বাতায়ন/ছোটগল্প/১ম
বর্ষ/২৪তম সংখ্যা/২৪শে কার্তিক, ১৪৩০
ছোটগল্প
সুমন মজুমদার
চন্দ্রগ্রহণ
মা নেই। সারাজীবনের মতো তিতলিকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। যেখানে মা চলে গিয়েছে সেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। ছোট্ট তিতলি জানালা
দিয়ে সন্ধ্যার আকাশটাকে একদৃষ্টে দেখতে থাকে। মেঘলা থাকায় সন্ধেবেলাতেই ঝুপ করে
রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। এক খণ্ড মেঘ ধীরে ধীরে চাঁদটাকে গ্রাস করে
ফেলেছে। ডাঃ
অমলকান্তি আর গৃহবধূ পায়েলের একমাত্র মেয়ে তিতলি। সংসারে এই তিনজন বাদে আর আছেন
তিতলির সবচাইতে প্রিয় ঠাম্মি। নাতনি আর ঠাম্মির দারুণ ভাব। সরকারি ডাক্তার হওয়ায় অমলকান্তিকে বেশির ভাগ সময়েই প্রত্যন্ত গ্রামে দূরদূরান্তে ডিউটি
করতে হয়। তার একটা বড় কারণ, সে ঠোঁটকাটা। সরকারের জনবিরোধী কাজকর্মে প্রতিবাদ
করেন। এর ফলেই শহরে তিনি কখনোই বদলি হতে পারেন না, বাড়ি থেকে তিনশো, চারশো এমনকি
পাঁচশো কিলোমিটার দূরেও সে চাকরি করেছে। সুতরাং সংসার সামলানোর ভার পায়েলকেই একা
নিতে হয়েছে। সপ্তাহান্তে একবার বাড়ি আসেন তিতলির বাবা, দু-চারদিন কাটিয়ে
আবার তাকে ছুটতে হয়। দরিদ্র অভাজনরা যে প্রতীক্ষায় বসে থাকেন। ভিজিট দিয়ে
ডাক্তার দেখানোর ক্ষমতা তাদের যে নেই।
এভাবে আমি তোমার সংসার আর করতে পারব না। কেন? কী হয়েছে? কী পেলাম
আমি; আমি আর পারছি না। আমাকে মুক্তি দাও। ডাক্তার অবাক হয়ে গেলেন তার স্ত্রীর কথা
শুনে । ওহ্। বুঝলাম, তোমাকে না কত দিন বলেছি ফেসবুক করবে না। ওটার নাম আমি
দিয়েছি ডার্টিনেস্ট। পায়েল চিৎকার করে ওঠে। আচ্ছা, আর তোমার সংসার যে বিগ বিগ
জিরো। পায়েল ভুল করছ। অন্তত তিতলির কথা ভেবে না হয়… আর একবার ডিসিশনটা চেঞ্জ
করতে পারো না। দেখো চাকরি ছেড়ে দিলে এ বয়সে আর চাকরি জোগাড় করা, সবকিছু নতুন করে
শুরু করা অসম্ভব। তুমি আর একবার ভেবে দেখো। পারস্পরিক বাদানুবাদ চরমে
উঠলে ছোট্ট তিতলি ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে। মা-বাবার কথার ভাষা তার বোধগম্য হয় না। একরাশ
কান্না দলা পাকিয়ে মুখে আসে। ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও বলছি। দড়াম করে দরজা খুলে মা একছুটে বেড়িয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে
তিতলি। হঠাৎ মনে পড়ে যায় ঠাম্মি সকাল বেলা বলেছিল আজ 'চন্দ্রগ্রহণ'।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment