প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

চৈতি হাওয়া—নববর্ষ

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ , ১৪৩৩ চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | সম্পাদকীয়   চৈতি হাওয়া—নববর্ষ "দুগ্ধপোষ্য...

Saturday, November 11, 2023

মায়ের আঁচলের গন্ধ | মহম্মদ ইব্রাহিম

বাতায়ন/ধারাবাহিক/১ম বর্ষ/২৪তম সংখ্যা/২৪শে কার্তিক, ১৪৩০

ধারাবাহিক গল্প
মহম্মদ ইব্রাহিম

মায়ের আঁচলের গন্ধ

[২য় পর্ব]


পূর্বানুবৃত্তি গরিব মুসলিম চাষির ঘরের ছেলে নাসির মায়ের কোলে থাকতেই ছোট ভাই নাজিরের জন্ম হয়, ফলে মাকে আর সেভাবে কাছে পায় না। মায়ের পায়ে-পায়ে ঘুরঘুর করে, মায়ের আঁচল চিবোয়। বাসির ছেলেকে বেশি পড়াতে চায় না বরং চায় তার সঙ্গে চাষের কাজে হাত লাগাক। মা নুরেসা জেদে, বাসিরের সঙ্গে মতবিরোধে, নাসির মাধ্যমিক পাস করে। তারপর…

পড়াশোনা করলে টাকাকড়ি কীভাবে জোগাড় হবে? তাই, নাসির আর্টস নিয়ে ভর্তি হল। জীবনযুদ্ধে অনেক কিছুই শিখেছে। সায়েন্স পড়লে প্রতিটি বিষয়ে টিউশন লাগবে? অত টাকা কী করে জোগাড় হবে? সুতরাং আর্টসই পড়ার সিদ্ধান্ত নিল। বাসির জমি চাষ করতে করতে ভাবছে ছেলেটা আর কত পড়বে? জমি থেকে ফিরে বাসির ছেলেকে বলল, "অ্যারে, ব্যাটা, তুই তো মেল্যাই পড়্যা লিলি। আর দরকার নাই। তোর দাদো কহিতোক, গরীবঘেরে ঘোড়া রোগ ভাল্লয়।" এরপরই নাসিরের ভেতরে একটা ভীষণ লড়াই শুরু হয়। নাসির ভীষণ চুপচাপ হয়ে যায়। কিন্তু চোখে-মুখে পাথর কঠিন দৃঢ়তা।

দেশ জুড়ে করোনা মহামারী শুরু হয়ে গেছে। লকডাউনে ক্লাস বন্ধ। করোনার ফলে মাস্টারমশাইদের বাড়ি যেতে পারে না। দিশেহারা অবস্থা। কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে? কাঁহাতক বাড়িতে বসে বসে পড়া যায়। একটা একঘেয়েমি পেয়ে বসেছে। মাঝে মাঝে হতাশা চেপে বসছে কবরের মাটির চাপের মতো। বাবার সংসারে অনটন। মা মুরগির মতো খাবারের খুঁদ খোঁজে প্রতিনিয়ত। নাসির ভাবে, যদি বাইরে কাজে চলে যায়, তবে সংসারে একটু স্বস্তি ফিরবে! এখন তো দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিক ঘরের পথে। তাদের ভয়ংকর অবস্থার কথা শুনতে পাচ্ছে। টেনশনে শরীরটা ঘেমে যাচ্ছে। মা’র আঁচলটা দিয়ে মুখটা মুছল। মনে অন্য অনুভূতি হল। না, এসব কী ভাবছে? কখনো জীবনের লড়াই থেকে পালাবে না। একটু ফাঁকা মাঠ থেকে ঘুরে এসে আবার পড়তে বসল।

নাসির কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকেও খুব ভাল রেজাল্ট করল। চারিদিকে সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল। এবার তো কলেজে ভর্তি হবে। খুব ইচ্ছে কলকাতার কোনো কলেজে পড়ার। কমপিটিশন পরীক্ষার অনেক সুবিধা পাবে। রাষ্ট্রবিঞ্জান নিয়েই পড়বে। যে কোন মূল্যে একটা সরকারি চাকুরি জোগাড় করতেই হবে। দুর্ভাগ্য, বাবা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। নাসির অকূল দরিয়ায় যেন ভেসে গেল। আর সে বছরই ভয়ংকর নদী ভাঙনে বাড়িঘর নদীগর্ভে তলিয়ে গেল। তার বইখাতা সব যেন ভাদ্রের বন্যায় ভেসে যেতে থাকল। নাসিরের স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। সব আগে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার। দু'ভাই পরামর্শ করে গ্রামের গরিব মানুষদের সঙ্গে একটা ভেস্ট জমিতে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু একটা কালো ত্রিপলের ঘরে রেখে খানিক স্বস্তি পেল। ওরই মধ্যে মা মুরগির মতো স্নেহ মমতার ডানা দিয়ে ঢেকে নিল।

করোনার প্রকোপ অনেকটা কমেছে। মা বলল, "নাসির, তোকে বাপ যে কৈরা হৈক, পৈড়তে হৈবে। কাইল তুই আগে মাস্টারের কাছে যা। তারপরে অন্যকিছু।" তবে, নাসিরকে যেতে হল না। একদিন ইব্রাহিম স্যার নিজেই ডেকে পাঠালেন। প্রিয় ছাত্রের কলকাতায় পড়ার খবর এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনে খুশি হলেন। হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, সবসময় যোগাযোগ রাখবে। প্যাকেটে কিছু টাকা ছিল। শেষ পর্যন্ত কলকাতার একটা ভাল কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। প্রথম দিন ক্লাসে হেড ডিপ ড. শুভাশিস মিত্রর সঙ্গে আলাপ হল। শুভাশিস স্যার নাসিরের দীনতা দেখে তার সবকিছু জানতে চাইলেন। নিজের আর্থিক দুরবস্থার কথা স্যারকে জানাল। একটা টিউশনের ব্যবস্থাও করে দিলেন। শুভাশিস স্যার তাকে সমস্ত রকমের সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। ওদিকে মা, হাঁস-মুরগি আর গোরুর দুধ বিক্রি করে যথাসাধ্য টাকা পাঠাতে থাকলেন। দুর্দম ইচ্ছা নিয়ে এগোতে থাকল নাসির। সঙ্গে আছে মায়ের এক টুকরো আঁচল। এই আঁচলই যেন তার জীবনের ধ্রুবতারা।

ভাল ভাবে অনার্স সহ বিএ পাশ করল। স্নেহাশিস স্যারের পরামর্শ— এবার, আর কোনোদিকে তাকানো নয়। চাকুরির জন্য লড়াই শুরু করে দিল। কারণ, চাকুরি তাকে পেতেই হবে। একটি চাকুরিও পেয়ে গেল। ডব্লিউবিসিএস অফিসার। মা খুব খশি। মন উজাড় করে দুয়া করছে। মা ভাবছে, "যাক আল্লাহ হাঁর ইচ্ছা পূরণ কৈরাছে। মানুষটা আইজ বাঁইচ্যা থ্যাকলে কত্ত যে খুশি হৈতো।" মূর্খ মা উপলব্ধি করতে পারল যে মানুষ চেষ্টা করলে সব পারে। অসাধ্য বলে পৃথিবীতে কিছু নেই।

এখনই শেষ নয়। নাসিরের মনে পড়ছে বিখ্যাত সেই উক্তি, "…and miles to go before I sleep"। শুরু হল রীতিমতো পড়াশুনো— আইএএস পরীক্ষা। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেল সে ভাল ভাবে পাশ করেছে। তার গাঁয়ের লোকেরা, সমাজের মানুষেরা ভীষণ খুশি। গোটা গ্রামের আকাশে মনে হচ্ছে তারা ফুটেছে। সব বাবারাই স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। গ্রামের মানুষজনের শিক্ষার প্রতি অদ্ভুত আগ্রহ দেখা দিল। মালদা জেলা সদরের জেলা শাসক নিযুক্ত হল নাসির।

মা খুশিতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে, আবেগে কেঁদে ফেললেন। মা আঁচল দিয়ে ছেলের মুখ মুছিয়ে দিল। ছেলেও মায়ের আঁচলে মুখ ঢেকে খুশিতে কেঁদে ফেলল। এবার শুধু মায়ের আঁচল নয়, সশরীরে মাকে নিজের কাছে আনার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বেশ ভাল চলছে। অফিসে বেশ সুনাম। এর আগে মালদা জেলায় এরকম কোনো জেলাশাসক আসেননি। এত কম বয়সি একজন দায়িত্ব সচেতন সরকারি আধিকারিক দেখা যায় না। অফিসের অনেকের মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছে, স্যার রুমালের পরিবর্তে একটা পুরানো কাপড় ব্যবহার করেন, কিন্তু কেন? সবার প্রশ্ন-মুখ স্যারের দৃষ্টি এড়ায় না। একদিন সমস্ত কর্মীদের নিয়ে নিজের চেম্বারে বসার আয়োজন করলেন। অফিস শেষে সবাই স্যারের চেম্বারে উপস্থিত হলেন। সবাইকে চা পরিবেশন করা হল। অফিসের নানা গল্প করতে করতে চা-পান পর্ব শেষ হল। তারপর বললেন, আমি তোমাদের বিশেষ জিজ্ঞাসা নিরসনের জন্য সবাইকে ডেকেছি— বলে, পকেট থেকে মায়ের শাড়ির টুকরোটি বার করলেন। সবার সামনে তুলে ধরে বললেন, "এটা আমার  মায়ের শাড়ির আঁচলের একটা ছিন্ন অংশ। আমার মা। মায়ের এই আঁচলের গন্ধ থেকে আমি মায়ের সান্নিধ্য লাভ করি। আমার সাফল্যের কৃতিত্ব সব তাঁর। মা-ই আমার জীবন দর্শন। তাঁর প্রেরণা ছাড়া আমি এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না।" বলতে বলতে নাসিরের চোখের পাপড়ি ভিজে এলো।

ঘর জুড়ে নিঃসীম নিস্তব্ধতা। নাসির জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দক্ষিণ সমীরণ মায়ের আঁচলের গন্ধ এনে সমস্ত ঘর ভরে দিল।

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)