বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
শিবরাম দে
আত্মার আত্মীয়
[১ম পর্ব]
থানার বড়বাবু হাটে আইছিল, খাজনা ছাড়া বেআইনি লবনের তদন্ত করতি। আগেই খবর পাইয়ে আমরা সব মাল সরাইয়ে দিয়েলাম। কিন্তু ওই বাগদি পাড়ার লক্ষণ বাগদি, দারোগা বাবুরে খবর দে আমাদের মাল সব ধরাইয়ে দেলে।
আজ যে
গল্পটা বলব, না গল্প নয়, গল্প হলে লেখক তাতে অনেক
ঘষেমেজে অলংকার পরিয়ে আজকালকার বিয়ের কনে বানিয়ে ফেলতে পারেন। তাই গল্প না বলে
ঘটনা বলাই ভাল।
অনেক
বছর আগের কথা। তখন নয়নতারার কতই বা বয়স হবে উনিশ কি কুড়ি। আজ তিন কুড়ি বছর পার
করে শরীরটা জীর্ণ হয়েছে রোগ ব্যাধিতে ঠিকই কিন্তু মাথার যন্ত্রপাতি সব ঠিকঠাক
থাকায়, স্মৃতি এখনো বেশ
টনটনে। সেদিনের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার। দুপুর
না গড়াতেই বৃষ্টি নেমেলো। ভাদরের বৃষ্টি - সেইসঙ্গে ঝড়। সকালের দিকি বেশ ভালই ছিল।
হঠাৎ করি এই অনামুখো ঝড়-বৃষ্টি শুরু হবে কে জানত! জানতি পারলি কি সোয়ামিডারে সে
হাটে পাঠায়।
নয়নতারার
যত ভাবনা তার নিজির মানুষটার জন্যি। বড়ই সাদাসিধে মানুষটা। মনের মধ্যি কোথাও
প্যাঁচঘোচ নেই। সেই সকালে খাল থেকে ধরা পার্শে মাছ ভাজা দিয়ে গরম ফেনা ভাত খাইয়ে
হাটে লবণ বেচতি গেছে। বেচা-কেনা করে বাজার-ঘাট করে ঘরে ফেরার কতা। তারপর রান্না
খাওয়া কী যে হবেনে আইজ! পথও তো কম না প্রায় চার ক্রোশ তো হবেই। এই কচুখালী থেকে
হাটে যাবার জন্যি আলাদা কোনও পথও নাই। ধান ক্ষেতের পাশ দিয়ে, বাঁশ ঝাড়ের মধ্যি দিয়ে, তারপর ওই জিয়ল গাছটার গোড়া
দিয়েই তো যাতায়াত করতি হয়। দিনির আলোতেই গাছটার কাছে যাতি গা কেমন ছমছম করে। এই
ঝড় জলে কী করে যে ফেরবেনে কেডা জানে!
সুন্দরবনের
এই নিচু এলাকায় নোনা জলের মধ্যেই বছরের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয় এদের। বিদ্যাধরী
থেকে বেরিয়ে এসে এই খালটা কচুখালী গ্রামটাকে প্রায় কামড় খাওয়া সাজের পিঠের মতো
দুই ভাগে ভাগ করে আবার বেরিয়ে জঙ্গলের দিকে ঢুকেছে। এই খালের পাড়েই নয়নতারার
স্বামী অঘোরনাথ খড়ের ছাউনি দিয়ে মাটির ঘর বানিয়ে থাকে। নয়নতারার বাপের বাড়ি সেই
ছোট রাক্ষসখালী। সেখানে বাবা-মায়ের সঙ্গে দুই বোন থাকত। সে ছিল বড়। সংসারের অবস্থা
ভাল ছিল না। আজ থেকে ষাট-সত্তর বছর আগে এসব জায়গায় বাঘে-মানুষে একঘাটে জল খেত।
জঙ্গলের মধু আর জলের মাছ, এই ছিল জীবিকার
প্রধান ভরসা। কত বিপদের মধ্যে তাদের জীবন-যাপন তা বর্ণনা সম্ভব নয়। এই দুটি বোনের
মনে একটা কষ্ট ছিল। তাদের কোনও ভাই না থাকায়।
বছর
তিনেক আগে অঘোরনাথ একবার ছোট রাক্ষসীখালী তার মামাবাড়ি বেড়াতে এল। নয়ন তারাদের
আর অঘোরনাথের মামাবাড়ি পাশাপাশি। এই আর ওই বাড়ি। মাঝে কলাগাছের বাগান। নয়ন
তারাকে দেখে অঘোরের মনে ধরে যায়। নয়নতারা তখন উনিশ বসন্ত পার করেছে। পুরন্ত
শরীর। নাক চোখমুখের গড়ন একেবারে ফেলনা নয়। যদিও বা গায়ের রং চাপা, তবে ওই অঞ্চলের নোনা হওয়ায়
গায়ের রং সাদা হবে কী করে?
