বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৫তম সংখ্যা/২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
দুটি
নিস্ফল ভালবাসা
[২য় পর্ব]
"তুমি চাকরি ছাড়বে না, আমি মনে করি চাকরি যার করার মতন যোগ্যতা আছে সে কেন চাকরি করবে না? তাছাড়া তোমার বাবা-মায়ের দায়িত্ব আছে না?"
পূর্বানুবৃত্তি বিয়ের পনেরো দিন পরে জামাইষষ্ঠী। একান্নবর্তী পরিবারে
সকলেই ব্যস্ত। নব্বই বছর বয়স্কা
ঠাকুমা নিজে পায়েস রাঁধতে বসেছেন। নীলেশ
দামী দামী কাপড় কেনায় বিদিশা লজ্জায় পড়ে যায়। তারপর…
বাড়ি গিয়ে নীলেশ বলল,
-বাবা! এত কেউ খেতে পারে?
-একেই বলে
বনেদি বাড়ির কালচার।
রাত্রে শুতে এসে নীলেশের
বাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদিশা বলল,
-তোমার কি আমাদের বাড়ির সবাইকে ভাল লেগেছে?
-হ্যাঁ নিশ্চয়ই
দেখলে না মা বললেন একেই বলে বনেদি বাড়ির কালচার, আমরাও খুব বিরাট কিছু বড়লোক নই
বাবাও অনেক কষ্ট করেছেন তবেই
ব্যবসা দাঁড়িয়েছে।
-সে তো ঠিকই
আমি ওঁদের সবাইকে খুব ভাল রাখব কিন্তু চাকরি ছাড়ব না।
-কেউ বলেছে
চাকরি ছাড়ার কথা?
-না তা কেউ
বলেননি।
-তুমি চাকরি
ছাড়বে না, আমি মনে করি চাকরি
যার করার মতন যোগ্যতা আছে সে কেন চাকরি করবে না? তাছাড়া তোমার বাবা-মায়ের দায়িত্ব আছে না? তুমি তাদের একমাত্র মেয়ে তোমাকেই তো সবসময় গিয়ে দাঁড়াতে হবে আর বিয়ের আগে যেমন
বাড়িতে করতে তেমনি করবে।
-আর এ বাড়িতে?
-এ বাড়িতে তুমি
দেবে কেন? তোমার সব ভার আমার।
বিদিশা নীলেশের বুকে মুখ গুঁজে বলল,
-তুমি খুব ভাল।
নীলেশ বিদিশার থুতনিটা হাত
দিয়ে তুলে ধরে বলল,
-আর এই মেয়েটা?
-সে তো তুমি
বলবে।
নীলেশ বিদিশাকে গাঢ় আলিঙ্গনে
আবদ্ধ করে বলল,
-তুমি আমার
বুকের পাঁজর। আসলে আমাদের সমাজ আজকাল নিজেদের আধুনিক করে তোলার প্রয়াসে যে কোথায়
নেমে যাচ্ছে তা নিজেরাই জানে না, যেটুকু
বনেদি কালচার বেঁচে আছে তা এই মধ্যবিত্তদের মধ্যে। বুঝলে হাঁদারাম।
-এই বারবার
হাঁদারাম বললে কিন্তু হবে না।
-আচ্ছা আর বলব না।
বলে বিদিশাকে কাছে টেনে নিল।
এরপর পাঁচ বছর প্রায় সুখে-দুঃখে ঝগড়া
অভিমান মান ভাঙানো ভালবাসায় কেটে গেল। বিদিশার কোল আলো করে
ওদের সন্তান তিতাস জন্মাল কিন্তু সংসারে প্রথম প্রথম সবকিছু যত ভাল মনে হয় আসতে
আসতে তা ফিকে হতে থাকে। একদিন বিদিশার শাশুড়ি বিদিশাকে বলল,
-বউমা অনেকদিন
তো হল এবার চাকরিটা ছেড়ে দাও।
বিদিশা করুণ মুখে নীলেশের
দিকে তাকাল কিন্তু দেখল সে নিরুত্তাপ।
-চাকরি এ সময়
ছেড়ে দিলে সরকারি চাকরি আর পাব?
এতদিন
ধরে এত কষ্ট করে আমি চাকরিটা ধরে রেখেছি।
-কিন্তু তোমার
চাকরির টাকা তো এ বাড়ির কোন প্রয়োজনে আসছে না।
বিদিশা যখন দেখল নীলেশ কিছু
বলছে না আর কদিন ধরেই নীলেশের ব্যবহারও পালটে গিয়েছে, সে ফেরে প্রায় অনেক রাত করে মাঝে মাঝে ড্রিংক করে ফেরে। এই
নিয়ে একদিন ছোটখাট ঝগড়া হয়ে গেল। নীলেশ বলল,
-নিজে পড়াও তো কলেজে, কর্পোরেট জগতের বিরাট কাজের কথা ভাবতেই
পারবে না তাই আমার প্রয়োজন হয় একটু ড্রিংকসের।
বিদিশা বলল,
-সেই সাথে
মহিলা সঙ্গী দিনের বেলায় আউট্রাম ক্লাবে সর্বসমক্ষে।
-নিজের দিকে
তাকিয়ে দেখেছ কোনদিন চেহারার কী হাল করেছ একবারে টিপিক্যাল
দিদিমনি মার্কা।
বিদিশা হো হো করে হেসে বলল,
-আসলে তোমার
মনে অন্য রং লেগেছে এখন তা না হলে শত্রুও বলবে না আমার চেহারা খারাপ।
-খারাপ তো
বলিনি কিন্তু যার ভগবান-দত্ত রূপ আছে, কী এমন ক্ষতি হবে একটু যদি নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে নাও, তুমিও তো পার আমার সাথে একটু ড্রিংকস নিতে।
-আমি? বাড়িতে বসে তোমার বাবা-মায়ের সামনে? রক্ষে করো আমার দ্বারা হবে না।
-স্বামীকে
বেঁধে রাখতে জানতে হয়।
-স্বামীকেও
জানতে হয় স্ত্রী কীভাবে স্ত্রীকে বেঁধে রাখতে হয়। তোমার বন্ধুর স্বামী বোধহয় তা জানেন না তাই স্ত্রী অন্যের স্বামীকে নিয়ে
টানাটানি করে। তারপর ফিরে আসি সেই চাকরি ছেড়ে দেবার কথায়।
তার আগের দিনই ঝগরাটা হয়েছিল, বিদিশা উত্তর দিয়েছিল,
-চাকারি আমি
কিছুতেই ছাড়ব না, চাকরি আমার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এই
স্বাধীনতা কেউ ছাড়ে? আমি কি পাগল না কি? তাছাড়া আপনার ছেলে এখন অন্য ফুলের মধু খায় তাই এখন তো চাকরি
ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।
শাশুড়ি ফিসফিস করে বললেন,
-সেইজন্যই তো
বলছি ঘরবার সামলে তোমার একটু বিশ্রাম একটু রূপচর্চা করলেই তোমার কাছে কি কোন
রাক্ষসী দাঁড়াতে পারবে?
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment