বাতায়ন/শারদীয়া/প্রবন্ধ/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
প্রবন্ধ
মানালী হোড়
বঙ্গভঙ্গ ও রাখিবন্ধন: ঐক্যের সুতোয় বাংলা
রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছিলেন, প্রতিবাদ সবসময় সংঘাতের ভাষায় করতে হয় না। কখনও কখনও একটি গান, একটি কবিতা, একটি উৎসব কিংবা একটি সাধারণ সুতোও মানুষের মনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে।
সালটা
ছিল ১৯০৫। বাংলায় তখন উত্তেজনা চরম সীমায়। ইংরেজদের অত্যাচারে তেতে উঠেছে গোটা
বাংলা। অকথ্য অত্যাচার বাংলার মানুষরা মেনে নিলেও তারা দেশভাগের সিদ্ধান্ত মেনে
নিতে পারে না। সেই সময়ের ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন সিদ্ধান্ত নেন বাংলা
ভাগের। যা আমাদের দেশবাসী সহজে গ্রহণ করতে পারে না। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই
অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গড়ে তোলা ও
আলাদা আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকার। এর ফলাফল
স্বরূপ সরকার বাংলার মানুষকে এক নতুন জাগরণের স্বপ্ন দেখালেও বাংলার মানুষ জানত যে
এর ফলে বাঙালিদের একটা বড় অংশে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়বে।
বঙ্গভঙ্গের
বিরুদ্ধে বাংলা তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। এছাড়া শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মধ্যে তখন
জাতীয়তাবাদ ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সংবাদপত্র, সাহিত্য,
সভা
সমিতির, এবং রাজনৈতিক
আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ
সরকার দাবি করেছিল, এত বড় অঞ্চল একসঙ্গে
পরিচালনা করা কঠিন এবং প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলাকে ভাগ করা প্রয়োজন। কিন্তু
বাঙালিদের একটি বড় অংশ এই যুক্তি মেনে নেয়নি।
বঙ্গভঙ্গের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর
প্রতিবাদের ধরন ছিল অন্যরকম। তিনি শুধু রাজনৈতিক সভা বা প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ
থাকেননি, তিনি মানুষের হৃদয়ের
মধ্যে ঐক্য তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুঝেছিলেন, ব্রিটিশ সরকারের বিভাজনের
বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হতে পারে মানুষের পারস্পরিক বন্ধন। তাই তিনি
রাখিবন্ধনকে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সামনে আনেন। ১৯০৫
সালের ১৬ অক্টোবর, বঙ্গভঙ্গ কার্যকর
হওয়ার দিন, কলকাতা ও বাংলার
বিভিন্ন অঞ্চলে রাখিবন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। মানুষ একে অপরের হাতে রাখি বাঁধতে
শুরু করে। এই রাখি শুধু ভাইয়ের হাতে বোনের বাঁধা রাখি ছিল না, এটি ছিল একজন বাঙালির সঙ্গে
আরেকজন বাঙালির বন্ধনের প্রতীক।
রবীন্দ্রনাথ
দেখিয়েছিলেন, প্রতিবাদ সবসময়
সংঘাতের ভাষায় করতে হয় না। কখনও কখনও একটি গান, একটি কবিতা, একটি উৎসব কিংবা একটি সাধারণ সুতোও মানুষের মনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। আজ
আমরা রাখি পূর্ণিমাকে সাধারণত ভাই-বোনের ভালবাসা ও বন্ধনের উৎসব হিসেবে দেখি।
কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় রাখি একটি বৃহত্তর অর্থ বহন করেছিল।
বঙ্গভঙ্গ
শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে রদ করা হয়। কিন্তু ১৯০৫ সালের সেই রাখিবন্ধনের তাৎপর্য আজও
ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ সেই দিনের রাখি কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতীক
ছিল না। সেটি ছিল ঐক্য, সম্প্রীতি এবং বাংলার
মানুষের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের প্রতীক। তাই রাখি পূর্ণিমার অর্থ শুধু ভাইয়ের হাতে
বোনের রাখি বাঁধা নয়। বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কখনও কখনও একটি
ছোট্ট সুতোও একটি বড় বার্তা বহন করতে পারে।
~~000~~
No comments:
Post a Comment