প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

চৈতি হাওয়া—নববর্ষ

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ , ১৪৩৩ চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | সম্পাদকীয়   চৈতি হাওয়া—নববর্ষ "দুগ্ধপোষ্য...

Wednesday, April 8, 2026

ভাষা সাম্রাজ্যবাদের দাপটে বাংলাভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন | তুষার ভট্টাচাৰ্য

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/প্রবন্ধ/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | প্রবন্ধ
তুষার ভট্টাচাৰ্য
 
ভাষা সাম্রাজ্যবাদের দাপটে বাংলাভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন

"যাদবপুরে কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা- ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স কর্তৃপক্ষ এক ফরমান জারি করে জানিয়েছে যে এই সংস্থায় ৫৫শতাংশ চিঠি এবং ৩০ শতাংশ নোটশিট হিন্দি ভাষায় লিখতে হবে।"

 
প্রতিবছর বঙ্গাব্দের শুভারম্ভ ১লা বৈশাখ এলেই আমাদের দীনদুঃখিনী মাতৃভাষা বাংলার জন্য দরদ উথলে ওঠে বছরের মাত্র একটি বা দুটি দিনই (২১ ফেব্রুয়ারি) মাতৃভাষাকে মনে পড়ে আম বাঙালির তারপর সারাবছর বাংলাভাষা অনাদরে পড়ে থাকে বাঙালির ঘরে ঘরে অন্তরে-বাহিরে বর্তমানে বাঙালি ঘরের নবীন প্রজন্মের অনেকেই ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুলে পড়াশোনা করার ফলে একদমই মাতৃভাষা জানে না যার ফলে মাতৃভাষার ধাত্রীভূমিতেই ক্রমশ বাংলা ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়ছে
তাই যে প্রশ্ন এখন সর্বাগ্রে উঠে আসে তা হল- আমাদের মাতৃভাষা বাংলা অদূর ভবিষ্যতে ধাত্রীভূমি পশ্চিমবঙ্গ নামক ভূ-খণ্ডে আদৌ টিকে থাকবে তো? ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষা সাম্রাজ্যবাদের সর্বগ্রাসী দাপটে নিজের নিজভূম থেকে অচিরেই হারিয়ে যাবে না তো?
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে- বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে প্রায় একহাজার ভাষা রয়েছেভাষা বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই আশঙ্কা করে জানিয়েছেন যে পৃথিবীর বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষার দাপটে প্রায় পঞ্চাশ থেকে নব্বই ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীর ভাষার অবলুপ্তি হয়ে যাবে নিকট ভবিষ্যতেসাম্প্রতিককালে পৃথিবীতে বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষা হল- স্প্যানিশ ভাষা, ইংরেজি ভাষা, আরবি এবং হিন্দি ভাষা
এই ভাষাগুলির দাপটে অচিরেই বিশ্ব ভুবন গ্রাম থেকে হারিয়ে যাবে অনেক আঞ্চলিক ক্ষুদ্র ভাষাযেমন, পাপুয়াগিনি নামক দ্বীপরাষ্ট্রে আগে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় আটশো তিরিশটি আঞ্চলিক ভাষা ছিলইংরেজি ভাষার দাপটে সেখানে ইতিমধ্যেই অধিকাংশ আঞ্চলিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা হারিয়ে গিয়েছে
অধুনা একইরকম চিত্র চোখের সামনেই  দেখতে পাওয়া যাচ্ছে প্রতিনিয়ত আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে মাতৃভাষা বাংলার দুয়োরানির মতন অবস্থা হয়েছে কেননা এই রাজ্যে ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষার দাপট ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছে কিছুদিন আগে যাদবপুরে কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা- ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স কর্তৃপক্ষ এক ফরমান জারি করে জানিয়েছে যে এই সংস্থায় ৫৫শতাংশ চিঠি এবং ৩০ শতাংশ নোটশিট হিন্দি ভাষায় লিখতে হবে এই নির্দেশের সারমর্ম এটাই যে, এই কেন্দ্রীয় সংস্থায় অধিকাংশ বাঙালি কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি ভাষা শিখতে হবে
এখন অবস্থা এমনই হয়েছে যে কেন্দ্রীয় সরকারের পোস্টঅফিস থেকে ব্যাঙ্ক ও আয়কর অফিসের সমস্ত আমানত এবং আয়করের হিসেব নিরূপণ প্রভৃতির ফরম হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় মুদ্রিত হওয়ার ফলে এই রাজ্যের সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত অসুবিধের সম্মুখীন হতে হয়
 
বস্তুতপক্ষে, এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন অফিসগুলিতে অতিরিক্তভাবে ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যাবার ফলে বাংলা ভাষা ব্যবহারের পরিসর দিনকে-দিন কমে যাচ্ছে এই রাজ্যের সর্বত্রইএমনিতেই পশ্চিমবঙ্গে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার জেলাতে অনেক মানুষ গোর্খালি ভাষায় কথা বলেন কলকাতা, হুগলি, হাওড়া এবং দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চলে প্রচুর মানুষ হিন্দিভাষী পূর্ব-মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমার কিছু অংশে ওড়িয়া মিশ্রিত বাংলায় কথা বলেন অনেকে পশ্চিম-মেদিনীপুর জেলা, ঝাড়গ্রাম জেলা বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া জেলার কিছুটা অংশে অলচিকি ভাষাভাষী মানুষ রয়েছেন অনেকে যদিও এটাই আমাদের রাজ্যের বৈচিত্রর মধ্যে ঐক্যর সংস্কৃতির মেলবন্ধন একথা মনে রেখেও বলা যায় যে এই খণ্ডিত বাংলায় বর্তমানে আর কতটুকু জায়গায় মাতৃভাষা বাংলা চর্চার পরিসর রয়েছে? ঘরে-বাইরে মাতৃভাষা বাংলা ক্রমশ কোঠাসা হয়ে পড়ছে পশ্চিমবঙ্গ নামক ভূ-খণ্ডে।
তাই এখনই যদি সচেতন না হওয়া যায়, তাহলে অচিরেই মাতৃভাষা বাংলা হারিয়ে যাবে নিজ ধাত্রীভূমি থেকে এটা কোনও মতেই শ্লাঘার বিষয় নয় আম বাঙালির কাছে
প্রতিবছর পয়লা বৈশাখ এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আসবে-যাবে এই দুদিনের জন্য এপারের আম-বাঙালি প্রায় সবাই এই মাতৃভাষা নিয়ে মেতে উঠবে কিন্তু সারাবছর পশ্চিমবঙ্গের কোথাওই, মাতৃভাষা বাংলার বিপন্নতা নিয়ে কোনও উদ্বেগ বাঙালির হৃদয় স্পর্শ করবে না এটা হলপ করেই বলা যায়
আশির দশকে বাংলা ভাষার সব্যসাচী লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, সমস্ত দোকানপাট ব্যবসা কেন্দ্রের সাইনবোর্ড বাংলায় লিখতে হবে এজন্য ভাষা সৈনিক নিয়োগ করা দরকার যদিও কলকাতার অধিকাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র, দোকানপাটের নাম এখনও ইংরেজিতেই লেখা হয়ে থাকে
 
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের কাছে বাংলা ভাষার প্রতি হৃদয় মথিত কোনও আবেগ, দরদ বা ভালবাসা নেই এই শ্রেণীর বাঙালি পরিবারের নবীন প্রজন্ম অধিকাংশই ইংরেজি স্কুলে পড়ার ফলে বাংলা ভাষার প্রতি কোনও মমত্ব গড়ে উঠছে না এজন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে দ্বিতীয় ভাষা বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা অবশ্যই পাঠ্য করা জরুরি নইলে অদূর ভবিষ্যতে নিজ ধাত্রীভূমিতেই 'মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা' বিপন্ন হয়ে পড়বে

[প্রবন্ধটির বক্তব্য লেখকের নিজস্ব]
~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)