বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪২তম সংখ্যা/৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
মধ্যবিত্তের
পথে
[৩য় পর্ব]
"তা কী করে হয়, ঘোড়া ঘাসের সঙ্গে দোস্তি করলে ঘোড়া বাঁচবে কী করে বল্টুবাবু? তবু তুমি ভাল ছেলে বলে তোমাকে আমি দু’মাস সময় দিলাম, তারপর কিন্তু সুদের উপর সুদ লাগবে, এই বলে দিলাম।"
পূর্বানুবৃত্তি
লোকাল ট্রেনটা ঘন্টাখানেক
ধিকিধিকি যাওয়ার পর বেশ খানিকক্ষণ এক্সপ্রেসের মতো ছুটছিল আবার বোধহয় সামনে মালগাড়ি
পড়েছে, ট্রেন তো নয় যেন টোটোয় রওনা
হয়েছে। মায়ের মন তো, ছেলের মনটা শুকনো
শুকনো দেখে ছেলেকে মামার বাড়ি বৈকুণ্ঠপুরে ক’দিন ঘুরে আসতে পাঠিয়েছেন। বর্ধমানের কাছে
গাঙপুর স্টেশনে নেমে টোটোয় করে যেতে হয়। সবুজ ধানখেত, পুকুরে ছিপে মাছ ধরা এসব নিয়ে তিন-চারদিন ভাল
লাগলেও সবুজ বনানীর আড়াল থেকে ঐশিকি মেঘ আবার একটু একটু করে তাকে ঘিরে ধরছিল। সাত দিনের
বদলে তিন দিনেই সে কলকাতা ফিরে এল। ঐশিকার কাছে যেন আগে থেকেই খবর ছিল, ওখানে যখন ছিল একবারও ফোন আসেনি, কলকাতার বাড়িতে ফিরতেই বিকেলে ঐশিকার ফোন।
-এই তুমি আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন বল তো? দেখা করা তো দূরের কথা আজকাল ফোন করলে অল্প দু-চারটে কথার পর
ফোন রেখে দিচ্ছ। তোমার ব্যাপার কী শুনি, না এর মধ্যে অন্য কাউকে ভাল লেগে গেল?
-যাহ্, কী যে বল তুমি, তুমিই তো ফোন রেখে দাও, আমি আর কী করব?
-ঠিক আছে, ঠিক আছে শোন, কাল টিফিনের সময় স্কুল ছুটি হয়ে যাবে, মা-বাবা জানে না,
তুমি
খাবার খেয়ে ঠিক দেড়টার সময় মিষ্টিপুকুরের কাছে চলে আসবে, ওখানে বেশ ভাল বসার জায়গা আছে, তোমার সাথে অনেক কথা আছে, আমাকে যেন হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়,
ঠিক তো?
-তুমি ডাকছ আর আমি যাব না, তাই কখনো হয়?
-থাক থাক আর ঢং করতে হবে না।
শেষপর্যন্ত ঐশিকার পীড়াপীড়িতে
বল্টুর কাছে আর কোন উপায় থাকল না। এদিকে তার মা ওর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহারা দেখে
অনেক জোরাজুরি করে শেষে সবকিছু শুনলেন ওর কাছ থেকে। মা একদিন লুকিয়ে লুকিয়ে একটা
ঝোলায় তার কিছু গয়না বল্টুর হাতে দিয়ে বললেন,
-দ্যাখ এগুলো বিক্রি করে কতটা কী হয়? এখন তো সোনার অনেক দাম, অনেকটাই হয়তো হয়ে যাবে।
কিন্তু স্যাকড়ার কাছে গিয়ে
এই বাদ, সেই বাদ করে শুধু মাত্র সত্তর
হাজারের বেশি জোগাড় হলো না। এরই শেষ পরিণামে সে এক শাইলক সুদখোরের কাছে আশিহাজার টাকা
ধার করল। প্রথম তিন-চারমাস সে যেমন-তেমন
করে সুদের টাকা জোগাড় করেছিল, তারপর মাসিক সুদের
টাকা প্রত্যেক মাসে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।
-কী বল্টুবাবু, এইমাসেও মাত্র
একহাজার দিচ্ছ, এইভাবে যদি সুদের টাকা বাকি
রাখ, তাহলে তো সুদের টাকার উপর
আবার সুদ লেগে যাবে, জানো তো এই লাইনে
সুদের টাকার উপর সুদ কিন্তু ডবল মানে আট পারসেন্ট।
-না না, তুমি আমাকে তিন-চারমাস সময়
দাও, আমি সব সুদের টাকা মিটিয়ে
দেব।
-তা কী করে হয়, ঘোড়া ঘাসের সঙ্গে
দোস্তি করলে ঘোড়া বাঁচবে কী করে বল্টুবাবু?
তবু
তুমি ভাল ছেলে বলে তোমাকে আমি দু’মাস সময় দিলাম, তারপর কিন্তু সুদের উপর সুদ লাগবে, এই বলে দিলাম।
এইভাবে দিনের পর দিন সুদ
বাড়তে থাকে আর সে ক্রমশ সুদের জালে আটকে পড়ে,
যত
বেরোনোর চেষ্টা করে তত বেশি করে জালের মধ্যে আটকে পড়ে। পাওনাদারের তাগাদা বাড়তে থাকে আর
রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে টাকা চাওয়া আর চিৎকার করে অপমান।
এসব কেসে লোকে শুনেও না শোনার ভান করে চলে যায়। এরই চরম পরিণতি ঘটে গেল সেইদিন,
-কী রে শুয়োরের বাচ্চা,
বেশ তো
লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস, আমার টাকার কথা তো
আমাকেই ভুলিয়ে দিবি, পেটে পেটে এত শয়তানি
পুরে রেখেছিস, আজ কোথায় যাবি? পাক্কা
চারমাস তো গা ঢাকা দিয়ে আছিস।
-কী করব বলো, আজকাল কিছু কাজই হাতে
পাচ্ছি না, হাতফাঁকা একদম।
-আহা, ন্যাকাপুসু রে।
হঠাৎ তার মাথায় আদিম
কামনাপ্রসুত এক গোপন ইচ্ছে জাগরিত হয়ে ওঠে,
-কী করবি বলব, তাহলে তোকে আর মাসে
মাসে সুদের টাকা দিতে হবে না, শুধু তোর ট্রেনিং শেষ
করে চাকরি পেলে আসলটা ফেরত দিলেই হবে।
-কী?
-দ্যাখ আবার রেগে যাস না যেন।
জালে আটকে পড়া রূপোলি বোয়াল
শেষ পরিত্রাণের আশায় কোনরকমে বলে,
-বলো।
-তোর মা তো এখনো ভালই ডাগর আছে, মাসে একবার আমার সাথে ঘন্টাখানেক কাটিয়ে গেলেই হবে। তুই
বললে না করতে পারবে না।
এই শুনে প্রথমে
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেও হঠাৎ বল্টু অনুভব করল তার শরীরের ভিতরে একটা সুপ্ত
আগ্নেয়গিরি যেন জেগে উঠেছে, শুরু হয়েছে জ্বলন্ত
লাভার উদগীরণ, আগুনের লেলিহান শিখা ছুটে
আসছে তার শরীরের অভ্যন্তরে সর্বাঙ্গে,
থরথর
করে কাঁপছে সারা শরীর।
-তবে রে শয়তানের বাচ্চা।
বলেই তার সলমন খানের মতো
চেহারার এক সুকঠিন বজ্রমুষ্টি গিয়ে ভীমবেগে আঘাত করল পাওনাদারের বুকের
সেই জায়গায় যার পিছনে
হৃৎপিণ্ড থাকে, তারপরেই সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
মাসখানেক পরে আলিপুর জেলা
আদালতে দেখা যায় পঞ্চাদাকে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কোনরকমে এক মাঝারি
মানের উকিল গদাধর রায়কে
ধরেছেন। ওদিকে পাওনাদারের ছেলের হয়ে লড়ছেন দুঁদে উকিল প্রতাপ সামন্ত। আদালত কক্ষে
তাঁর যথাযোগ্য আসনে বসে আছেন মহামান্য বিচারপতি। আসামীর কাঠগড়ায় বল্টু, একমাসেই তার চেহারা সলমন খান থেকে নাসিরুদ্দিন শাহ হয়ে
গেছে।
-এতদিন যাবৎ এই যে রত্নাকর দাস খুনের মামলায় সমস্ত
সাক্ষীসাবুদ ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ এবং সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ, সমস্ত শুনানি থেকে এটা প্রায় প্রমাণ হয়ে গেছে যে আসামী
শুভ্রনীল রায় ওরফে বল্টু স্বেচ্ছাকৃতভাবেই রত্নাকর দাসকে খুন করেছে। এখন আসামী
পক্ষের উকিল গদাধরবাবু আপনি বলুন আসামী যে নিরপরাধ তার সপক্ষে আপনার কাছে নতুন কোন
সাক্ষ্যপ্রমান আছে কিনা?
-মিলর্ড, নতুন প্রমাণ না
থাকলেও আজ আপনার কাছে এক বিশেষ সাক্ষীকে হাজির করব। তার কাছে এই খুনের ঘটনার পূর্বকাহিনি ও
সর্বাঙ্গীন পরিস্থিতির কথা আদ্যপ্রান্ত বিচারবিবেচনা করে আপনি যা রায় দেবেন আসামী
মাথা পেতে নেবে।
-সাক্ষীকে হাজির করার অনুমতি দেওয়া হল।
-সাক্ষী ঐশিকা সেন হাজির হো-ও-ও।
সাক্ষী ঐশিকা সেনকে ও আসামীকে
বিভিন্নরকম প্রশ্নের মাধ্যমে গদাধর রায় আসামীকে অনিচ্ছাকৃত হত্যায় বাধ্য করা ও
রত্নাকর দাসের শাইলকসম চরিত্র তুলে ধরলেন।
-আচ্ছা প্রতাপবাবু আপনি এবার সাক্ষীকে জেরা করুন।
-আমি যা প্রশ্ন করব,
তার
উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না হবে, অন্য কোন কথার
প্রয়োজন নেই।
-আসামীকে আপনি কি অন্তত বছরপ়াচেক আগে থেকে চেনেন?
-না।
-আপনার স্কুল যাওয়ার সময় সেই পথে কয়েকজন ইভটিজারদের সাথে সে
আপনাকে দেখার জন্য বসে থাকত?
-ওরা ইভটিজার কেন হবে?
-সেটা আদালত বিচার করবে, আপনি এককথায় উত্তর দিন। আপনি গীতা স্পর্শ করে সত্য বলার শপথ নিয়েছেন।
-হ্যাঁ।
-আপনি কি আসামীকে কোনপ্রকার ব্ল্যাকমেল করেছিলেন রত্নাকরবাবুর
কাছে ঋণ নিতে বাধ্য করতে?
দুঁদে উকিলের ঝাঁঝালো
প্রশ্নবাণে ঐশিকা দরদর করে ঘামতে থাকে।
-তাড়াতাড়ি উত্তর দিন।
-না।
-আসামী বছর চারেক আগে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন, সারাদিন তিনি কী করে বেড়াতেন আপনি জানতেন?
-না।
-আপনি কি আসামীকে ভবিষ্যতে বিবাহের কোন প্রস্তাব দিয়েছিলেন?
-না, ডাইরেক্টভাবে কিছু
বলিনি, তবে
-থাক, এককথায় বলুন।
-আসামী রত্নাকরবাবুকে মাসে মাসে সুদের টাকা দিতেন, আপনি জানতেন?
-না।
-দ্যাটস অল ফর মি,
মিলর্ড, তাহলে দেখছেন এখনো পর্যন্ত একজন সাক্ষীও পাওয়া যায়নি, যে প্রমাণ হয় রত্নাকরবাবু আসামীর কাছে সুদ নিতেন, আসামী শুধু তাঁর মতো পরোপকারী সদাশয় ব্যক্তিকে খুনই করেনি, এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও আসামীপক্ষ তার নামে কুৎসা অপপ্রচার
করছেন।
-এতদ্বারা শ্রীযুক্ত রত্নাকর দাস খুনের মামলায় এই আদালতে
সমস্ত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হল, আগামী সোমবার ইংরেজি সাতাশে
এপ্রিল এই মামলার রায়দান করা হবে।
মহামান্য বিচারপতি ঘোষণা
করলেন। প্রথম অপরাধ বলে বল্টুর সাতবছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment