বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/ভ্রমণ/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ,
১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ভ্রমণ
অদিতি
চ্যাটার্জি
ইফতার
পার্টি
"সেইগুলো ছাড়িয়ে দেখছিলাম নাখোদা মসজিদের দরজার কারুকার্য! লাল বেলে পাথরের তৈরি দরজা বুলন্দ দরওয়াজার আদলে তৈরি, গায়ে তার আলোর মালা, যদিও তখন জ্বলেনি তারা।"
আমি বড় হয়েছি টালিগঞ্জের যে
জায়গাটায় সেখানে বিভিন্ন ভাষা, ধর্মের মানুষরা
থাকতেন। ঈদ বলতে দেখতাম সামনে 'মসজিদ পাড়ার' মসজিদের সামনে সাদা পোশাকে সকলে আসতেন নামাজ পড়তেন।
প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আসত সিমাই, দু’ রকমের। দুধের
এবং শুকনো, দুধ ছাড়া যেটা খেতে আমি বেশি ভালবাসতাম। মধ্য কলকাতার যে কলেজটাতে
পড়তাম সেখানে রমজান মাস, রোজা এই শব্দগুলো অনেকটা কাছে চলে আসে বন্ধুদের জন্য। তবে
বছর দুই আগে রমজান মাস, রোজা এবং ইফতার এই
শব্দগুলো একদম বুকের মধ্যে জায়গা পেয়ে যায়,
সেই
গল্পটাই করছি...
শনিবারদিন রুমানা বলে ও
নাখোদা মসজিদ যাবে, রমজান মাসে চেষ্টা
করে একবার হলেও নাখোদা মসজিদে গিয়ে অসহায়,
গরিব মানুষদের
মধ্যে ইফতারি বিতরণ করতে, 'সাবাবে'র কাজ সেটা। আমি ভেবে নিলাম আচ্ছা পুণ্য অর্জন
হয়। ভাল কথা আমিও যাব। ঠিক হয়,
আমরা
এমজি রোড মেট্রোর বাইরে দেখা করব, বিকেলে চারটের একটু
আগে। অফিস থেকে ও আসবে। রোজা রাখবে
ওখানেই
ইফতারি দিয়ে নামাজ পড়বে নিজেও ইফতার করবে।
জ্যাকারিয়া স্ট্রিট দিয়ে যখন
প্রবেশ করতে থাকি তখন দেখি খাবার এবং মানুষের মেলা বসেছে যেন। কাবাব থেকে দইবড়া, হালিম থেকে মহববত কা শরবত, ফালুদা, পেঁয়াজি, বেগুনি, মাছ ভাজা (বিশেষ
উপকরণ দিয়ে ম্যারিনেট করা) কী নেই সেখানে! এখন তো যে কোনো ফুড ব্লগারগুলো
দেখলেই জানা যায়। কিন্তু আমি সেই অতীব
সুখাদ্য, ভিড় সেইগুলো ছাড়িয়ে
দেখছিলাম নাখোদা মসজিদের দরজার কারুকার্য! লাল বেলে পাথরের তৈরি দরজা বুলন্দ
দরওয়াজার আদলে তৈরি, গায়ে তার আলোর মালা, যদিও তখন জ্বলেনি তারা।
কলকাতা তথা পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বৃহত্তম মসজিদ হলো নাখোদা মসজিদ। প্রায় দশ হাজার মানুষ বসে নামাজ পড়তে পারেন।
'রমজান মুবারক' লেখা সামনে। বিক্রি
হচ্ছে আতর, জামা-কাপড়, বিশেষ টুপি। মসজিদের দরজার সামনে বিশাল ভিড়টা জুতো খুলে
লাইন করে ভেতরে যাচ্ছে। রুমানা বলল, "অদিতি ওরা আগে ওজু করবে। চল আমরাও
জুতো জোড়া খুলে আগে ওজু করেনি। আজানের সময় হয়ে আসছে।"
বিশাল পবিত্র সেই মসজিদে পা দিয়ে এমনই মাথাটা নিচু
হয়ে আসে, রুমানা যত্ন করে আমার
মাথাটা ওড়না দিয়ে ঢেকে দেয়, হাত-পা আমিও সবার
সাথে ধুই, কমলা-গোলাপি আকাশে একফালি রাঙা ভাঙা চাঁদ, বসন্তের এতাল-বেতাল হাওয়া! নাহ্ চাঁদ দেখার
সময় তখন আর হাতে নেই, 'ইফতারি' কেনা হয়নি তো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
মসজিদের বাইরে ছুটতে থাকি, দেখি কত লোক 'ডিসপোজেবল' বাটিতে ফল কেটে নিয়ে
এসেছেন, সঙ্গে ছোট ছোট ফলের রস।
দৌড়াতে দৌড়াতে শুনি রুমানা বলছে পাড়া থেকে হোক বা কোনো পরিবার থেকে এই রকম ইফতারি
মসজিদে দেওয়া হয়, যাতে যে গরিব, অসহায় মানুষেরা রোজা রেখেছেন বা রাখেননি তাঁরাও একটু ফল, ছোলা সিদ্ধ খেতে পারেন, যেটা নিয়ম।
রুমানা যখন মুড়ি, ভাজি ঠোঙার মধ্যে গোছগাছ করছে, আমি ওকে কানে কানে বলি,
-একটা একশো
টাকা দিয়ে আমিও ওই অসহায় মানুষগুলোর জন্য মুড়ির ঠোঙা (দশটা
মতো হবে) বানাতে দিচ্ছি।
-কেন করছিস? তুই আর আমি কি আলাদা?
-তা না, তবুও ঈশ্বর আমাকেও তো
সামান্য হলেও সামর্থ্য দিয়েছেন। না করিস না প্লিজ।
ফেরার পথে দেখি সবাই তৈরি
হচ্ছেন প্রার্থনার জন্য, অনেকক্ষণ ধরে খালি
পায়ে, খেয়ালই নেই আমার। সাথে
অনেকগুলো মুড়ি, ভাজির ঠোঙা, আমার আর রুমানার মেশানো ঠোঙা আমরা দিতে থাকি মসজিদের দরজার
কাছে বসে থাকা মানুষদের।
-দিদি, আপি... এদিকে এদিকে।
আজান শুরু হলো বলে,
-অদিতি চল কোথাও বসতে হবে। মসজিদে জায়গা পাওয়া যাবে না।
মেয়েটা চেষ্টা করেছে প্রতিটা
রোজা রাখার, এখনো। অফিস থেকে হাফ ছুটি
নিয়েছে। আমি পেট ভরে ভাত খেয়ে ওর সাথে ছুটছি…
পেলাম একটা হোটেলে, বসার জায়গা এই বিশেষ সময়টুকুর জন্য পুরোনো হোটেলগুলোতে
বিক্রি বন্ধ রাখা হয়, তাদেরকে বলা হয় শুধু
রোজাটা ভাঙব আর কিছু না। খুশি মনে বসার জায়গা দেন ওরা। পুরোনো সাদা পাথরের টেবিল, কাঠের চেয়ার। ফ্রিজ আছে, ছোট ছোট দুটো ফলের রস কেনা হয়। আলতো হাতে খেজুরের ঠোঙাটা এগিয়ে দিই,
-এটা তোর জন্য।
বন্ধুর হাসি জীবনে ভুলব না।
-আচ্ছা তুইও খা, ওই দ্যাখ আজান শুরু হলো নে নে তুই তোর মতো প্রার্থনা কর।
বলে চোখটা বন্ধ করে দেয় ও।
আশেপাশের সবাই ব্যস্ত পরম
করুণাময়ের কাছে নিজেদের কৃতজ্ঞতা, আকুতি জানাতে। আমিও
কৃতজ্ঞতা জানাই আমার ঈশ্বরের কাছে, এত কষ্টের তবু সুন্দর
একটা জীবন উপহার দেওয়ার জন্য। যেখানে কোনো বন্ধু বলে আচ্ছা তুই আর আমি কি আলাদা।
যেখানে কোনো বন্ধুর মা বলে এটা তো আমার মেয়ে, যেখানে আমি গিয়ে কোনো বন্ধুকে বলতে পারি,
-রুমানা আমার
খুব খিদে পেয়েছে।
যেখানে জীবনের চলার পথে
অনাত্মীয় মানুষ মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছে,
-ভাল থেকো বোন। আর কী চাইব বলো তোমার কাছে আমি!
আবারও মসজিদের দিকে যাই জুতো
আনতে তার চেয়ে আগে ও নামাজ পড়বে একটা বিশেষ ঘরে, শুধু সেখানে আমার যাওয়ার অনুমতি নেই। না থাকলেও আমি মেয়েদের দোতলার ছাদ থেকে
দেখি ধনী, দরিদ্র পাশাপাশি বসে নামাজ
পড়ছেন। এখানে কোনো ছোট-বড়, পন্ডিত-অশিক্ষিত নেই।
খিদে পেয়েছে রুমানার, বাতাসে সোঁদা গন্ধ,
ঝড় উঠবে
হয়তো, মসজিদ আলোর মালায় সেজে উঠেছে, আমরা আবারও দৌড়াচ্ছি। আমিনিয়াতে খাব। সামনে দেখি কাবাবের
দোকানের সামনে শাঁখা, সিঁদুর, তাঁতের শাড়িতে কোনো মা-মা চেহারার ভদ্রমহিলা, আবার পাশেই মোবাইল ফোন হাতে একটা অল্প বয়সি দলের
গ্রুপফি নেওয়া চলছে। একটু তাকিয়ে রুমানাকে বলি,
-এই হলো কলকাতা,
এই
জন্যই একে আমি বড় ভালবাসি। আমরা সবকটা উৎসবকে চেটেপুটে উপভোগ করতে জানি।
ঝড়ো হাওয়ার সাথে দৌড়াতে থাকি
আমি আর রুমানা...
~~000~~






No comments:
Post a Comment