প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | ছোটগল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
 
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি

"ওই তো রূপতার আবার এত দেমাক কীসেরওর চাকরি দেখেই তো ওকে পছন্দ করেছিলামও কি মনে করছে যে সত্যি সত্যি আমরা ওর কাজল কালো চোখের রূপের মায়ায় পড়েছি?"

 
দক্ষিণের ফুলের টবে ঘেরা বারন্দায় এক কাপ চা নিয়ে এসে আপনমনে গুণগুণ করে গলায় সুর ভাঁজতে ভাঁজতে এসে বসল শ্যামলিমা।
-যতই গান কর, কৃষ্ণকলি আমি যতই রবি ঠাকুর লিখে যান, মেঘলা দিনে দেখেছিলাম যে কালো সে কালোই হয়, বিয়ে করেছিলে কেন আমাকে, তখন তো ভালবাসায় পাগল হয়ে গিয়েছিলে
-আরে দূর বাবা! তুমি ঠাট্টাও বোঝ না? আমি তো এখনও তোমার কালো চোখের মায়ায় পাগল, তা কি তুমি জানো না? এই শ্যামা মেয়েই আমার নীল আকাশের চাঁদ।
-তোমার কাল অফিসের প্রেজেন্টেশন রেডি হয়েছে?
-না এখনও হয়নি, ঠিক হয়ে যাবে সময় মতো, তুমি চিন্তা কোর-না। মাসের শেষে আমার মাইনের চেকটা ঠিক তোমার বাবার হাতে চলে যাবে। তবেতবে এবার আমি ঠিক করেছি মাইনের অর্ধেক বাবাকে দেব অর্ধেক নিজের কাছে রাখব
-কেন?
-কেন আবার কী? আমার রোজগারের টাকা আমি রাখব তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে?
-না তা নয়, তবে বাবা কীভাবে নেবেন তাই ভাবছি!
-তুমি ভাব, আমি যাচ্ছি আমার কাজে।
রক্তিম আর ওর বাবার কথোপকথন:-
-বাবা বুঝলে পাখি ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে
-কেন কী বলছে?
-বলছে যে সামনের মাস থেকে ও মাইনের অর্ধেক দেবে, বাকি অর্ধেক ও নিজে জমাবে।
-ওই তো রূপ, তার আবার এত দেমাক কীসের? ওর চাকরি দেখেই তো ওকে পছন্দ করেছিলাম, ও কি মনে করছে যে সত্যি সত্যি আমরা ওর কাজল কালো চোখের রূপের মায়ায় পড়েছি?
হঠাৎই শ্যামা,
-না বাবা, আমি প্রথমে তা মনে করলেও কিছুদিন পরেই আমার ভ্রান্ত ধারণা ঘুচে যায় এবং নিজের ব্যবস্থার শুরু করি
-নিজের ব্যবস্থা কী নিজের ব্যবস্থা?
-কাল আমাকে একটা অফিসের টুরে যেতে হবে ফিরে এসে ভেবে দেখব কী করা যায়।
হাসি চাপতে চাপতে বেরিয়ে নিজের ঘরে এসে বন্ধু পায়েলকে ফোন করে,
-হ্যালো?
-এই আমি শ্যামা রে
-বল হে কৃষ্ণকলি কী সমাচার?
-জানিস কথা বলতে বলতে আসল কথাটা যেই বলেছি মনি বাপ-ছেলের আলোচনা শুরু হয়ে গেছে দরজা বন্ধ করে। তার পরে প্রথমে রক্তিমকে আমি বললাম আমি পরের মাস থেকে অর্ধেক মাইনে দেব তাতেই রক্তিম বলে উঠল, বাবা কি মেনে নেবেন?
-তুই কী বললি?
-আমি বললাম, রোজগার যখন আমি করি তখন কখন কী দেব সেটাও আমার বিবেচ্য, তারপরেই বন্ধ দরজার ও পারে বাপ-ছেলের কথোপকথন।
-কাল তাহলে চলে আসছিস?
-হ্যাঁ একদম, ঘরটা বুক করে রাখিস
-হ্যাঁ নিশ্চয়ই আমার পাশের ঘরটাই আমি মোটামুটি বলে রেখেছিলাম, আজ ফাইনাল টাকা দিয়ে বুক করে ফেলছি
-হ্যাঁ করে দে, কত দিলি জানাস আমি জি-পে করে দিচ্ছি।
-কাল বার হবি কী করে সুটকেস নিয়ে?
-সেও বলে দিয়েছি অফিস টুরে যাচ্ছি।
-বাহ্ খুব ভাল করেছিস।
 
করুক ওরা যত খুশি, এদিকে বউমা দরজা বন্ধ করে মনের সুখে গোছাতে শুরু করল। এতদিনে মুক্তির আলো দেখতে পাবে এটাই ওর আনন্দ। পরের দিন যাওয়ার সময় শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন,
-যে কবে আসবি?
-জানি না মা, বলতে পারছি না।
 
মায়ের কাছেও একবার যাবে ভাবল একবার, সেখানেও সেই একই ব্যাপার। নিজের মনে মনে কথা বলতে লাগল।
মা তাকে মনে করত টাকার যন্ত্র। আজ এই ভাইয়ের টিউশন, কাল ছোট বোনের স্কুল ফিস ইত্যাদি লেগেই থাকত। তাকে সত্যিকারের ভালবাসত তাদেরই কলেজে পড়াতেন অজয় স্যার সর্ট নাম এবি। এবির ক্লাস থাকলে তার মনটা আনন্দে ভরে যেত। চারিদিকের স্বার্থপরতার জোয়ারের মধ্যে যেন এক টুকরো ছোট্ট শান্তির নোঙর। বন্ধু শ্রীতমার সাথে কথা হচ্ছে, শ্রীতমা বলল,
-তাকেই বিয়ে করলি না কেন?
-আরে মায়ের জন্যই তো হল না, বলল এত বড় চাকরি, এত ভাল দেখতে এখানেই আমি কথা দিয়ে দিয়েছি, কিছু নেবে না বলছে, তাছাড়া আরও বলেছে বিয়ের পরও তুই আমাদের যেমন টাকা দিতিস তেমনি দিতে পারবি, তারপর এ কুলও গেল ও কুল গেল। লোভ বুঝলি লোভ। আমাকে সবাই টাকার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত।
পায়েল বলল,
-এত দিনে তাও তুই বুঝলি
-কী করতাম বল?
-আমি তো তখন থেকেই বলতাম, এখানে সবাই স্বার্থপর, বেরিয়ে আয়, অবশ্য তোর মায়ের মতন মা আমি দেখিনি। কিছু মনে করলি না তো?
-না না, তুই যা বললি তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। কাল অফিসের পর আগে আমায় উকিলের কাছে গিয়ে রক্তিমকে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে হবে।
-হ্যাঁ আমিও তোর সাথে যাব
-হ্যাঁ যাবিই তো।
-ডিভোর্সের পর যাবি নাকি স্যারের কাছে?
-কেন?
-না রে নিজের মতোই থাকব, ছুটি থাকলেই বেরিয়ে পড়ব দুই বন্ধু মিলে
-সত্যি বলছিস তো?
-হ্যাঁ একদম সত্যি, আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। যার নিজের মা-ই মেয়ের ব্যাপারে এত স্বার্থপর, সে কি পারে আর কাউকে বিশ্বাস করতে?
 
খুব তাড়াতাড়ি ওদের ডিভোর্সটা হয়ে গেল। রক্তিম আর ওর বাবা যথেষ্ট হম্বিতম্বি করেছিল শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হল। দেখতে দেখতে কেটে গেল পনেরোটা বছর। কাজ থেকে অবসর নিয়ে দুই বন্ধু মিলে তাদের অর্থ দিয়ে শান্তিনিকেতনে একটা সুন্দর জমি দেখে বাগানওয়ালা বাড়ি করল। তার সাথে নাচ, গান আর কবিতার ক্লাস নেওয়ার জন্য কিছুটা জায়গা বার করে নিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে নিল। হঠাৎ একদিন অজয় স্যার এসে হাজির স্যারকে দেখে ওরা দুই বন্ধুই চমকে গিয়ে প্রায় একসাথে বলে উঠল,
-আপনি? এখানে?
-বাপ রে দুই বন্ধুর একসাথে চমকে যাওয়ায় আমিও চমকে গিয়েছিলাম।
-না না স্যার খুব ভাল লাগছে আপনাকে দেখে
পায়েল হেসে বলল,
-স্যার তার কৃষ্ণকলিকে ঠিক জায়গায় খুঁজে পেয়েছেন।
-হ্যাঁ কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম তোমরা দুজনে একই জায়গায় আছ। তুমি তো বিয়েই করনি ব্যাঙ্কের চাকরি নিয়েছ আর একজন কর্পোরেট থেকে কলেজে পড়ানোতে যোগ দিয়ে নিজের মতন করে বাঁচতে শিখেছে এত দিনে।
পায়েল বলল,
-তোরা কথা বল আমি চা করে আনছি।
অজয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
-জানো কৃষ্ণকলি, আমাদের সমাজে আগের দিনের মানুষরা বাইরের রূপ দেখতে পেত অন্তরের সৌন্দর্য নয়। এখন মানসিকতা অনেক বদলে গেছে, রূপের চেয়ে গুণের কদর বেড়েছে। প্রথম দিনই সুন্দর মুখের কালো চোখ দুটো আমায় মুগ্ধ করে, তারপর তোমার অন্তরে কিছু নির্মল সৌন্দর্য আছে যা সবার চোখে পড়ে না।
এর মধ্যে পায়েল চা নিয়ে এলো, অজয় সাথে সাথে বলল,
-আমাকে তোমাদের দলে নেবে? আমরা তিনজন মিলে এই সঙ্গীত নিকেতনকে আরও এগিয়ে নিয়ে চলি।
দুই বন্ধু একসাথে বলে উঠল,
-নিশ্চয়ই
তারপর তিন জনেই হেসে ফেলল।
 
~~০০০~~

No comments:

Post a Comment

সূর্যাস্ত গঙ্গার বুকে


Popular Top 10 (Last 7 days)