প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

অভিশপ্ত হাইওয়ে ও টাইম লুপ: দিঘার রাতের বিভীষিকা [৩য় পর্ব] | গৌরীশ হালদার

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/১৫ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
গৌরীশ হালদার
অভিশপ্ত হাইওয়ে ও টাইম লুপ: দিঘার রাতের বিভীষিকা
[৩য় পর্ব]

"হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন আমাদের ঠিক পেছনে পেছনে হাঁটছে! শুকনো পাতা মাড়িয়ে আসার মচমচ শব্দ আমাদের পিছু ধাওয়া করেছে।"

 
পূর্বানুবৃত্তি মাঝ রাতে বাইক ঠেলে ওরা একটা হোটেলে আশ্রয় নেয়। সেখানে নানারকম আশ্চর্য ঘটনার সম্মুখীন হয়। কালা জাদুর প্রভাবে চার বন্ধুর মধ্যে একজনকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপর…
 
পঞ্চম অধ্যায়: সময়ের ফাঁদ এবং অন্তহীন করিডোর
আমরা আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে দৌড়ে নিজেদের রুমে ফিরে গেলাম। ব্যাগপত্র যেমন ছিল তেমনই গোছানো অবস্থায় রেখে আমরা দরজার সামনে এসে বসলাম। সবাই মিলে ঠিক করলাম, সকাল হওয়া মাত্র আমরা এই হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যাব। কিন্তু সমস্যা হলো, ঘড়ির কাঁটা তখনো রাত ৩টাতেই আটকে আছে! যেন সময় এখানে এসে থমকে গেছে। রাত আর কাটতেই চাইছে না।
 
অপেক্ষা করতে করতে যখন আর সহ্য হচ্ছিল না, তখন আমি একটা বুদ্ধি দিলাম। "শোন, এভাবে ভয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকলে তো চলবে না। বাইরে ওই জঙ্গলে কে বা কী আছে, চলো আমরা সবাই মিলে একবার গিয়ে দেখে আসি। এভাবে বন্দির মতো বসে থাকার কোনো মানে হয় না।" শিভাম আর সায়ন প্রচণ্ড ভীতু প্রকৃতির। তারা ভয়ে কেঁদে ফেলে বলল, "পাগল নাকি তুই! নিজের চোখে রিতুকে ওই অবস্থায় দেখার পরেও তুই আবার সেই জঙ্গলে যেতে বলছিস?" কিন্তু এছাড়া আর কোনো রাস্তা আমাদের খোলা ছিল না। থাকতে হলে এই রহস্যের মুখোমুখি হতেই হতো। আমরা চারজন একসাথে রুমের দরজা খুলে করিডোর পেরিয়ে হোটেলের পেছনের দরজা দিয়ে সরাসরি সেই ঘন জঙ্গলের দিকে পা বাড়ালাম।
 
জঙ্গলে ঢোকার সাথে সাথেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল—আমাদের হাতের ঘড়ির কাঁটাগুলো আবার টিকটিক করে ঘুরতে শুরু করল! আমরা বুঝতে পারলাম, এই জঙ্গল বা হোটেল চত্বরের একটা নিজস্ব নিয়ম আছে, যা আমাদের এখানে আটকে রাখতে চাইছে।
 
আমরা একটু এগিয়ে জঙ্গলের ভেতরে গেলাম। অমনি ঘড়ির কাঁটা আবার অদ্ভুতভাবে বন্ধ হয়ে গেল। চারপাশের গাছেদের পাতাগুলো কোনো বাতাস ছাড়াই সজোরে কাঁপতে শুরু করল। বিভিন্ন পেঁচা, চামচিকে এবং নাম না জানা বুনো জন্তুর বিকট আর্তনাদ আমাদের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অগণিত অদৃশ্য জীব আমাদের ঘিরে ধরেছে এবং আমাদের প্রতিটা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
 
হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন আমাদের ঠিক পেছনে পেছনে হাঁটছে! শুকনো পাতা মাড়িয়ে আসার মচমচ শব্দ আমাদের পিছু ধাওয়া করেছে। ভয়ে বুক কেঁপে উঠলেও আমরা সামনে এগোতে লাগলাম। আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে যখন রাত ৪টা বাজল, তখন আমরা দূরে আলো দেখতে পেলাম। আমাদের প্রাণ ফিরে এল! আমরা দেখলাম, জঙ্গলটা যেন শেষ হয়ে আসছে। আমরা ভাবলাম, যাক বাবা, অবশেষে আমরা বেঁচে গেছি! নরক থেকে মুক্তি মিলল! কিন্তু আমাদের সেই আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গেল। কারণ জঙ্গল পেরিয়ে আমরা যেখানে এসে পৌঁছলাম, সেটা অন্য কোনো জায়গা নয়—ঠিক সেই অভিশপ্ত হোটেলটার ঠিক সামনে! আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের ঘড়ির কাঁটাগুলো আবার উল্টো দিকে ঘুরে গিয়ে বেজে উঠল—রাত ৩টে! আমরা শিউরে উঠলাম। এ কি কোয়ান্টাম লুপ বা কোনো টাইম লুপের মধ্যে ফেঁসে গেলাম আমরা?
 
ভয়ে দিশেহারা হয়ে আমরা উল্টো দিকে দৌড় দিলাম। কোনো পথ বা দিশা পাচ্ছিলাম না। কোনো মতে দৌড়ে আবার জঙ্গলে ঢুকলাম, আবার ৪টা বাজল, আর প্রতিবারই ঘুরে ফিরে আমরা সেই হোটেলটার ঠিক সামনেই এসে দাঁড়ালাম! আর ঘড়ির কাঁটা নির্ভুলভাবে প্রতিবার রাত ৩টে বাজিয়ে দিল। বেরোনোর সমস্ত রাস্তা যেন জাদুমন্ত্রের বলে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
 
ষষ্ঠ অধ্যায়: ছাদ থেকে পতন এবং বিভীষিকাময় সমাপ্তি
কোনো রাস্তা না পেয়ে আমরা যখন হোটেলের মূল দরজার সামনে দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক তখনই মাথার ওপর একটা খটখট শব্দ হলো। ওপরের দিকে তাকিয়ে আমরা দেখলাম—হোটেলের ছাদের কার্নিশে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে!
 
অন্ধকারের মধ্যে অবয়বটা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও বোঝা যাচ্ছিল ওটা কোনো মানুষ নয়। হঠাৎ করেই ছাদ থেকে সেই মূর্তিটি আমাদের ঠিক সামনে সজোরে লাফিয়ে পড়ল! "পটাশ!" একটা বিকট শব্দ হলো। মুহূর্তের মধ্যে হোটেলের সামনের আঙিনা এবং আমাদের জুতো-মোজা ঘন কালো রক্তে ভেসে গেল। রক্তটা এতই উষ্ণ এবং তাজা ছিল যে তার বাষ্প আমাদের গায়ে এসে লাগছিল।
 
আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, আমাদের সামনে সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যটি আবার ঘটল! হোটেল এবং পেছনের ঘন জঙ্গল—সবকিছু চোখের পলকে ধোঁয়ার মতো অদৃশ্য হয়ে গেল! সেখানে কোনো হোটেল ছিল না, কোনো জঙ্গল ছিল না—শুধু পড়ে রইল একটা বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠ, যার চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
 
আর সেই ফাঁকা মাঠের মাঝখানে সেই ভূতটা দাঁড়িয়ে রইল—মুখটা ঝলসানো, নীলচে চামড়া, আর সেই লম্বা বাঁকা দাঁত! ঠিক যেমনটা সায়ন আমাদের বলেছিল। সে আমাদের দিকে একদৃষ্টে তাকাল। তারপর সেই ভয়ংকর, বিকৃত হাসিতে ফেটে পড়ে সে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
 
হোটেল, জঙ্গল, রক্ত—সবকিছু নিমেষের মধ্যে উবে গেল। চারপাশটা কেমন যেন একটা ভূতুড়ে স্বপ্নের মতো মনে হতে লাগল। আমরা চারজন তখন এমনভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে আমাদের কারোর মুখে আর রা-টি নেই। মানুষ যখন চরম সীমার বাইরে ভয় পেয়ে যায়, তখন তার গলার স্বরও হারিয়ে যায়। ভয়ে চিৎকার করার শক্তিটুকুও আমাদের মধ্যে আর অবশিষ্ট ছিল না।
 
আমরা দেখলাম, আমাদের দুটো বাইক ঠিক সেই মাঠের মাঝখানে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কিছুই হয়নি!
আমরা আর এক সেকেন্ডও সেখানে নষ্ট করলাম না। কাঁপতে কাঁপতে কোনো রকমে বাইক স্টার্ট দিলাম। বাইক যেন নিজে থেকেই আমাদের নিয়ে দিঘা থেকে কলকাতার হাইওয়ে ধরে ছুটতে শুরু করল।
 
রাস্তার পুরোটা সময় আমাদের মনে হচ্ছিল, সেই নীল মুখের ভূতটা যেন অদৃশ্যভাবে আমাদের বাইকের পেছনে পেছনে উড়ে আসছে। আমাদের কানের কাছে কেউ যেন ফিশফিশ করে হাসছে।
 
সকাল হতেই কোনো রকমে আমরা কলকাতায় আমাদের বাড়িতে পৌঁছলাম। বাড়ি পৌঁছানোর পর থেকেই আমাদের প্রত্যেকের শরীর অসম্ভব খারাপ হতে শুরু করল। প্রচণ্ড জ্বর, বারবার বমি, আর পেটে মারাত্মক যন্ত্রণা—যেন শরীরের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে খাচ্ছে। লোকেরা বলে, অশুভ শক্তি বা ভূত দেখার পর মানুষের শরীর এভাবেই ভেঙে পড়ে।
 
আমরা সুস্থ হওয়ার পর আমাদের বাড়ির লোকেদের দিঘার সেই রাতের সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। কিন্তু কেউ আমাদের কথা বিশ্বাস করল না! সবাই উল্টে আমাদের পাগল বলে উড়িয়ে দিল এবং বলল যে আমরা বোধ হয় কোনো ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখেছিলাম কিংবা ট্রিপে গিয়ে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে এমনটা মনে হয়েছে।
 
কিন্তু আমরা তো খুব ভাল করেই জানি, সেদিন রাতে আমরা সচক্ষে কী দেখেছিলাম! সেই অভিশপ্ত হোটেল, সেই কালো জাদুর জঙ্গল, আর সেই নীল মুখের ভূতটার ঠান্ডা হাসি আজও আমাদের মনের কোণে জীবন্ত হয়ে আছে। সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি আজও আমাদের নিঃশ্বাস ভারী করে তোলে।
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)