বাতায়ন/হলদে খাম/১ম বর্ষ/২৯তম সংখ্যা/২৬শে মাঘ, ১৪৩০
হলদে খাম
উজ্জ্বল পায়রা
সাগরকে নদীর চিঠি…
স্বপ্নীল সাগর,
এখানে একটা ছোট্ট নদী তার সাগর পাওয়ার ব্যাকুলতা নিয়ে চাঁদের জোছনায় আপ্লুত। দু-কূল ছাপিয়ে উঠেছে তার ঢেউ। চকচকে চিকন ভরা বর্ষায় নদীতে বান ডেকেছে। অতল গর্ভ থেকে কত বাণী কত সুর কত ছন্দ উঠে এসে ঢেউয়ের তালে তালে দুলে দুলে মিলিয়ে যাচ্ছে ঝিকিমিকি বালুকারাশিতে। তার সমস্ত স্ফুরণ সাগরকে ঘিরে। সে দু-চোখ ভরে সাগরকে
দেখে- কী বিশাল বিস্তীর্ণ তার জলরাশি! সীমাহীন ব্যাকুল! তৃষ্ণায় ভরা দু-চোখ স্বপ্নীল অগাধ! তার সাথেই তার জন্ম-জন্মান্তরের নিবিড় যোগ তবু যোগাযোগের অপেক্ষায় সতৃষ্ণ বুক মাহেন্দ্রযোগ খোঁজে; মাহেন্দ্রক্ষণ খোঁজে তার সাগরকে কাছে পাওয়ার জন্য, সাগরের বুকে বিলীন হওয়ার জন্য।
কিছুক্ষণ আগে এক প্রেমিক-যুগল এখানে এসেছিল প্রেম খুঁজে নিতে। ওদের মধ্যে চিঠি আদানপ্রদান হল। বাতাসের খুনশুটিতে মেয়েটির দেওয়া চিঠি উড়ে এসে পড়ল আমার জলের উপর আর আমার ঢেউ তাকে এনে দিল আমার হাতে। সে লিখেছে- "গতকাল এসময় স্বপ্ন বাসর রচনা করেছি তোমার সাথে আর আজ বসে লিখছি চিঠি। আমার এখানকার ঘর, জানলা, দরজা, ঘরের পর্দা, সমস্ত আসবাবপত্র, ঘরের ভেতরকার বাতাস, বাইরের বারান্দা, চারপাশের গাছপালা সব তুমিময় হয়ে উঠেছে। সর্বত্র একটাই বাক্য ধ্বনিত হচ্ছে, "সলিলা, অন্তঃসলিলা আমার"। কী মধু আছে ওই মধুর ডাকে! কী প্রাণ আছে, কী প্রাণঢালা সুর আছে ওতে! সমস্ত রাগরাগিণীর সম্মিলিত উৎসব যেন! যেন এমন একটি ডাক, ঠিক এমনই একটি হৃদয়হরা মেদুরতম ডাক শোনার অপেক্ষায় আমার শ্রবণ-মন বর্ষ বর্ষ প্রতীক্ষায় ছিল; যে ডাক কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্র বেজে উঠল রূদ্রবীণার সুরঝংকার, জেগে উঠল সমস্ত অন্ধ নগরীর মৃত প্রাণ, বেঁচে উঠল শরীরের মৃত সমস্ত স্নায়ু-কোষ-শিরা-উপশিরা! গ্রীষ্মের প্রচণ্ড প্রহারে একটি বিদগ্ধ মন সজীব হল। আমার সমস্ত মনের শরীর জুড়ে শীতলতা, কেবল শীতলতা আর প্রবহমান ঢেউয়ের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস…"
জানো সাগর, এমন একখানা চিঠি পড়ার পর আমার চোখে সুখের ধারা অবারিত হল। আপশোশ হল সেই প্রেমিকের জন্য যে এমনতর অমৃতকথা ভরা চিঠিখানি হাতে পেয়েও পেল না। তা রয়ে গেল আমারই বুকে।
তাই "প্রেম" শব্দটির অমরবার্তা পৌঁছে দিতে আমি এ চিঠি বুকে করে তোমার কাছে আসছি সাগর, তুমি অপেক্ষায় থেকো।
ইতি—
তোমার অন্তঃসলিলা
নদী
No comments:
Post a Comment