প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

অভিশপ্ত হাইওয়ে ও টাইম লুপ: দিঘার রাতের বিভীষিকা [৪র্থ পর্ব] | গৌরীশ হালদার

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৮তম সংখ্যা/২২শে আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
গৌরীশ হালদার
অভিশপ্ত হাইওয়ে ও টাইম লুপ: দিঘার রাতের বিভীষিকা
[৪র্থ পর্ব]

"সায়নও তার হাত বাড়িয়ে দিল। তার হাতের তালুতে সেই হোটেলের জঙ্গলে দেখা যাওয়া লাল সুতো আর সিঁদুরের অদ্ভুত দাগ ফুটে উঠেছে"

 
পূর্বানুবৃত্তি চার বন্ধু কলকাতা থেকে ফুল ট্যাঙ্ক পেট্রল ভরে মিড নাইটে দিঘা রওনা হয়ে মাঝ পথে বিপদে পড়ে একটা হোটেলে যায়। সেখানে থাকাকালীন এক বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যায় না। হঠাৎ ছাদ থেকে কিছু একটা বিকট শব্দে পড়ে এবং কালো রক্ত ছড়িয়ে যায়। তারপর…
 
সপ্তম অধ্যায়: টাইম লুপের পুনরাবৃত্তি এবং চতুর্থ মাত্রা
কলকাতার কোলাহলে ফিরে আসার পরও দীঘার সেই অভিশপ্ত রাতের রেশ আমাদের শরীর ও মন থেকে মুছে যায়নি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাড়ি ফেরার ঠিক তিন দিন পর আমাদের চারজনেরই মোবাইলের ঘড়িগুলো একসঙ্গে ঠিক রাত ৩টে বেজে হাড়হিম করা একটা শব্দ করে থেমে গিয়েছিল। আমরা যারা নিজেদের সুস্থ ভাবছিলাম, তারা দেখলাম আমাদের বাস্তব জীবনটাও যেন এক অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটার মতো একই বৃত্তে পাক খাচ্ছে।
 
সেদিন রাতে আমি আমার ঘরের টেবিলে বসে পদার্থবিজ্ঞানের কিছু জটিল সমীকরণ মেলাবার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ ঘরের সিলিং ফ্যানটা বন্ধ হয়ে গেল, অথচ ফ্যানের রেগুলেটর ফুল স্পিডে ঘোরানো। ঠিক তখনই আমার টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরির পাতাগুলো নিজে থেকেই উল্টাতে শুরু করল। ডায়েরির একটা ফাঁকা পাতায় কালির কালচে ছোপ দিয়ে কে যেন নিজ হাতে লিখে দিল:
"সময় হলো এক বৃত্ত, যেখান থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। ফিরে এসো দিঘার সেই শূন্য প্রান্তরে..."
 
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল শিভামের নম্বর। আমি ফোন তুলতেই ওপার থেকে শিভামের কাঁপাকাঁপা গলা শুনতে পেলাম—"অভী ভাই, তুই কি ডায়েরিটা দেখেছিস? আমাদের সবার ঘরে একই ঘটনা ঘটেছে! সায়ন আর রিতুও আমাকে ফোন করেছিল। ওরা বলছে... ওরা বলছে আমরা আসলে কখনও কলকাতা ফিরে আসিনি! আমরা এখনো ওই লুপের ভেতরেই কোথাও আটকে আছি!"
 
শিভামের কথাগুলো শুনে আমার মাথার রক্ত হিম হয়ে এল। আমি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গেলাম। বাইরে তখন মধ্যরাত। কলকাতার রাস্তাঘাটগুলো কেমন যেন ফাঁকা, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোর আলো কুচকুচে কালো রঙের ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। দূরে একটা রিকশা বা গাড়িও দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে শহরটা এক বিশালাকার ভিনটেজ হোটেলের করিডোরে রূপান্তরিত হয়েছে।
 
পরদিন সকালে আমরা চারজনে মিলে একটা পুরোনো কফি শপে বসলাম। আমাদের সবার মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ। রিতু তার কফির কাপটা দুহাতে শক্ত করে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "যেদিন থেকে আমরা দিঘা থেকে ফিরেছি, আমার একটা জিনিস খেয়াল হয়েছে। আমার হাতের নখগুলো কেমন যেন নীলচে হয়ে গেছে। আর আমি যখনই আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছি, আমার প্রতিবিম্বটা আমার এক সেকেন্ড পরে নড়ছে!"
 
সায়নও তার হাত বাড়িয়ে দিল। তার হাতের তালুতে সেই হোটেলের জঙ্গলে দেখা যাওয়া লাল সুতো আর সিঁদুরের অদ্ভুত দাগ ফুটে উঠেছে, যা আমরা কলকাতা আসার পর সাবান দিয়ে ধুয়েও তুলে ফেলতে পারিনি। সায়ন ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলে বলল, "আমরা যখন মাঠের মধ্যে বাইক দুটো দেখতে পেয়েছিলাম, তখন আমাদের আসল শরীরগুলো কি আদৌ বেঁচে ছিল? নাকি সেদিন রাতেই... ওই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার সময় আমাদের মৃত্যু ঘটেছিল?"
 
সায়নের এই কথাটার পর পুরো টেবিলে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। কারণ আমাদের চারজনের মনেই এই একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—আমরা কি ভূত হয়ে বেঁচে আছি? নাকি দিঘার সেই হাইওয়ে আমাদের অস্তিত্বকে কোনো টাইম লুপের অন্য কোনো মাত্রায় টেনে নিয়ে গেছে?
 
অষ্টম অধ্যায়: ডায়েরির পাতা এবং প্রাচীন অভিশাপ
সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে এই রহস্যের সমাধান করতে হলে আমাদের ইতিহাসের গভীরে যেতে হবে। শিভাম তার এক কাকার মাধ্যমে কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরির পুরোনো আর্কাইভ থেকে দিঘা ও কন্টাই (Contai) অঞ্চলের ব্রিটিশ আমলের কিছু গেজেট ও ইতিহাস সংগ্রহ করল।
 
আমরা আমার রুমে গোল হয়ে বসে পুরোনো জীর্ণ কাগজগুলো ওল্টাতে লাগলাম। পাতাগুলো এতই পুরোনো যে ছোঁয়া মাত্রই ঝরে পড়ছে। হঠাৎ রিতু একটা হলুদ হয়ে যাওয়া খবরের কাগজের কাটিংয়ের ওপর হাত রাখল। কাগজটা ১৯৭৪ সালের কোনো এক দৈনিক পত্রিকার।
 
হেডিংয়ে মোটা হরফে লেখা ছিল:
"দিঘার উপকণ্ঠে এক রহস্যময় ভিনটেজ হোটেলে চার পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু! আজও মেলেনি মৃতদেহ।"
খবরটা পড়ার সাথে সাথে আমাদের চোখের সামনে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। ১৯৭৪ সালের সেই ২৪শে মার্চ ঠিক আমাদের মতোই চারজন বন্ধু—অমিত, প্রলয়, সুদীপ্ত এবং মেঘা—বাইকে করে দিঘা যাচ্ছিল। রাত আটটার সময় তাদের বাইকের ফুয়েল ট্যাংক হঠাৎ শূন্য হয়ে যায় এবং তারা একটা পুরোনো হোটেলের সন্ধান পায়। হোটেলের রিসেপশনিস্ট তাদের রুম দেয় এবং ঠিক রাত তিনটে বাজার পর তাদের একে একে নিখোঁজ হওয়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত হোটেলের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে তারা প্রাণ হারায়।
 
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, সেই চারজন যুবকের চেহারার বর্ণনার সঙ্গে হুবহু আমাদের চারজনের মিল রয়েছে! শুধু তাই নয়, সেই খবরের কাগজে যে চারজনের ছবি ছাপা হয়েছিল, তাদের মুখগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছিল—আর তাদের দাঁতগুলো ছিল লম্বা ও বাঁকা!
 
শিভাম কাগজটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, "তার মানে... মানে প্রতি পঞ্চাশ বছর পর পর ওই টাইম লুপ সক্রিয় হয়! ১৯৭৪ সালের পর ২০২৪ সালে আমরা সেই লুপে পা দিয়েছি! আমরা প্রথম বলি বা শেষ বলি নই, আমরা ওই অভিশপ্ত চক্রের এক একটা পুতুল মাত্র!"
 
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে ঘড়ির বড় কাঁটাটা রাত ৩টের ঘরে গিয়ে পৌঁছাল। ঘরের সমস্ত জানলা দরজা একসঙ্গে সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের বাতাস এমনভাবে গর্জে উঠল যেন কোনো প্রলয় আসছে। আমাদের ঘরের দেওয়ালের পলেস্তরা খসে পড়তে লাগল এবং দেওয়ালের গায়ে রক্ত দিয়ে কে যেন অজস্র সংখ্যায় লিখতে শুরু করল—৩:০০, ৩:০০, ৩:০০...
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)