বাতায়ন/পরকীয়া/ছোটগল্প/১ম বর্ষ/২৬তম সংখ্যা/২২শে অগ্রহায়ণ,
১৪৩০
পরকীয়া
| ছোটগল্প
দেবশ্রী রায় দে সরকার
ইমন কল্যাণ
ত্রিকোণ পার্কের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে
অনন্যা এখনো। ইমনের চলে যাওয়াটা দেখছে, ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে ইমন। হয়তো এরপর
আর দেখা যাবে না ইমনকে। দৃষ্টিপথের আড়ালে চলে গেলে, এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে
অনন্যার মনে হতে থাকে অনেক কথা। আজ ইমন তাকে বোঝাতে এসেছিল সম্পর্ক অবৈধ হতে পারে
কিন্তু ভালবাসা সব সময় বৈধ।
আর এই কথা বলেই ইমন চলে যায়। ভাড়া বাড়ি তাদের। তার
বাবা সুধাংশুবাবু বিরাটিতে নিজের বাড়ি তৈরি করে ফেলেছেন। চিরকাল দক্ষিণ কলকাতায়
বড় হওয়া ইমন চলে যাবে বিরাটি। আজ থেকে ঠিক আড়াই বছর আগে ইমনরা যে ভাড়াবাড়িতে
থাকত তার সামনে দিয়েই বরের সঙ্গে গাড়ি করে প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিল অনন্যা।
সম্বন্ধ করে বিয়ে তাদের। স্বামী কিংশুককে অল্পই চিনত সে। বিবাহ মানেই বৈচিত্র্যের
মধ্যে ঐক্য। ভারতবর্ষের এই বাণী মনে রেখেই যৌথ পরিবারে মানিয়ে নিয়েছিল অনন্যা।
বিবাহ বন্ধনের সমস্ত নিয়ম মেনে ভালই দিন কাটছিল কিংশুক আর অনন্যার। হঠাৎ একদিন
কিংশুকের বাইক অ্যাক্সিডেন্ট হল। অসহায় অনন্যা যৌথ পরিবারের কাউকেই সেরকমভাবে
পাশে পেল না। কিংশুকের বন্ধু ইমনকে কিংশুক ফোন করে বলল পরিস্থিতিটা সামলে দিতে।
অনেক বুদ্ধি ও পরিশ্রম করে ইমন সবসময় কিংশুকের পাশে ছিল। নার্সিংহোম থেকে কিংশুক
বাড়ি ফিরল। ইমনের ডিউটিও শেষ হল। কিন্তু একটা কৃতজ্ঞতা কিংশুক আর অনন্যার, ইমনের
জন্য রয়ে গেল। সেই জন্যেই মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলা কিংশুক ইমনকে বাড়ি আসতে বলত।
ইমন কিংশুকের বয়সি হলেও একটু ছেলেমানুষ ধরনের। নিজের ক্যারিয়ার এখনো গুছিয়ে
উঠতে পারিনি। তবে খুব সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত গান করে এবং নিজের একটা বাংলা গানের দল
আছে। তবে মধ্যবিত্ত বাঙালি দৃষ্টিতে এখনো ইমন প্রতিষ্ঠিত নয় জীবনে। একদিন সন্ধেবেলা
অনন্যা গান শোনাচ্ছিল তার স্বামীকে। রবীন্দ্রসংগীত 'এখনো তারে চোখে দেখিনি, শুধু
বাঁশি শুনেছি…' এমন সময় প্রবেশ করল ইমন। প্রবেশ করেই হাসতে হাসতে বলতে লাগল,
অনন্যা তুমি এত ভাল ইমন রাগের গান করো। অনন্যা কিংশুক দুজনেই অবাক হয়ে গেল। সত্যি
গানটার রাগ ছিল ইমন। একটু লজ্জা পেল অনন্যা। কিংশুক বলল অনন্যা চাইলে সংগীতচর্চা
করতে পারে যেমন বিয়ের আগে করত। এবং চাইলে ইমনের সাহায্যও নিতে পারে। এত বড় মনের
কিংশুক তা অনন্যা ধারণাই করতে পারেনি। আজ যেন বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যটাই অনন্যার
বেশি চোখে পড়ল। অনন্যা আর ইমন দুজনেই দুজনার সংগীতচর্চার সঙ্গী হল। দিন কাটতে
লাগল... অনেক নির্জন দুপুর, অনেক সূর্যাস্তের গোধূলি, অনেক বর্ষা মুখর সন্ধ্যা,
অনেক শীতের সকাল তাদের গানের সঙ্গী হল। ইমনের প্রতি অনন্যা একটা মুগ্ধতা অনুভব করল
এই মুগ্ধতা অনেক অনেক বছর আগে প্রথম কৈশোরের প্রেমের মুগ্ধতা। হঠাৎ একটা কালবৈশাখী
যেন সবকিছু উলট-পালট করতে লাগল অনন্যা অনুভব করল তারও ভেতরে রয়েছে একটা জীবন একটা
সত্তা। বাকরুদ্ধ হয়ে পরল সে। এদিকে ইমনদের বাড়ির গৃহপ্রবেশ হবে, এই ভাড়াবাড়ি ছেড়ে
চলে যাবে তারা। এই ভাড়া বাড়িতেই রয়েছে অনন্যার সংগীতচর্চার স্মৃতি। ইমনদের চলে
যাওয়ার কথায় অনন্যার চোখে জল এল। কিংশুক বোঝাল, মাঝে মাঝে সে অনন্যাকে নিয়ে
যাবে ইমনদের নতুন বাড়িতে। যদিও এখন অনন্যাকে অনেক সাবধানে থাকতে হবে। ইমনদের নতুন
বাড়ি, দক্ষিণ কলকাতা থেকে অনেক দূর তবুও ফ্লাইওভারগুলো কলকাতাকে অনেক কাছে এনে
দিয়েছে। অনন্যা বোঝাতে পারে না নিজেকে, ফ্লাইওভার নয় আরো অনেক কিছু, অনেকে কাছে
এনে দেয়। জীবনে অপ্রতিষ্ঠিত ইমনের ভবিষ্যৎ হয়তো তার মধ্যে রয়ে গেছে। যে
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নেই সেই সম্পর্ক অনন্যার মধ্যে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে।
আজও অনন্যা গান করছে ইমনকল্যাণ রাগে 'এই করেছ ভাল নিঠুর হে…'
সমাপ্ত

প্রথম যে কথাটা বলেছো, সম্পর্ক অবৈধ হলেও ভালোবাসা টা বৈধ । অসাধারন মন কেড়ে নিল।
ReplyDeleteএই ভাবে ভেবে দেখিনি কখনো।
অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইলো তোমার জন্য।
বেশ
ReplyDelete