বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/হলদে
খাম/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | হলদে খাম
কামরুজ্জামান
আজকালকার ছেলেদের অস্থিরতার পরিণাম ও পরিচয় জানিয়ে বন্ধুর কাছে চিঠি
"দোকানদার নম্র হাসি দিয়ে বলল: ঠিক আছে বাবা, যেটা পান করছ ওই চা-ই আর এক কাপ দিচ্ছি, এক ঢোকে পান করতে পারলে আমি আমার দোকান তোমার নামে লিখে দেবো। ছেলেটা উড়ন্ত পাখি ধরার মতো গপ্ করে বাজিটা ধরে নিলো। এক নিমেষে এক কাপ চা মুখের মধ্যে ঢেলে দিলো। একটা সেকেন্ড অতিবাহিত হতে না হতেই ছেলেটা বাইকের কান টানতে টানতে হনুমান গতিতে দৌড় দিলো।"
ষষ্ঠীতলা বিহারী
২৩/০৯/২০২৪
প্রীতিভাজনেষু ঝন্টু,
২৩/০৯/২০২৪
প্রীতিভাজনেষু ঝন্টু,
হিসাব মিলিয়ে আন্দাজ করি, তুই এবং তোর পরিবারের প্রত্যেকেই কুশলে
আছিস। আমরাও মহাপ্রভুর আশীর্বাদে বেশ আছি। বিষয়টা জেনে চিন্তা-সমুদ্রে হয়তো
সাঁতার কাটতে পারিস, আবার নাও কাটতে পারিস। তবে, আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোর সঙ্গে আজকের দিনের তফাৎ খুঁজবি এ বিষয়ে কোনো
সন্দেহ নেই। দু-জনের মনোভাব এক বৃন্তে দুটি কুসুমের মতো, দু-জনেরই
তা জানা। যাইহোক, প্রধান বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করি—
দেগঙ্গা থানার অন্তর্গত খাজুরডাঙ্গা গ্রামে অর্জুন তলার
মোড়ে বছর একুশের এক হরিৎবর্ণ বালক কেটিএম বাইক চড়ে মশিউরের চায়ের দোকানের
সম্মুখে খানিকটা রাস্তা জুড়ে দাঁড়ালো। বালকটার মুখ ভর্তি তিরঙ্গা। ঠোঁট জোড়া
একেবারে জবা ফুলের মতো লাল। মাথার চুলগুলো ঘোড়ার ল্যাজের লোম। পরনে প্যান্টটা হাঁটু দুটোর কাছে ধবলা ওড়ানো। জুতো জোড়া
গুড়মুড়ো থেকে আরও একা আঙুল বাইরে বেরিয়ে আছে। সাদা জামাটা
বেশ ভদ্র গোছের। দিনটা ছিল সপ্তাহের শেষ, শনিবার। সময়ের
ঘড়িতে তখন ওই বিকেল চারটে টারটে হবে। বাইকের স্টার্ট বন্ধ না করেই বালক বলে: দোকানদার
ভাই, এক কাপ চা দাও তো। দোকানদার কথাটা শোনা মাত্রই মন্তব্য
করে বসলেন, আজকালকার ছেলেরা কাকে কী বলতে হয় হয় জানে না। ভদ্রতা-নম্রতা ওদের ঘটে এতটুকু
জায়গা পায়নি। যাইহোক, গ্যাস ওভেনে টগবগ করে ফোটা এক কাপ চা
তুলে দিলো ছেলেটাকে। ছেলেটা বাইকে বসে চায়ে চুমক দিতে না দিতেই বলল: কখন চা
বানিয়েছ? ঠান্ডা লস্যি জল হয়ে গেছে একেবারে! দোকানদার নম্র
হাসি দিয়ে বলল: ঠিক আছে বাবা, যেটা পান করছ ওই চা-ই আর এক কাপ দিচ্ছি, এক ঢোকে পান করতে পারলে আমি
আমার দোকান তোমার নামে লিখে দেবো। ছেলেটা উড়ন্ত পাখি ধরার মতো গপ্ করে বাজিটা ধরে
নিলো। এক নিমেষে এক কাপ চা মুখের মধ্যে ঢেলে দিলো। একটা সেকেন্ড অতিবাহিত হতে না
হতেই ছেলেটা বাইকের কান টানতে টানতে হনুমান গতিতে দৌড় দিলো। দোকানদার চিৎকার করে:
এই খোকা, দোকান নিবি না? এই খোকা,
দোকান নিবি না? আর তোর দোকান! কিছুক্ষণ পর
হঠাৎ খবর আসে ছেলেটা কার্তিকপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি। ছেলেটার বাবা সংবাদ
পেয়ে যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় চলে আসে। ছেলেকে আশীর্বাদ করে: "স্যান
হয়ে জ্ঞান হারানোর থেকে বোকা হয়ে ধোকা খাওয়া অনেক ভাল। সতেরো বিঘে কপাল আমার এক
ফসলেই চমৎকার। আগে জানলে চাষের কথা মাথা থেকে মুছে ফেলতাম।" প্রকৃতই চা-টা ছিল অত্যন্ত গরম, হৃদয়ের উচ্ছৃঙ্খলতা তা বুঝতে
সাহায্য করেনি। ভিতরে যতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে তত দূর পর্যন্ত একেবারে পুড়ে ঝলসে
গেছে! লজ্জায় আর ভয়ে হসপিটাল বেডে যেন এক নববধূ! কানে হেডফোন গোঁজা দেখে বোঝা
যায়, ছেলেটা কোনো এক আনন্দ যুক্ত শূন্য পরিবেশে পাখির মতো
উড়ছিল আর গাইছিল।
আজকালকার ছেলেরা সব
একটা একটা উজবুক,
কী করে আর কী যে করে না
তাদের নেই ধুকপুক।
তাদের নেই কোনো জ্ঞান-গম্য
বেশি কথা বলব কি আর,
তাল গাছের মতো লম্বা হয়েছে
মোবাইলে হয়েছে ধার!
ক্লান্ত কলম এবার একটু বিশ্রাম চায়। শরীরটা একটু শীতল হলেই
আবার কাজের পসরা
সাজিয়ে উপস্থিত হবো সম্মুখে। এসে গেছে গরম জল আর গামছা,
হাত ধুয়ে ফেলো বন্ধু এবার। নিরামিষ এই খাবার
কেমন তৃপ্তি দিলো জানার জন্যে অপেক্ষায় থাকলাম।
ইতি—
কামরুজ্জামান
একটা একটা উজবুক,
তাদের নেই ধুকপুক।
বেশি কথা বলব কি আর,
মোবাইলে হয়েছে ধার!
কামরুজ্জামান

No comments:
Post a Comment