সন্ধ্যাকালীন আড্ডা
বলিলাম,
- মহাভারত আবার কী দোষ করিল খুড়ো?
চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিলেন,
- কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে অভিমন্যু যখন যুদ্ধে
যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন, তখন অভিমন্যু পত্নী উত্তরা তাহার বক্ষলগ্না হইয়া
বলিলেন,
- প্রিয়তম তুমি যখন রণক্ষেত্রে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকো, আমি তখন
আমার মনের সহিত যুদ্ধরতা থাকিয়া তোমার প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষায় দ্বারপানে
চাহিয়া বসিয়া থাকি।
অভিমন্যু উত্তরার ললাটে সস্নেহে চুম্বন করিয়া বলিলেন,
- প্রিয়ে বীর যোদ্ধার পতিব্রতা অর্ধাঙ্গিনি হইয়া তোমার এরূপ
মনোক্লেশ শোভা পায় না। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধার বীরগতি প্রাপ্তির মধ্য দিয়া স্বর্গারোহণের
মার্গ প্রস্তুত হয়।
উত্তরা অভিমন্যুর মুখ চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন,
- এরূপ অলক্ষণ যুক্ত বাক্য শ্রবণ করিলে আমার হৃদয় বিদীর্ণ
হইয়া যায় প্রিয়। তুমি বীরগতি প্রাপ্ত হইলে আমিও প্রাণ ত্যাগ করিব।
আমরা এতক্ষণ পন্ডিতখুড়োর প্রলাপ উৎসুক নেত্রে উপভোগ করিতে
ছিলাম। শেষে বলিলাম,
- ইহাতে ক্রন্দনের কী হইয়াছে?
পন্ডিতখুড়ো ললাটে করাঘাত করিয়া বলিলেন,
- ক্রন্দনের কারণ তো উহা নহে, এইবার হইবে। আমি গিন্নিকে উত্তরা
মায়ের এরূপ প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করিয়া বলিলাম, তুমি কি আমার মৃত্যু হইলে
উত্তরার মতো প্রাণত্যাগ করিবে? গিন্নি ভ্রূভঙ্গি করিয়া বলিলেন,
- তোমার আগে আমি মরিলে তুমি কী করিবে?
আমি বলিলাম,
- তোমার চিতার পাশে বসিয়া বাকি জীবন অরণ্য রোদন করিব। গিন্নি
বোধ করি অরণ্যে রোদন কথাটির অর্থ জানিতেন। তাই বলিলেন,
- হ্যাঁ, ঠিক বলিয়াছ অরণ্যে রোদন করিবে? তবে আমার চিতার পাশে
নহে।
বলিলাম,
- না না বিশ্বাস করো চিতার পাশেই রোদন করিব। গিন্নি বলিলেন,
- হইলেও হইতে পারে, কারণ চিতার অগ্নি নির্বাপিত হইলেই তোমার
গৃহদ্বারে সানাই বাজিয়া উঠিবে তাই।
বলিলাম,
- তাহা হইলে আমার মৃত্যু হইলে তুমি কী করিবে? গিন্নির অকপট
স্বীকারোক্তি,
- যৌবন থাকিলে পূর্ণ বিবাহ করিব। তাহা ছাড়াও তোমার চাকরি
পাইব। তৎসহ প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্র্যাচুয়িটি এবং ব্যাংকের সঞ্চিত অর্থ সব আমার
হইবে। আহা কী সুখের দিন হইবে গো আমার? দুই হাতে অর্থ ফুটাইয়াও শেষ করিতে পারিব না।
পন্ডিতখুড়ো এইবার ক্রোধান্বিত হইয়া নাক ঠোঁট সব ফুলাইয়া
বলিলেন,
- নারীদের এইসকল বাগাড়ম্বরিতা রাজা রামমোহন রায়ের প্রশ্রয়ে
ঘটিতেছে। তিনি যদি সহমরণ প্রথা বিলুপ্তি না ঘটাইতেন তাহা হইলে আজ গিন্নিদের এই
প্রকার তড়বড়ানি দেখিতে হইত না।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment