বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য়
বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | ছোটগল্প
দেবশ্রী রায় দে সরকার
আগমনী স্টুডিয়ো
"আগমনী স্টুডিয়ো, এক মহালয়ার দিন এই স্টুডিয়োর উদ্বোধন। আবার এক দুর্গাপূজার সময় এই স্টুডিয়ো নতুন মাত্রা পেতে চলেছে। অনেক আশায় বুক বাঁধে সুদীপ্ত। দুর্গাপূজার পঞ্চমীর দিন থেকেই বড় বড় বিখ্যাত মানুষরা তাদের প্যান্ডেল ও প্রতিমা দেখে এবং থিম দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় সেরা পুরস্কারে ভূষিত হয় সুদীপ্তর পাড়া।"
একটা ছোট কাপড় নিয়ে স্টুডিয়োর ধুলোগুলো নিয়মিত ঝেড়ে পরিষ্কার করে
রাখে পর্না। বাড়ির নীচের একটি ঘরে তার আর সুদীপ্ত স্টুডিয়ো। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে এই স্টুডিয়োটি
বানিয়েছিল সুদীপ্ত। পর্নার সাথে যখন সুদীপ্তর বিয়ে হয় তখন সে একটা প্রাইভেট
কোম্পানির সামান্য চাকুরে। অনেক কষ্টে পয়সা জমিয়ে একটা
প্রফেশনাল ক্যামেরা
কিনেছিল, সুদীপ্তর শখ ছিল ফটোগ্রাফি,
তাই সাহস করে চাকরি ছেড়ে নিজের স্টুডিয়ো
বানায় সুদীপ্ত। একান্নবর্তী পরিবারে বাড়ির নীচে একটা ঘর
পেয়েছিল তারা। সুদীপ্তর শখকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিত তার স্ত্রী পর্ণা। খুবই সাধারণ
মধ্যবিত্ত জীবন কিন্তু তার মাঝে নিজেদের শখকে সযত্নে লালিত করছিল তারা। নিজেদের
থাকার ঘরটিকে দুটি ভাগে ভাগ করে বাইরের দরজার দিকের অংশটাকে স্টুডিয়ো বানালো। এক মহালয়ার দিনে স্টুডিয়োটি উদ্বোধন করল সুদীপ্ত, নাম দিল আগমনী স্টুডিয়ো। অল্প বয়সি মেয়েরা ছেলেরা, বন্ধুবান্ধব
নিয়ে, আত্মীয়স্বজন নিয়ে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দিন, কারো জন্মদিনে, বিবাহ বার্ষিকীতে এই স্টুডিয়োতে ছবি তুলতে আসত। ৯০
দশকের গোড়ার দিকে স্টুডিয়োতে ছবি তোলা বাঙালির এক বিলাসিতার
অঙ্গ ছিল। অনেকে আবার সিনেমা দেখতে যাওয়ার আগেও একটা ছবি তুলে তারপর সিনেমা হলে
যেত। অনেক স্বামী-স্ত্রী প্রতিটি বিবাহ বার্ষিকীতে এই আগমনী স্টুডিয়োতে এসে ছবি তুলতেন। আর পুজো পার্বণে জন্মদিনে
সপরিবারে ছবি তোলা বাঙালি জীবনের অঙ্গ ছিল। প্রতিদিন বিভিন্ন রকম মানুষ আর তাদের ছবি
তুলতে সুদীপ্তর বেশ ভালই লাগত, এইভাবে কেটে গেল প্রায় ১৫
বছর তারপর… কালের নিয়মে ধীরে ধীরে সবকিছু
পরিবর্তিত হতে লাগল। মানুষের স্টুডিয়োতে এসে ছবি তোলা বন্ধ
হতে লাগল, স্মার্ট ফোন এসে তাদের স্টুডিয়োর রোজগার অনেকাংশেই কমিয়ে দিতে লাগাল। এমন সময় বর্তমান প্রজন্মের সাথে, প্রযুক্তির সাথে সুদীপ্ত বেমানান হতে লাগল। নিজেদের সামান্য পুঁজি দিয়ে
প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি সে আর করতে পারল না। পাড়ার যে কজন প্রয়োজনে পাসপোর্ট সাইজ
ছবি তুলতে আসে সেটুকুই ছিল তাদের রোজগার। তাও সেটা রোজ নয়। তবুও শখের স্টুডিয়োকে তারা রোজ ধুলো ঝেড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে। স্টুডিয়োর ব্যাকগ্রাউন্ড সিনারিগুলো মলিন হতে থাকে তাও। বসার চেয়ারগুলি তার
গদিগুলি নষ্ট হতে থাকে। মলিন হতে থাকে পর্দা জানলা দরজা। দেয়াল থেকেও রং খসে
পড়ে। একান্নবর্তী পরিবার ছিল বলে সামান্য কিছু টাকা তারা দিলেও পরিবার থেকে তাদের
দুবেলা খাবার ঠিকই জুটে যেত। আগমনী স্টুডিয়ো ধীরে ধীরে
বিসর্জনের দিকে যেতে থাকে। পাড়ার দুর্গা পূজার আয়োজন যেমন প্যান্ডেলের জন্য বাঁশ
বাঁধা আরো অনেক কিছু কাজ শুরু হয়ে যায় আগস্ট মাসের শুরু
থেকেই। তাদের পাড়ার পুজোর একটা বিশেষ নাম আছে, উত্তর কলকাতার
বনেদি পুজো বলে। পুজোর এবারের থিম পুরনো কলকাতা। সুদীপ্তর কাছে পাড়ার উদ্যোক্তারা
একদিন আসেন এবং বলেন এবারের থিমে তাদের স্টুডিয়োটাকেও রাখা
হবে স্টুডিয়োর দরজার চারপাশে দিয়ে প্যান্ডেল করে সেই
প্যান্ডেল পৌঁছে যাবে মূল মণ্ডপ পর্যন্ত। স্টুডিয়োটা একটা
জীবন্ত থিম হিসেবে মন্ডপের একটি অংশ হবে। সুদীপ্ত অবাক হয়ে যায় প্রস্তাবে,
তার কাছে এটা অকল্পনীয়। সে রাজি হয়ে যায়। পুরনো কলকাতার ঐতিহ্যের
সঙ্গে পুরনো কলকাতার স্টুডিয়ো যে স্থান পাবে এটা ভাবতে তার
ভাল লাগে। তার স্টুডিয়োর নাম আগমনী স্টুডিয়ো, এক মহালয়ার দিন এই স্টুডিয়োর
উদ্বোধন। আবার এক দুর্গাপূজার সময় এই স্টুডিয়ো নতুন মাত্রা
পেতে চলেছে। অনেক আশায় বুক বাঁধে সুদীপ্ত। দুর্গাপূজার
পঞ্চমীর দিন থেকেই বড় বড় বিখ্যাত মানুষরা তাদের প্যান্ডেল ও প্রতিমা দেখে এবং
থিম দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় সেরা পুরস্কারে ভূষিত
হয় সুদীপ্তর পাড়া। সকলে এসে সুদীপ্তকে অভিবাদন দিয়ে যায় কারণ তার এই পুরনো
স্টুডিয়োটা জীবন্তভাবেই পুরনো কলকাতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
কয়েকটা দিন বেশ হইহই করে কাটে। তারপর বিসর্জন। লক্ষ্মী পূজার পর প্যান্ডেল খোলা
শুরু। যে বাঁশ বাঁধা দেখে সুদীপ্তর মনে আনন্দ জেগেছিল, আজ সেইগুলি খুলে ফেলা হচ্ছে। বিসর্জন, সবকিছুর
বিসর্জন, আজকের পর আর কলকাতার পুরনো স্টুডিয়ো কারুর দরকারে আসবে না, পড়ে থাকবে এই স্টুডিয়ো একাকী, প্রযুক্তি নির্ভর কলকাতা শহরে একটা থিম
হয়ে...
***
Apurbo likhechis.. tor chinta sokti ke prosonsa kori...
ReplyDeleteSotti khub sundor likhecho. Pore bhalo laglo. Likhe jeo abhabei.
ReplyDeleteBhalo laglo...purono smriti jagiyedilen
ReplyDeleteখুবই বাস্তব , জীবনের মুল ধারার এক প্রাণনির্বাহক সংগ্রাম। মানুষ এর খেয়াল রাখে না, তবে এই লেখায় কিছুটা মনে রাখার চেষ্টা করবে ..!!
ReplyDelete