বাতায়ন/ধারাবাহিক উপন্যাস/৩য় বর্ষ/৪৩তম সংখ্যা/১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক উপন্যাস
অজয় দেবনাথ
মউ
[২০তম পর্ব]
"এখন যে রস হবে গেঁজিয়ে যাবে, তাতে হবে তাড়ি বেলার দিকে নামাবে, তাড়ির রসনায় তৃপ্ত হতে গাছের গোড়ায় সঙ্গীসাথি নিয়ে দলবদ্ধভাবে গোল হয়ে বসবে তাড়ি প্রিয় মানুষের দল।"
পূর্বানুবৃত্তি
২২
জানালার ধারে, ট্রেনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পিছনে
ছুটছে প্রকৃতি। মাঠঘাট, নদীনালা, নয়ান জুলি, চাষের খেত আর সেই সঙ্গে তার মন। এখন চাষের
সময় নয়, তাই মাঠঘাট ফাঁকা ফাঁকা, শুকনো। শুধু মাইলের পর মাইল জুড়ে কলা বাগান আর বিভিন্ন
শাকের খেত। যদিও কাছে-দূরে কোথাও কোথাও মাঝে মাঝে দু-একটা সবুজ ধানের খেত দেখতে পায়
ছোট ছোট। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে অবস্থাপন্ন কিছু মানুষ দিনকে রাত রাতকে দিন করার সংকল্প
করেছে। তারা জেনারেটরে শ্যালো-পাম্প চালিয়ে মাটির গভীর বুক থেকে তুলে আনছে মাটির রস।
গোরুকে ইনজেকশন দিয়ে দুধ দোয়ানোর মতো। সুখের মনে হয়, এ যেন মায়ের বুকের রক্ত চুষে নেওয়া।
ভাল লাগে না সুখের। তাছাড়া সাধারণ চাষি মাঠে লাঙল দিচ্ছে, প্রকৃতির নিয়মে বৃষ্টি নামলে,
মেঘের জলে ভিজে মাটি রসসিক্ত হলে কিছুদিনের মধ্যেই কেউ ধান বুনবে কেউ-বা পাট। কিন্তু
এইভাবে চলতে থাকলে সাধারণ চাষির মনও একদিন বদলে যাবে, হয় লোভে নয়তো মার্কেটের কম্পিটিশনে
টিকে থাকতে গিয়ে।
ট্রেনের এই এক বৈশিষ্ট্য। শহরতলির ট্রেন থেকে বাইরেটা
দেখলে সবটাই গ্রাম মনে হয়, শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে। অবশ্য যে-কোনো ছোটখাট স্টেশনে
নেমে গেলে দেখা যাবে স্টেশন সংলগ্ন কিছুটা এলাকা বাদ দিলে বাড়িঘর দোকানপাটও নেই, এ
তো একেবারে গ্রামেরই ছবি। সুখ যেন অন্য কিছু দেখতে চায়। বাইরেটা যেন ঠিক মনের মতো হচ্ছে
না, ভাল লাগছে আবার যেন ঠিক ভাল লাগছে না। মনের গতি এমনিতেই সর্বাধিক, আর কারোর মন
যদি কিছু দেখতে চায় তাও প্রকৃতির বুকে সওয়ার হয়ে কার ক্ষমতা আছে তাকে রোখে!
বর্তমান প্রকৃতির ছবি ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে
যেতে লাগল। ফুটে উঠল হলুদ সরষের খেত। দূরে-কাছে সবুজের প্রেক্ষাপটে বাতাস ঢেউ খেলে
যাচ্ছে হলুদ রংয়ের সরষের খেতে। মাইলের পর মাইল যতদূর চোখ যায়। এক দল ফিঙে পাখি তাদের
কালো কুচকুচে চেরা ল্যাজ দুলিয়ে উড়ে যায় আবার এসে বসে ওয়ারলেসের তারে। গায়ে গরম জামা
দেওয়া সত্ত্বেও শীত শীত করে। খেজুর গাছগুলোতে হাঁড়ি বাঁধা। ভোরের রস নামিয়ে নিয়ে গেছে
গাছি। এখন যে রস হবে গেঁজিয়ে যাবে, তাতে হবে তাড়ি বেলার দিকে নামাবে, তাড়ির রসনায় তৃপ্ত
হতে গাছের গোড়ায় সঙ্গীসাথি নিয়ে দলবদ্ধভাবে গোল হয়ে বসবে তাড়ি প্রিয় মানুষের দল। তাড়ি
খেয়ে বিড়ি টানতে টানতে যাবে কাজে-অকাজে, গ্রামের অলস জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষ।
সুখের মন পিছনে ফিরতে ফিরতে চলে যায় সরষে ফুলের খেত
ধরে নবান্ন উৎসবে। খেজুরের রস জ্বাল দেওয়া নলেন গুড়ের পাশাপাশি রসের পায়েস, পুলিপিঠে,
রসপুলি, পাটিসাপটা রকমারি জিভে জল আনা লোভনীয় আয়োজন। নবান্নের বেশ কদিন আগে থেকেই সাজোসাজো
রব। বিভিন্ন লোকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। কমলামাসিদের বাড়িতে ঢেঁকিতে চাল কুটে সেই চালের
গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হবে রসনার তৃপ্তি। কমলামাসি, মা, কমলামাসিদের বাড়ির বাকি মহিলারা,
সঙ্গে গ্রামের নানা বয়সের ছেলেছোকরার দল, আরও নানা পিঠে-লোভী এবং পার্বণে উৎসাহী নারীপুরুষ
সবাই মিলে একান্নবর্তী পরিবারের মতো নবান্ন উৎসবে সামিল।
পাটিসাপটা সুখের খুব প্রিয়। চালের গুঁড়ো দিয়ে পরোটার
মতো ভেজে ভিতরে নারকেল আর গুড়ের ছাঁই দিয়ে রোলের মতো চ্যাপটা করে পাকানো। নারকেল আর
গুড়ের ছাঁই মুখে গেলে, আহা অমৃত! সুখ কখনও পরোটার থেকে ছাঁই আলাদা করে খেতে পছন্দ করত
আবার কখনও একসঙ্গে। কতগুলো করে যে পাটিসাপটা খেত তা গুণে শেষ করা যেত না। মা বারণ করে
বলত,
-অত খেতে নেই সুখ পেট ফাঁপবে। রসের খাবারে পেট ভার করে।
কমলামাসি প্রশ্রয় দিয়ে বলত,
-আহা ছেলেমানুষ খাচ্ছে খাক-না বাধা দিচ্ছ কেন? ছেলেমানুষ
বয়স কিচ্ছু হবে না, এই বয়সে লোহা খেলে লোহা হজম করে ফেলবে। আর অসুবিধা হলে একটু নুন-পড়া
খাইয়ে দিলেই হবে।
আগে আগে মন্ত্রপূত নুন-পড়ার চল ছিল। হজমের গণ্ডগোল হলে
বা চোঁয়া ঢেকুর উঠলে নুন-পড়া খেলেই কিছুক্ষণের মধ্যে ভাল হয়ে যেত। এখনও হয়তো কোথাও
কোথাও আছে। এখন সুখ জানে, মন্ত্রফন্ত্র ওসব কিচ্ছু নয়, এ জাতীয় পেটের গণ্ডগোলে এক বা
দু চামচ নুন মুখে দিয়ে এক গ্লাস জল খেলেই ভাল হয়ে যায়। সে নিজে পরখ করে দেখেছে কয়েকবার।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment