কফি হাউসে একদিন
মনে পড়ে, একদিন, কাজ ও বাঙালি নিয়ে আলোচনায় উত্তেজনা। কেউ বলছিল তো কারুর ফোড়ন কাটা। কারুর কথায়, "যদি বলো, লোকটির নাক উঁচু, চলো ওদের বাড়ির বেড়া বা প্রাচীরটা ভেঙে দিয়ে আসি, লোকের অভাব হবে না। আর যদি বলো, রাস্তার উপর ইটগুলো পড়ে আছে, যেতে অসুবিধা হচ্ছে, রাস্তায় জল জমেছে, ইট সরানোর জন্য কেউ আসবে না। ঋণাত্মক কাজে আগ্ৰহ বেশি", আলোচনার ধারা বদলে যেত।
কেউ বলেছিল, “কাজ করে উৎসাহ পাচ্ছে না মানুষ। কাজের সাথে সফলতা ও উৎসাহ দুটি জুড়ে রয়েছে। কাজ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, অভ্যাসটি উৎসাহ বা আদর্শ হিসেবে কাজ করে”।
অন্য কেউ, “কাজ অফুরন্ত। কাজ শুরু করাটা সমস্যা। কাজ শুরু করতে পারলে গতি পাবে, যে রকমের কাজ হোক - ব্যক্তিগত বা পরিবারের বা সামাজিক কাজ। কিঞ্চিৎ সফলতা শুরুতে উৎসাহ কাজে গতি আনে। ব্যর্থতার মধ্যে কাজ দীর্ঘ স্থায়ী হয় না। তেমনি আবার অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে, উৎসাহিত হবার কারণ তৈরি হয়”।
এমনি করেই এসেছিল, “ইংরেজি ভাষায় কথা বলা ও অঙ্ক কষে আনন্দ পাওয়া সোজা, যারা পারে তাদের জন্য। আবার এক কিকে গোল করাও সহজ কাজ, যাদের অনুশীলন আছে। কাজের সাফল্যের জন্য অনুশীলনের প্রয়োজন উপলব্ধি করতে হচ্ছে। সোজা কথায়, অনেকের কাছে গ্ৰহণযোগ্য করে তুলতে পারলে, কাজে উৎসাহ অভ্যাস অনুশীলনের সাথে সাফল্য আসবেই। আদর্শ হিসেবে হোক বা এমনি এমনি”।
এরকম ভাবে আড্ডার মধ্যে এসেছিল, মাদার টেরিজা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কলকাতা শহরেই কাজ করে। অযথা তর্কে জড়িয়ে এক দলের মনে হয়েছিল, “পথের ধারে পড়ে থাকা বেওয়ারিশ শিশুদের উনি মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নতুন জীবন দিয়ে ভগবানের সমতুল্য। কিন্তু ওই সব বাচ্চারা পরে দেশে বিদেশে বড় ঘরে লালিতপালিত হয়। কলকাতায় গরিব খাবারের অভাবে থাকে অভুক্ত। অন্য ভাবনায়, উচ্ছৃঙ্খল জীবনের যুবক যুবতিদের উৎসাহিত হয়ে, কলকাতা শহরের বদনাম হচ্ছে না তো”। ছাত্রদলের ভাবনায় লাগাম পরানো অসম্ভব প্রায়।
“ভাবনার সাথে যুক্তি সবার আলাদা, শহর গ্রাম মফস্সল তিন জায়গার ছেলেমেয়ে মিশে ছাত্রসমাজ। শহরের আধুনিকতা উচ্ছৃঙ্খল চিন্তার অন্ধকারে নিমজ্জিতের সমর্থকও ছিল। তর্কে সংখ্যা বা শতাংশের হিসেবে মূল্য নেই। একদল আধুনিকতার আলোতে যে সব সামাজিক কাজ মনে করত, ছিল বিরোধিতা আরেক দলের। কফি হাউসে বসে, মন যেন নিজ কথা বলে যায়, ভালও লাগে।
“কাকু দেরি হয়ে গেল”, বলে প্রদোষ প্রুফ কপি ব্যাগ থেকে দিলে, কত কথা আলোচনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। প্রদোষ ভাল কথা বলে আগেও দুটো বই ওর হাত দিয়ে প্রকাশ হয়েছে। বই প্রকাশনার চুক্তিপত্র সইসাবুদ হয়ে গেল। প্রদোষ গাড়ির কাছ অবদি এসে নমস্কার জানাতে একে অপরের সাথে কুশল বিনিময়।
রাস্তার দুপাশের ভিড় দেখতে দেখতে পাল চন্দ্র গণেশের বাড়িতে ফেরা। বেশ লাগছে গরমের বিকেলে দোতলার ঝোলা বারান্দায়- তৃপ্তি, প্রাকৃতিক হাওয়া বাতাস, আজকের স্মৃতি রোমন্থন। দিনের স্মৃতি কথন শেষে মনে হয়, বাগানটা দেখতে মন্দ নয় দোতলা থেকে। জয়ার সাথে বসে চা খাওয়া দিনে একবার বাঁধাধরা, ঝম্পা সব ব্যবস্থা করছে, পায়ের শব্দ বলছে জয়া আসছে।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment