বাতায়ন/শারদীয়া/নাটক/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
নাটক
কাহিনি ও নাট্যরূপ: তাপসকিরণ রায়
সত্তরের রক্তরাঙা প্রান্তর
শারদীয়া
নাটক
কাহিনি ও নাট্যরূপ: তাপসকিরণ রায়
সত্তরের রক্তরাঙা প্রান্তর
মনুদা! তুই এমএলএ হবি? মন্ত্রী হবি? নিজের দলের লোকের সাথেই নিমকহারামি করলি রে?
২. মনুদা: স্থানীয় পার্টি নেতা ও প্রভাবশালী মাফিয়া।
৩. কলি: পঞ্চাননের শৈশবের বান্ধবী/প্রেমিকা।
৪. বিকাশ: পঞ্চাননের পুরনো সহপাঠী, পোস্ট অফিসের সৎ কর্মচারী।
৫. হর্ষ: কলির ছোট ভাই।
৬. সঙ্গীগণ (উজান, বান্টি, অধীর, লোকেশ, হর স্যার): পার্টির শাগরেদ ও স্কুলের শিক্ষক।
(স্থান: হরি সরকারের ঘর। সময়: দুপুর। আলো-আঁধারি পরিবেশ। বিছানায় এক মুমূর্ষু বৃদ্ধ রোগশয্যায় ছটফট করছেন। বাথরুম থেকে জল পড়ার শব্দ আসছে। পঞ্চানন নিঃশব্দে ঘরে ঢোকে। তার দুই পকেটে দুটি চাকু। সে বৃদ্ধের দিকে তাকায়, তারপর হঠাৎ দু-হাত দিয়ে বৃদ্ধের গলা টিপে ধরে।)
(বৃদ্ধ হাত-পা ছটফট করে, চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসে, জিভ ঝুলে পড়ে। কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ স্থির হয়ে যান। পঞ্চানন তা গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। ঠিক তখনই হরি সরকারের পুত্রবধূ স্নান সেরে ঘরে ঢোকে।)
বৌমা: (আতঙ্কিত গলায়) কে? কে আপনি?
(স্থান: মনুদার আখড়া/কার্যালয়। সময়: সামান্য পরে। মনুদা চেয়ারে বসে সিগারেট টানছেন। পঞ্চানন হাঁপাতে হাঁপাতে ঢোকে।)
মনুদা: কী রে পঞ্চু, এত হাঁপাতে হাঁপাতে কোথা থেকে আসছিস?
মনুদা: (অবাক হয়ে) মানে?
মনুদা: কেউ দেখল-টেখল না তো?
মনুদা: (কুটিল হেসে) দেখলি তো মানুষের মৃত্যু? বিশেষ করে গলা টেপা কেসে শরীরের ভেতরের ওলট-পালট! এটাই তো অভিজ্ঞতা।
পঞ্চানন: দাদা, তুমি যে বলেছিলে আমায় এমএলএ হলে ১ নম্বর বডিগার্ড বানাবে?
(স্থান: রাস্তার মোড়। সময়: সকাল। স্কুলের পুরনো বন্ধু বিকাশ হেঁটে যাচ্ছে। পঞ্চানন তাকে দাঁড় করায়।)
পঞ্চানন: আরে বিকাশ, দাঁড়া!
বিকাশ: (অনিচ্ছাসত্ত্বেও দাঁড়িয়ে) বল, কী বলছিস? অফিসে যাচ্ছি রে।
পঞ্চানন: জানি তুই পোস্ট অফিসে চাকরি পেয়েছিস। কটা টাকা হবে রে?
পঞ্চানন: (উগ্র হয়ে পকেটে হাত দিয়ে) ফালতু কথা বলিস না, ছাড় কটা টাকা!
বিকাশ: ছাড়! আমার পকেট ছাড় বলছি! তুই জবরদস্তি টাকা নিবি?
বিকাশ: (হাত জোড় করে) পঞ্চু, দেখ আমার কাছে এই দুটো টাকাই আছে...
পঞ্চানন: থাক, টাকা দেখাতে হবে না! আমার সঙ্গে কথা বলার আগে ভেবেচিন্তে বলবি!
বিকাশ: (পঞ্চুর পিঠে হাত রেখে) এত চটে যাস কেন?
বিকাশ: (আতঙ্কিত) আমায় মাফ কর পঞ্চু! আর কোনোদিন এমন হবে না! (বিকাশ দ্রুত সরে যায়, পঞ্চু নিজের রক্তের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে)
(স্থান: পঞ্চাননের স্মৃতির ক্যানভাস/ফ্ল্যাশব্যাক। বাল্যকালের দিনগুলি। পাশে কলি দাঁড়িয়ে।)
কলি: পঞ্চাননদা, তুমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ওই লোফার ছেলেগুলোর সঙ্গে কেন মিশছ?
কলি: আমি ইয়ার্কি করছি না! দিন দিন তুমি নিজেকে নীচে নামিয়ে দিচ্ছ। কথা দাও তুমি ভাল হবে।
পঞ্চানন: প্রেমিকার মতো কথা বলছিস দেখছি! পথ ছাড় তো! (ধাক্কা দিয়ে চলে যায়)
(দৃশ্যপট দ্রুত বদলায়: নাইনের রেজাল্টের দিন। রাতে মাতাল অবস্থায় পঞ্চানন পথ আটকায় কলির।)
পঞ্চানন: কলি, শোন! খুব সুন্দর হয়ে উঠেছিস তো তুই!
কলি: এ কী কথা পঞ্চাননদা! তুমি নেশা করেছ?
পঞ্চানন: (জড়িয়ে ধরে) ছাড়ব না! আমি তোকে ভালবাসি কলি!
কলি: (ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে) ছেড়ে দাও বলছি! (কলি কেঁদে পালিয়ে যায়)
(স্থান: ম্যাট্রিক পরীক্ষার হল। টেবিল-চেয়ার পাতা। হর স্যার ও হেডমাস্টার ইনভিজিলেশনে। পঞ্চানন বেঞ্চে বই খুলে নকল করছে।)
হর স্যার: বাবা পঞ্চানন, বইগুলো বাইরে রেখে এসো।
পঞ্চানন: (স্যারের পা ছুঁয়ে) স্যার, আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না, আমাকে পাস করতে হবে! (পকেট থেকে বড় চাকু বের করে বেঞ্চে গেঁথে দেয়)
হেডমাস্টার: দেখো, এভাবে পরীক্ষা দেওয়া যায় না।
পঞ্চানন: আমায় ডিস্টার্ব করবেন না স্যার! একটা-দুটোর পেটে চাকু ঢুকিয়ে দেব?
(স্থান: কালনার পুরনো বাসস্ট্যান্ডের পেছনের জঙ্গল। সন্ধে নামছে। চিৎকার শুনে পঞ্চু এগিয়ে যায়।)
কলি: (আর্তচিৎকার) ছেড়ে দাও! আমায় ছেড়ে দাও!
পঞ্চানন: (উঁকি মেরে) একী, কলি!
(পঞ্চানন মুহূর্তের মধ্যে প্যান্টের ভাঁজ থেকে বড় ছুরি বের করে সোজা চেপে ধরা লোকটার পেটে ও বুকে কয়েকবার বসিয়ে দেয়। লোকটা আর্তনাদ করে গড়িয়ে পড়ে।)
কলি: (কাঁপতে কাঁপতে) পঞ্চাননদা!
পঞ্চানন: তুই ঠিক আছিস তো? যা এখান থেকে!
(স্থান: পঞ্চাননের ঘর। পঞ্চানন এখন বুট-স্যুট পরা, পকেটে দুটি রিভলভার। হর্ষ দৌড়ে আসে।)
হর্ষ: পঞ্চুদা! পঞ্চুদা!
পঞ্চানন: কী রে হর্ষ? কী হয়েছে?
পঞ্চানন: (উত্তেজিত) তোর দিদির কী হয়েছে? কেউ জবরদস্তি করেনি তো?
পঞ্চানন: কী হয়েছে রে কলি?
পঞ্চানন: (গর্জে উঠে) কোন দাদা?
পঞ্চানন: (পকেটে রিভলভার চেপে ধরে, চোখে যেন রক্তের নেশা) মনুদা... তুই আমার মাল ছুঁয়েছিস! চিনিস না তুই পঞ্চুকে!
(স্থান: কালনা শহরের অন্ধকার গলি। রাত ১১টা। মনুদা তার চার শাগরেদ বান্টি, ঝন্টু, হাবুল ও কালুকে নিয়ে মিটিং সেরে ফিরছে।)
মনুদা: আজ পঞ্চুকে সাথে আনিসনি তো রে বান্টি? ছেলেটা বড্ড একরোখা... কলির কেসটা জেনে ফেললে ঝামেলা করত।
বান্টি: না দাদা, পঞ্চুকে জানানো হয়নি।
(হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে প্যান্টের দুই পকেট থেকে দুটি লোডেড পিস্তল বের করে সামনে এসে দাঁড়ায় পঞ্চানন।)
পঞ্চানন: মনুদা! তুই এমএলএ হবি? মন্ত্রী হবি? নিজের দলের লোকের সাথেই নিমকহারামি করলি রে?
পঞ্চানন: কোনো কথা নয়!
(দুম! দুম! দুম!—পরপর তিনটি গুলির শব্দ। মনুদা বুকে হাত দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারদিকে চিৎকার ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়।)
বান্টি: পঞ্চু মনুদাকে মেরে দিল! ধর ওকে! গুলি কর!
(শুরু হয় দু-পক্ষের গোলাগুলি। অন্ধকারের পথ ধরে ছুটতে থাকে পঞ্চানন। চারদিক থেকে বন্দুকের গুলির বৃষ্টি নেমে আসে।)
পঞ্চানন: (আর্তচিৎকার) আঃ...!
(স্থান: ১৯৭০ সালের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল। ফাঁকা বড় পিচ রাস্তা।)
(নেপথ্য বর্ণনা/ভয়েস ওভার: ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতেই দেখা গেল রাস্তার এক পাশে পড়ে আছে বান্টি আর ঝন্টুর নিথর দেহ। আর কিছুটা পথ এগিয়ে, কালনার বড় পিচ রাস্তার ওপর রক্তে ভেসে পড়ে আছে পঞ্চাননের মৃতদেহ। ১৯৭০ সালের সেই উত্তাল রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, একটা ঢাকনা দেওয়া ট্রাকে করে লাশের সারির সঙ্গে পঞ্চাননের মৃতদেহ ভেসে চলেছে কোনো এক অনামিক গন্তব্যে...।)
(মঞ্চের আলো আস্তে আস্তে নিভে আসে...)
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment