোনা মাটির চর থেকে মাটি চেঁচে এনে সে মাটি, পরিষ্কার জলে গুলতি হয়। তারপর সেই জল হাঁড়ির ঝরা কইরে দু'দিন ধরে জাল দিতে হয়। শুধু জাল দিলিই হয় না, সেই জল আবার রোদ্দুরি শুকইয়ে ছাইয়ের গাদায় গুঁজে দিয়ে এক রাত্তির রাখার পর সাদা লবণ তৈরি হয়। খাজনা দিতি হোলি খাবডা কী?
নয়নতারা ভেবে ভেবে কুল পায় না। লতিফ লক্ষণ এরা দু'জনেই তো তার কাছে থাইকে-খাইয়ে লবণ তৈরি শিখল। লতিফ মিঞা তার দিদিরে মনে রাইখলো আর লক্ষণ সবকিছু ভুলে নেমকহারামি করল! থানার বড়বাবুরি খবরডা দেওয়ার আগে, একবারও তার এই বড় দিদির কথা মনে পড়ল না! একটা দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়ল নয়নতারার বুক থেকে।
সে কি থানায় গিয়ে বড়বাবুরি তার পরিশ্রমের কথা বুঝোইয়ে বলতি পারবেনে? তার প্যাটে বেড়ে ওঠা সন্তানের কথা ভাইবে তার স্বামীরে ছাড়বেনে? কতরকম ভাবনা যে তার মনে উদয় হল তার ঠিক নেই। বাইরে সোঁ সোঁ শব্দে বৃষ্টি শুরু হল।
নয়নতারার মনে এত সংশয়, দোলাচালের মধ্যে বারবার লতিফ আর তার বউ রুক্সি বেগমের মুখটা ভেসে উঠতে লাগল মনের আকরে।
আগের জন্মে ওরা নিশ্চয়ই ওর আপন কেউ ছিল। আগের জন্মে কেন, এই জন্মেও ওরা আমার আত্মার আত্মীয়! তা না হলি এই ঝড় বাদলা মাথায়নে গরম ভাত আই্নে তার আর তার প্যাটের ভিতর বেড়ে ওঠা সন্তানের জেবন বাঁচায়! এ কথা ভাবতে নয়নতারার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
এদিকে পুব আকাশে আলোর রেখা উঁকি মারছে। লতিফ, রুক্সি আরো জনা কয়েক নিকিরি পাড়ার মানুষজন এসে নয়নতারার দরজার সামনে হাঁক দেয়,
-বড়দি, উঠিছো? এবার থানায় যাতি হবে যে। জামাইবাবুরি ছাড়াইয়ে আনতি হবে তো!'
 

শেষ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)