যাই হোক, অমরনাথ তার মনের কথা মামিকে
জানায়। তবে অঘোর এক কাপড়েই নয়নতারাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল।
অঘোরনাথ
প্রথমদিকে লেবুখালির ওখানে খেয়া নৌকা বাইত। টানাটানি সংসার। কখনো-সখনো পেটে কিল মেরেও কাটাতে
হতো। তখন ভরসা পুকুরের জল আর গাছের পাকা কলা। এইভাবে বেশ কিছুদিন গেল। অবশেষে
অঘোরনাথ নয়নতারার সঙ্গে পরামর্শ করে এই কচুখালী খালপাড়ে এসে ঘর বাঁধল। সে সময় চারিদিকে
ফাঁকা জমি পড়ে। এইসব অঞ্চলে মানুষ মেলা ভার। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। আর ঝোপে ঝাড়ে
মা মনসার চেলাদের অবাধ বিচরণ। এই খালটাকে ঘিরে বিভিন্ন জাতের মানুষ এসে জুটেছে।
সকলেই অঘোরনাথের মতো। বাগদিপাড়া,
মন্ডলপাড়া, মাহাতো, আর মুসলিম সম্প্রদায় যে
পাড়ায় সেটা নিকিরি পাড়া। আর এসেছিল দু'ঘর ব্রাহ্মণ পরিবার। তারা সব মিলিয়ে গোটা চল্লিশ ঘর হবে।
বৃষ্টি
একটু আগেই ধরেছে। ঝড়ের বেগ অনেকটাই শান্ত। সূর্যদেব অনেক আগেই মাতলায় ডুব
দিয়েছেন। চারিদিক আঁধার, আকাশে মেঘ থাকার জন্য
একাদশীর চাঁদের দেখা নেই। মানুষের গলা পেয়ে ঘরের দাওয়ায় বসা নয়নতারার কান
খাঁড়া হয়ে গেল। তাদের আলোচনার টুকরো কথা শুনতে পেল সে। কিন্তু এর মধ্যে তার অতি
পরিচিত গলার আওয়াজ কই! সে যে সেই গলার আওয়াজের অপেক্ষায়! "নয়ন!"-
বলে যেমন হাট ফেরতা ডাক দেয়!
অনেকটাই
রাত্তির হইয়ে গেল। তার ফেরার লক্ষণ নেই কেন? কোনও বিপদ-আপদ হয়নিতো লোকটার!
উঠনের
জমা জলে ছপাৎ ছপাৎ মানুষের হাঁটার শব্দ। কান দু'টো খাড়া হয়ে উঠল নয়নতারার। অন্ধকারে কিছুই নজরে পড়ে না
শব্দটা ক্রমশ জোরে হতে হতে তার দাওয়ার কাছে এসে থেমে গেল।
'বড়দি গো - বড়দি...!'
এ যে নয়নতারার
পাতানো ভাই লতিফের গলা! লতিফের গলা শুনে নয়নতারার বুকে কে যেন হাতুড়ির ঘা মারল। এই সময় লতিফ! সে
কেরোসিনের বাতিটা হাতের আড়াল করে বাইরে এলো। বাইরে এখনো হাওয়ার দমক আছে বেশ।
'বড়দি গো, বড় বিপদ ঘটিছে!'
'কী বিপদ!'
'জামাইবাবুরি থানায় ধরি নে
গ্যাছে!'
নয়নতারার
শরীরটা যেন কেঁপে উঠল। সে কোনরকমে জিজ্ঞেস করল,
'তারে থানায় নিতি গেল কেন রে
ভাই?'
থানার
বড়বাবু হাটে আইছিল, খাজনা ছাড়া বেআইনি
লবনের তদন্ত করতি। আগেই খবর পাইয়ে আমরা সব মাল সরাইয়ে দিয়েলাম। কিন্তু ওই বাগদি
পাড়ার লক্ষণ বাগদি, দারোগা বাবুরে খবর দে
আমাদের মাল সব ধরাইয়ে দেলে। আমরা তো পালাইয়ে বাঁচলাম কিন্তু জামাইবাবু বেচারারে
কাঁদার মানুষ পাইয়ে ধইরে নে গেল!'
'লক্ষণ ধরাইয়ে দেলে তোদের
জামাইবাবুরে!' - নয়নতারা যেন
বিশ্বাসই হচ্ছে না।
'দিদি গো, লক্ষণ আর লক্ষণ নেই। সে এখন
পুলিশির টিকটিকি হইয়েছে। গ্রামের গোপন খবরাখবর সেই তো পুলিশির কাছে দেয়।
বড়বাবুর দোষ না। মাল আটক কইরে চলিই যাচ্ছিল। সামনে জামাইবাবুরে দেখতি পাইয়ে।
লক্ষণ বাবুর কানে কানে কী যেন ফিশফিশ ক'রলে। ব্যাস, বড়বাবু সেপাই
জনার্দন মাহাতোরে কী ইশারা করলে। জনার্দন জামাইবাবুরে খপ করে ধইরে নে গেল। আমি আর
রুক্সি ছুইটে গে বড়বাবুর পায়ে পড়লাম। বড়বাবু বললে, 'কাল সকালে থানায় এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যাস।'
লক্ষণ
একাজ করতি পারল! সে মানুষটার ভাত,
এখনো ওর
গলায় আঙুল দিলি পাওয়া যাবে। সেই মানুষ এই বেইমানিডা করতি পারল, লতিফ! - নয়নতারার মাথায় এই মুহূর্তে কোনও কাজ করছে
না। তার শরীর কেমন অবশ হয়ে এল। চোখের সামনে সব অন্ধকার। জ্ঞান হারিয়ে মাটির
দাওয়ায় পড়ে গেল।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment